নেপালে গত ২৬ আগস্টের পর প্রতি ঘণ্টায়ই মৃতের সংখ্যা বাড়ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে নিখোঁজের সংখ্যাও। স্বজন হারানোর হাহাকারে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। নতুন করে বন্যার সতর্কতা জারি করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আরেকটি ছোট বন্যা হলেও নেপালে গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে। এদিকে কয়েকটি জলবিদ্যুেকন্দ্রে পাঁচ শতাধিক মানুষ আটকে আছে। তাদের উদ্ধারে বেগ পেতে হচ্ছে উদ্ধারকর্মীদের। সেখানে উদ্ধারকাজে এভারেস্ট পর্বতারোহীদেরকেও নিয়োগ করা হয়েছে।
মৃত্যু ও নিখোঁজের সংখ্যা বাড়ছেই
আকস্মিক বন্যায় নেপালে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৭৯০ জনে দাঁড়িয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ (এনডিআরআরএমএ)। স্থানীয় সময় বেলা তিনটায় এই তথ্য জানানো হয়েছে। নেপালের পুলিশ জানিয়েছে, এখনো ২ হাজার ৫০২ জন নিখোঁজ রয়েছে। এছাড়া উদ্ধার করা হয়েছে ৮ হাজার ১৮৬ জনকে। প্রায় ২০ হাজার নিরাপত্তাকর্মী এই উদ্ধার কার্যক্রমে নিয়োজিত রয়েছেন। নেপাল ট্যুরিজম বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২৬১ জন বিদেশি নাগরিককে উদ্ধার করা হলেও এখনো ৩২০ পর্যটকের খোঁজ মেলেনি। অন্যদিকে, চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, তিব্বতের ভূমিধসে ১৬ জন নিহত হয়েছে। আগে সাত জন নিহত হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছিল। চীনের কঠোর নিয়ন্ত্রণের কারণে সেখানকার প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানা কঠিন বলে জানিয়েছেন বিবিসির সংবাদদাতারা।
সিসিটিভি জানিয়েছে, তিব্বতে ৫৪৬ জন এখনো নিখোঁজ আছে, যাদের মধ্যে ২৩ দেশের ২৬১ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। এদের মধ্যে ১৫ জন ব্রিটিশ নাগরিক। নেপালি কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে ৩৩ জন ব্রিটিশ নাগরিকের নিখোঁজ থাকার কথা জানিয়েছে। তবে তিব্বতমুখী সীমান্ত পারাপারের পথে থাকা এসব নিখোঁজ ব্রিটিশ নাগরিকের মধ্যে কতজন চীনের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত, তা স্পষ্ট নয়।
‘আরেকটি ছোট আকারে বন্যাও গুরুতর হবে’
বন্যাবিষয়ক একজন বিশেষজ্ঞ সতর্ক করেছেন, ‘নেপাল ও তিব্বতে এখন প্রধান উদ্বেগের বিষয় হলো, এই আকস্মিক বন্যা আরো নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে। সেখানে আরেকটি বন্যা ছোট আকারে হলেও তা বিপর্যয়ে গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে। রিডিং বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্যা পূর্বাভাস ও দুর্যোগ ঝুঁকি গবেষক জেফ দা কস্তা আমাকে জানান, এই দুর্যোগের ফলে ধ্বংসাবশেষগুলো বিভিন্ন নদী আটকে দিয়ে উজানে নতুন করে হ্রদ তৈরি করেছে। আকস্মিক বন্যায় ঐ এলাকার অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে তার ভাষায়, প্রথমটির মতো বড় না হলেও দ্বিতীয় আরেকটি বন্যা হলে সেখানে বিপর্যয়ে গুরুতর প্রভাব তৈরি করতে পারে।’ তিনি বলেন, এলাকার হ্রদ ও প্রাকৃতিক বাঁধগুলোর পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা এবং সেগুলো কোথায় ভেঙে যেতে পারে, তা নজরে রাখা এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, কয়েক দিন আগে তিব্বতের একটি হ্রদে আরেকটি ভূমিধসের কারণে নতুন একটি বাঁধ তৈরি হয়েছে। গত বুধবার আকস্মিক বন্যায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের পর নেপালের রাসুয়ার সঙ্গে সংযুক্ত তিব্বতের কেরুংয়ে একটি হ্রদ সৃষ্টি হয়েছে। ফলে এমন আশঙ্কা করা হচ্ছিল যে, হ্রদটি ভেঙে পড়ে আরেকটি বড় বন্যা ঘটাবে। তবে, নতুন হ্রদটি এখন ভরে গেছে এবং নিজে থেকেই শুকিয়ে যাচ্ছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
‘সুড়ঙ্গে আটকে থাকা শ্রমিকদের জন্য বাতাস দেওয়া হচ্ছে’ :ত্রিশূলী-থ্রি এ জলবিদ্যুত্ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে আটকে পড়া শ্রমিকদের কাছে পৌঁছাতে উদ্ধারকর্মীরা সুড়ঙ্গের ওপরের অংশে একটি ছোট ছিদ্র করে ভেতরে পাম্প করে বাতাস ভরছেন। নেপালের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুদান গুরুং শনিবার ফেসবুকে জানান, উদ্ধারকর্মীরা সুড়ঙ্গের শীর্ষভাগে পৌঁছেছেন। তিনি জানান, তারা এখন খননকাজ শুরু করে ভেতরে উদ্ধারকারী দল পাঠাবেন। অন্যদিকে, জ্বালানিমন্ত্রী বিরাজ ভক্ত শ্রেষ্ঠ জানিয়েছেন, এখনো আটকে থাকা শ্রমিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি।
এই সুড়ঙ্গ অভিযানে সহায়তার জন্য ভারত ও চীন উভয় দেশ থেকেই বিশেষজ্ঞ দল পাঠানো হয়েছে। নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজ ২ হাজার ৫০২ জনের মধ্যে একটি বড় অংশই দেশের বিভিন্ন জলবিদ্যুত্ প্রকল্পের শ্রমিক। নিখোঁজ এক শ্রমিকের ছোট ভাই রয়টার্সকে জানান, তিনি গত কয়েক দিন ধরে না ঘুমিয়ে ভাইকে খুঁজে বেড়াচ্ছেন। তিনি আরো বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, আমার পরিবারের মতো আরো অনেক পরিবার চরম দুশ্চিন্তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।’ —বিবিসি ও সিএনএন