সরকার তেলভিত্তিক আইপিপিগুলোর (বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র) বকেয়া পাওনা পরিশোধ করে আরও বেশি পরিমাণে তেলে চালিত কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ নেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। সে অনুযায়ী লোডশেডিং পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার পাশাপাশি শিল্প খাতে সংকট কাটাতে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন ৮০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও চলতি মাসের শুরুতে দেশের ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার বিষয়ে আলোচনা করেন। জানা গেছে, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) সম্প্রতি বেসরকারি কেন্দ্রের মালিকদের ৮০ শতাংশ হারে বিদ্যুৎ দেওয়ার জন্য নির্দেশও দিয়েছে। এ বিষয়ে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের সভাপতিত্বে এক বৈঠক হয়। বৈঠকে গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ফার্নেস তেলের ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধির বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে গতকাল বলেন, ‘লোডশেডিংয়ের চাপ সামলাতে অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে বেশি বিদ্যুৎ নেওয়া হচ্ছে। সন্ধ্যায় সবচেয়ে বেশি বিদ্যুৎ নেওয়া হলেও এখন দিনেও তেলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ নেওয়া হচ্ছে।’ বাংলাদেশ প্রাইভেট পাওয়ার প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশনের (বিপ্পা) সভাপতি ডেভিড হাসনাত বলেন, ‘এ মুহূর্তে সরকারের কাছে এলএনজি নেই। এ পরিস্থিতিতে সংকট কাটানোর দ্রুত সমাধান বেসরকারি কেন্দ্রগুলোর বসে থাকা প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কাজে লাগানো। সরকারের কাছে আগের পাওনা বকেয়া থাকায় এবং তেল না থাকায় এ বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না।
কিন্তু সরকার এখন বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পাওনা মেটালেই দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে তেল আমদানি করা যাবে। এখন বেসরকারি কেন্দ্রগুলো সরকারকে ২ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দিচ্ছে। এর বাইরে বকেয়া পরিশোধ হলে এ কেন্দ্রগুলো আরও বাড়তি ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবে। বাড়তি বিদ্যুৎ পেলে সরকার ৩ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতার গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে এ গ্যাস শিল্প খাতে দিতে পারবে। অর্থাৎ বর্তমানে শিল্প খাতে গ্যাসের যে ঘাটতি আছে তা অনেকটাই কমে আসবে। সরকার চাইলে আমরা ৮০ শতাংশ হারে বিদ্যুৎ দিতে পারব।’
বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকরা জানান, বেসরকারি কেন্দ্রে উৎপাদিত আড়াই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের মূল্যমান একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের গ্যাস, অর্থাৎ ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সমান। সরকার এখন তৃতীয় এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের কথা বলছে। কিন্তু বেসরকারি কেন্দ্রের অলস বসে থাকা ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দেওয়া হলে তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের যে সুবিধা, তা এ বিদ্যুৎ থেকেই পাওয়া যাবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্ববাজারে এলএনজির (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় এলএনজি থেকে তেলভিত্তিক কেন্দ্রের উৎপাদিত বিদ্যুতের মূল্য কম হবে। সরকারও এটি বুঝতে পেরেছে যে এলএনজি থেকে তেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন এখন সাশ্রয়ী। এজন্য দ্রুত বেসরকারি কেন্দ্রগুলোর পাওনা পরিশোধ করে এই কেন্দ্রগুলো থেকে আরও বেশি বিদ্যুৎ নেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। এজন্য সরকার থেকে বেসরকারি কেন্দ্রগুলোকে ৮০ শতাংশ হারে বিদ্যুৎ দেওয়ার জন্য কঠোরভাবে বলা হয়েছে। এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকরা আশা করছেন, এ সপ্তাহের মধ্যেই তাঁদের বকেয়া পাওনা (প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা) সরকার পরিশোধ করবে। ফার্নেস তেল দিয়ে আপাতত ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতি নিয়েছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড।