রংপুরে একই পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনায় একের পর এক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে মানুষের মনে। ঘটনার সময় আশপাশ এলাকার কেউ জানতে না পারার বিষয়টিও অবাক করেছে। নির্মম ও রহস্যজনক এ হত্যার ঘটনায় উদ্বেগ আর আতঙ্ক বিরাজ করছে রংপুর জুড়ে। এ ব্যাপারে রংপুর কোতোয়ালি থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মিলন চ্যাটার্জি বলেন, আমরা ঘটনার ক্লু বের করে আসামিদের শনাক্ত করে শিক্ষক পরিবারের সোনার গহনাগুলো উদ্ধারসহ সমস্ত আলামত জব্দ করে বিষয়টি জানিয়েছি। এরপরও বিভিন্ন প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছি; তবে ঘটনার তদন্ত পুরোদমে চলছে। যদি কোনো বিষয় থেকে থাকে তা অবশ্যই উদ্ঘাটন হবে। গতকাল অভিযুক্তরা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। তাদেরকে জেল হাজতে প্রেরণ করা হয়েছে। ওদিকে এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্তসহ জড়িতদের শাস্তির দাবিতে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
শুধুমাত্র মাদক সেবন করতে দেখে ফেলায় শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষককে হত্যা, বাড়ির ছাদে খোলা স্থানে ইয়াবা সেবন, পরিবারের একের পর এক চারজনকে হত্যা, অপরাধের ঘটনা জানার মাত্র ৯ ঘণ্টার মধ্যে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার, আদালতে অভিযুক্তদের দায় স্বীকার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
রংপুর জিলা স্কুলের বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষক-শিক্ষার্থী, সমাজের বিভিন্ন স্তরের সচেতন নাগরিকসহ নেটিজেনরা হত্যাকাণ্ডে পুলিশের উদ্ঘাটিত রহস্য নিয়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। সোমবার সকালে রংপুর জিলা স্কুল থেকে সাবেক ও বর্তমান শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা নগরীতে একটি শোক র্যালি বের করে তা নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে। এরপর স্কুলের সামনে মানববন্ধন ও সমাবেশে বক্তব্য রাখেন রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক শফিয়ার রহমান, মাহমুদুন নবী ডলার, সাবেক শিক্ষার্থী অহন ইসলাম, পাপন মাহমুদসহ অন্যরা।
মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী বলেন, প্রশ্ন উঠেছে দুই ছেলে কীভাবে চারজনকে হত্যা করেছে। আসামি সিদ্ধার্থ দাসের বাড়ি গণপতি চক্রবর্তী স্যারের বাড়ির দেয়ালঘেঁষা। মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, স্যারের বাড়ির ছাদে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থকে ইয়াবা সেবনকে দেখে ফেলায় স্যার প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। সেই সময় তারা দু’জন স্যারের ঘাড়ে থাকা গামছা দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। এরপর ছাদে শব্দ শুনে গণপতি স্যারের স্ত্রী প্রীতিলতা সিঁড়ির কাছে আসলে তারা দুজন মিলে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। শব্দ শুনে মেয়ে আগামী চক্রবর্তী সিঁড়ির কাছে আসলে তাকেও একই কায়দায় হত্যা করা হয়। তাদের তিনজনকে হত্যার পর শোবার ঘরে মূল্যবান জিনিসপত্র খুঁজতে গেলে ঘুমন্ত প্রিয়ম চক্রবর্তী উঠে যায় এবং তাদের চিনে ফেলে। এজন্য তাকেও শ্বাসরোধ করে হত্যা করে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ। অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন তাদের দু’জনের পক্ষে চারজনকে হত্যা করা সম্ভব নয়। মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ এক সঙ্গে চারজনকে খুন করেনি। তারা দু’জন মিলে একের পর এক চারজনকে হত্যা করেছে। তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। তদন্ত শেষে হত্যাকাণ্ড নিয়ে নতুন কোনো তথ্য থাকলে জানা যাবে।
হত্যাকাণ্ডের শিকার আগামী চক্রবর্তীর একটি স্ক্রিনশট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ব্যাপক ছড়িয়ে পড়েছে। ওই স্ক্রিনশটে দেখা যাচ্ছে আগামী চক্রবর্তী তার কোনো এক পরিচিত জনকে ৫টা ৫০ মিনিটে লিখেছে, ‘আমার বাসায় কারেন্ট নাই সারারাত, বিদ্যুতের কী জানি নষ্ট হয়েছে। সবার বাসায় কারেন্ট আছে আমার বাসায় নাই। সারারাত জাগলাম। পুলিশ ভোররাতে শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ তার পরিবারের চার সদস্যকে হত্যা করা হয়েছে জানালেও ওই স্ক্রিনশট অনুযায়ী প্রায় ৬টা পর্যন্ত ফেসবুকে সক্রিয় ছিলেন আগামী চক্রবর্তী। এ ব্যাপারে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মিলন চ্যাটার্জি বলেন, ফেসবুক স্ক্রিনশটের বিষয়টি আমার জানা নেই। বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।
১৬৪ ধারায় জবানবন্দি: মাদকসেবনে বাধা দেয়ায় রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও স্ত্রী-সন্তানসহ চারজনকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার দুই যুবক আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। রোববার রাতে রংপুর মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট-২ এর বিচারক এস এম রফিকুল ইসলাম অভিযুক্ত দুই আসামির জবানবন্দি গ্রহণ শেষে কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ দেন। এই তথ্য নিশ্চিত করেন রংপুর মেট্রোপলিটন কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মিলন চ্যাটার্জি। তিনি বলেন, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকসহ চার হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধকে রাতে আদালতে তোলা হলে তারা বিচারকের নিকট ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয়।