Image description

ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থাকে আরও সহজ, নিরাপদ ও সর্বজনীন করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে চালু হওয়া ‘বাংলা কিউআর’ দেশের অর্থনীতিতে নতুন বিপ্লবের সূচনা করেছে। গত
১লা জুলাই থেকে ‘এক দেশ এক কিউআর’ নীতির আওতায় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে এই কোড প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করার পর অভাবনীয় সাড়া মিলেছে। স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটভিত্তিক এই লেনদেন ব্যবস্থা সাধারণ গ্রাহক থেকে শুরু করে প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছে ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। মাত্র দেড় মাসের ব্যবধানে কিউআর কোডভিত্তিক লেনদেনের পরিমাণ প্রায় তিনগুণ বেড়ে দৈনিক ১১০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। সেইসঙ্গে আগামী ১লা নভেম্বর থেকে ব্যক্তিপর্যায়েও (পিটুপি) এই কোড ব্যবহার করে লেনদেনের সুবিধা চালু হতে যাচ্ছে। ফলে ‘ক্যাশলেস বাংলাদেশ’ বা নগদবিহীন সমাজ গড়ার লক্ষ্যমাত্রা দ্রুত বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে বলে মনে করছেন আর্থিক খাত সংশ্লিষ্টরা।

বাংলা কিউআর কী?:
এতদিন দোকানে পেমেন্ট করার জন্য বিকাশ, নগদ, রকেট বা বিভিন্ন ব্যাংকের আলাদা আলাদা কিউআর কোড স্ক্যান করতে হতো। গ্রাহকের ফোনে নির্দিষ্ট অ্যাপ না থাকলে পেমেন্ট করা যেতো না। এই ভোগান্তি দূর করতেই বাংলাদেশ ব্যাংক ও ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচ বাংলাদেশের (এনপিএসবি) যৌথ তত্ত্বাবধানে ‘বাংলা কিউআর’ চালু করা হয়েছে। এটি এমন একটি সর্বজনীন পেমেন্ট কোড, যা স্ক্যান করে গ্রাহক যেকোনো ব্যাংক বা মোবাইল আর্থিক সেবার (এমএফএস) অ্যাপ দিয়ে মুহূর্তেই বিল পরিশোধ করতে পারেন।

দ্রুত বাড়ছে লেনদেন ও মার্চেন্ট সংখ্যা:
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই মাসের শুরুতে বাংলা কিউআরে দৈনিক গড়ে ১ লাখ ৭৮ হাজার লেনদেনের মাধ্যমে ৩৭ কোটি ৩৩ লাখ টাকার কেনাকাটা হতো। সেখানে গত ১৬ থেকে ২২শে আগস্ট পর্যন্ত প্রতিদিন গড়ে ৩ লাখ ৩ হাজার লেনদেন হয়েছে, যার আর্থিক মূল্য ১১০ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। লেনদেনের পাশাপাশি দ্রুত বাড়ছে মার্চেন্ট বা বিক্রেতার সংখ্যা। জুলাইয়ের শুরুতে দেশে বাংলা কিউআর ব্যবহারকারী মার্চেন্ট ছিল ১৬ থেকে ২৪ লাখের ঘরে, যা বর্তমানে ৩০ লাখ ৩১ হাজার ৯০৮-এ উন্নীত হয়েছে। মার্চেন্ট প্রতিস্থাপনে শীর্ষ পাঁচে রয়েছেÑ বিকাশ, নগদ, পূবালী ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক ও টালিপে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক নির্বাহী পরিচালক বলেন, অতি ক্ষুদ্র চায়ের দোকান থেকে শুরু করে বড় বড় শপিংমলেও বাংলা কিউআরের মাধ্যমে লেনদেন সফলভাবে চলছে।

আসছে ব্যক্তি পর্যায়ের লেনদেন:
বাণিজ্যিক লেনদেনের গণ্ডি পেরিয়ে এবার ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি পর্যায়েও বাংলা কিউআর কোড স্ক্যান করে অর্থ লেনদেনের সুবিধা আনতে যাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন জানান, আগামী ১লা নভেম্বর থেকে প্রস্তুতি নিতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে চিঠি দিয়ে জানিয়ে দেয়া হয়েছে। নতুন এই ব্যবস্থা চালু হলে প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য একটি নির্দিষ্ট কিউআর কোড থাকবে। এর মাধ্যমে ব্যাংক থেকে ব্যাংক, এমএফএস থেকে এমএফএস এবং ব্যাংক ও এমএফএসের মধ্যে সহজেই অর্থ স্থানান্তর করা যাবে।

ব্যবসায়ীদের মাশুল প্রত্যাহার:
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ডিজিটাল লেনদেনে উৎসাহিত করতে গত ১০ই আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংক ‘বাংলা কিউআর’ পরিশোধে মার্চেন্ট থেকে কাটা সর্বনিম্ন ১ শতাংশ চার্জের বাধ্যবাধকতা প্রত্যাহার করেছে। এ ছাড়া, ক্যাশলেস লেনদেনকে জনপ্রিয় করতে ১০০ কোটি টাকার একটি তহবিল গঠন করা হয়েছে। আগামী ১লা অক্টোবর থেকে প্রতিটি দুই হাজার টাকা পর্যন্ত লেনদেনে একুয়ারিং প্রতিষ্ঠান ১০০ টাকায় ১০ পয়সা এবং ইস্যুয়িং প্রতিষ্ঠান ২০ পয়সা হারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ভর্তুকি পাবে।

চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা:
লেনদেন বাড়লেও বাংলা কিউআর পুরোপুরি সফল করতে বেশ কিছু বাধা রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আয়কর ও ভ্যাটের আওতায় আসার ভীতি। এ ছাড়া, দেশের প্রায় ৪৩ শতাংশ মানুষ এখনো ইন্টারনেট সেবার বাইরে থাকায় এবং নিরবচ্ছিন্ন নেটওয়ার্কের অভাবে প্রান্তিক পর্যায়ে এর প্রসার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক সময় এক ব্যাংকের কিউআর অন্য ব্যাংকের অ্যাপ দিয়ে স্ক্যান করার ক্ষেত্রে কারিগরি ত্রুটিও দেখা যাচ্ছে।

সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য:
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কারিগরি ত্রুটি দূর করার পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের করকাঠামো সহজ করা এবং দেশব্যাপী ব্যাপক প্রচারণা চালানো গেলে ‘ক্যাশলেস বাংলাদেশ’ গড়ার স্বপ্ন দ্রুতই বাস্তবে রূপ নেবে।

সম্প্রতি চট্টগ্রামে এক প্রচারাভিযানে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান বলেন, ডিজিটাল পেমেন্টের ব্যবহার বাড়লে চাঁদাবাজি কমানো, জাল টাকার ঝুঁকি হ্রাস এবং আর্থিক লেনদেন আরও স্বচ্ছ করা সম্ভব হবে। তিনি আরও জানান, সরকার প্রতি বছর মুদ্রা ছাপাতে যে বিপুল টাকা ব্যয় করে, নগদ লেনদেন কমলে সেই ব্যয়ও কমানো সম্ভব হবে।
বিআইবিএমের অধ্যাপক ড. শাহ মো. আহসান হাবীব মনে করেন, ছোট ব্যবসায়ীরাই এতে বেশি সুবিধা পাবেন। নগদ টাকা বহনের ঝুঁকি এবং খুচরা টাকার ঝামেলা থেকে তারা মুক্তি পাবেন।