Image description

বাংলাদেশে হীরার বৈধ আমদানি প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। অথচ দেশের হীরার গয়নার বাজার বছরে এখন প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা। ২০১৮ সালে আমদানি বন্ধ হলেও এত বড় বাজার হলো কীভাবে? এমন প্রশ্নের জবাব খুঁজতে জানা গেছে, দেশের চাহিদার প্রায় শতভাগ হীরাই আসছে অবৈধ পথে। পাশাপাশি পরীক্ষাগারে তৈরি হীরা, মোইসানাইট ও জিরকনের মতো কৃত্রিম পাথরও কোথাও কোথাও প্রাকৃতিক হীরা হিসেবে বিক্রি হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাম্প্রতিক তদন্তে দেখা গেছে, প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩০ কোটি টাকার হীরা ও হীরার গয়না চোরাচালানের মাধ্যমে দেশে ঢুকছে। অর্থাৎ বছরে এর পরিমাণ প্রায় ১০ হাজার ৯৫০ কোটি টাকা। এই অবৈধ বাণিজ্যের কারণে সরকার যেমন বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে, তেমনি হুন্ডির মাধ্যমে দেশ থেকে শত শত কোটি টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে। উচ্চ শুল্কের কারণে বাড়ছে এই চোরাচালান।

সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞরা জানান, বাংলাদেশে পলিশড বা কাটিং করা হীরা আমদানির ওপর শুল্কের হার প্রায় ১৫১ শতাংশ। এই উচ্চ শুল্ক হারের কারণেই মূলত বৈধ পথে হীরা আমদানি করতে চান না ব্যবসায়ীরা। শুল্ক ফাঁকি দিয়ে অধিক মুনাফা লাভের আশায় আন্তর্জাতিক চোরাকারবারি চক্রের সহায়তায় অবৈধ পথ বেছে নেওয়া হচ্ছে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের সুরাট হচ্ছে হীরার কাটিং ও পলিশিংয়ের প্রধান কেন্দ্র। সেখান থেকে কলকাতা হয়ে বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকাগুলোতে হীরা নিয়ে আসা হয়।

চোরাচালানের প্রধান রুট ও কৌশল : আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র জানায়, বেনাপোল, যশোর এবং সাতক্ষীরার মতো সীমান্ত রুটগুলো হীরা চোরাচালানের প্রধান ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ছোট আকারের হওয়ায় হীরা খুব সহজেই শরীরের বিভিন্ন স্থানে বা সাধারণ জিনিসপত্রের ভিতরে লুকিয়ে পারাপার করা সম্ভব। সম্প্রতি বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) যশোরের সীমান্ত এলাকা থেকে প্রায় সাড়ে ৯ কোটি এবং সাড়ে ৬ কোটি টাকা মূল্যের দুটি বড় হীরার গয়নার চালান জব্দ করেছে।

হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাচার : অবৈধ পথে আসা এই হীরার মূল্য পরিশোধের জন্য কোনো বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করা সম্ভব হয় না। ফলে চোরাকারবারিরা দেশের টাকা হুন্ডির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক চক্রের কাছে পাচার করছে। অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)-এর সাম্প্রতিক এক তদন্তে জানা গেছে, দেশের নামকরা জুয়েলারি ব্র্যান্ড ‘ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ড’-এর বিরুদ্ধে সোনা ও হীরা চোরাচালানের মাধ্যমে প্রায় ৬৭৮ কোটি টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগ উঠেছে। এর ফলে দেশের অর্থনীতি দ্বিমুখী ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে, একদিকে রাজস্ব ক্ষতি, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার অপচয়।

বাজারে নকল হীরায় সয়লাব : অবৈধ হীরার পাশাপাশি দেশের বাজারে আরেকটি বড় সংকট তৈরি করেছে নকল এবং কৃত্রিম হীরা। সাধারণ ক্রেতাদের আসল হীরার কথা বলে ল্যাব-গ্রোন ডায়মন্ড (পরীক্ষাগারে তৈরি কৃত্রিম হীরা), মোইসানাইট, জিরকন এবং অত্যন্ত সস্তা প্লাস্টিক স্টোন বা কাচের টুকরো চড়া দামে গছিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বৈধ আমদানি ডকুমেন্ট ও সঠিক সার্টিফিকেশন না থাকায় সাধারণ ক্রেতারা আসল ও নকলের পার্থক্য ধরতে পারছেন না এবং প্রতিনিয়ত প্রতারিত হচ্ছেন। বাংলাদেশে এক ক্যারেট বা শূন্য দশমিক ২ গ্রাম প্রাকৃতিক হীরার দাম ৮৩ হাজার টাকারও বেশি হতে পারে। তাই ৫ হাজার টাকা বা তার কম দামে হীরার নাকফুল বিক্রির বিজ্ঞাপন স্বাভাবিকভাবেই পণ্যের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে। ২০২২ সালে লন্ডন ও নিউইয়র্কভিত্তিক আন্তর্জাতিক রত্ন পরীক্ষাগার সলিটেয়ার জেমোলজিক্যাল ল্যাবরেটরিজ বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরু করে। ঢাকার বাংলামোটরে তাদের পরীক্ষাগারে হীরা পরীক্ষা করে সনদ দেওয়া হয়। আসল পাথরের ক্ষেত্রে সনদ নম্বরও খোদাই করা থাকে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, পরীক্ষায় বাজারে থাকা আসল ও নকল-দুই ধরনের পাথরই শনাক্ত হয়েছে।

চোরাচালানই কি বড় উৎস : বাংলাদেশে বিমানপথে যাত্রীর সঙ্গে হীরা আনার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে রয়েছে উচ্চ শুল্ক। বন্ড সুবিধা ছাড়া অপরিশোধিত হীরায় প্রায় ৮৯ শতাংশ এবং পালিশ করা হীরায় প্রায় ১৫১ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক দিতে হয়। ব্যবসায়ীদের একাংশের মতে, এই উচ্চ শুল্কই অবৈধ আমদানিকে উৎসাহিত করছে। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ভারতের সুরাট বিশ্বের অন্যতম বড় হীরা কাটা ও পালিশের কেন্দ্র বাংলাদেশে চোরাই হীরা আসার অন্যতম উৎস। সীমান্ত এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন অভিযানে উদ্ধার হওয়া হীরাও অবৈধ বাণিজ্যের ব্যাপকতার ইঙ্গিত দেয়।

গত ২ এপ্রিল যশোরে এক ভারতীয় নাগরিকের কাছ থেকে ১৫৫ দশমিক ৭৬ গ্রাম হীরা এবং প্রায় ৬ কোটি ৬২ লাখ টাকার বৈদেশিক মুদ্রা উদ্ধার করে বিজিবি। এর আগে ২০২৫ সালের ৩০ জানুয়ারি যশোরের পাঁচভুলোট সীমান্ত এলাকায় প্রায় ১০ কোটি টাকা মূল্যের হীরার গয়নাসহ এক সন্দেহভাজন চোরাকারবারিকে আটক করা হয়। ২০২১ সালে সাতক্ষীরায় প্রায় ২ কোটি টাকা মূল্যের ১৪৪টি হীরার গয়না উদ্ধার করেছিল কর্তৃপক্ষ। বিভিন্ন সময় বিজিবির আরও কয়েকটি অভিযানে হীরা উদ্ধারের ঘটনাও ঘটেছে।

বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি (বাজুস) হীরার অলংকার কেনার ক্ষেত্রে প্রতারণা এড়াতে সারা দেশে ক্রেতাদের অধিক সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছে অনেক আগে থেকেই। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে সংগঠনটি এ বিষয়ে সতর্ক হতে এক বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানায়, একটি প্রতারকচক্র ডায়মন্ড হাউস নামে বিভিন্ন স্থানে ভুঁইফোঁড় বিক্রয়কেন্দ্র খুলছে। এসব বিক্রয়কেন্দ্র থেকে হীরার অলংকার না কেনার পরামর্শ দিয়েছে বাজুস। হীরার অলংকার কেনাবেচার বিষয়েও কিছু নির্দেশনা দেয় সংগঠনটি। তারা বলেছে, ৫০ সেন্টের ওপর সব ধরনের হীরার গয়নার ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক সনদ প্রদান করতে হবে। হীরার গয়নায় ১৮ ক্যারেটের কম মানের স্বর্ণ ব্যবহার করা যাবে না। বিক্রির সময় ক্যাশ মেমোতে গুণগত মান নির্দেশক উল্লেখ করতে হবে।