বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী ঢলের ৯ বছর পূর্ণ হলো আজ। গত ৯ বছরে একজন রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠানো সম্ভব না হলেও বাংলাদেশে তাদের উপস্থিতি বেড়েছে প্রায় সাড়ে ৪ লাখ। রোহিঙ্গারা নিজেরা ফেরত যেতে চাইলেও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন শর্তে তাদের জীবন আটকে আছে ক্যাম্পেই। এখন তারা শুধু আলোচনারই বিষয়। আন্তর্জাতিক সভা সেমিনার, দ্বিপক্ষীয়, ত্রিপক্ষীয় ও আঞ্চলিক নানা উদ্যোগেও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের কার্যকর কোনো সমাধানই পাওয়া যায়নি। তাই বিশ্লেষকরা বলছেন, সময় অনেক পেরিয়ে গেছে বাংলাদেশের এখন রোহিঙ্গা নীতি পরিবর্তন প্রয়োজন। ভাবতে হবে নতুন পথ এবং নতুন কোনো পদ্ধতি।
জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা-ইউএনএইচসিআরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের এই দিনে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর দমন-পীড়ন থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন ৭ লাখ রোহিঙ্গা। এরপর ধাপে ধাপে বিভিন্ন সময় আরও রোহিঙ্গা নাফ নদ পেরিয়ে আসতে থাকে বাংলাদেশে। ২০২০ সালে প্রথমবারের মতো শরণার্থী শিবিরগুলোতে থাকা রোহিঙ্গাদের সংখ্যা জানায় ইউএনএইচসিআর ও বাংলাদেশ সরকার। সে সময় ক্যাম্পগুলোতে ৮ লাখ ৬৬ হাজার ৪৫৭ জন রোহিঙ্গা ছিলেন। অন্যদিকে ইউএনএইচসিআরেরর ২০২৬ সালের ৩১ জুলাইয়ের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্যাম্পে আশ্রিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ লাখের বেশি। এখন ৯ বছর পর বর্তমানে বাংলাদেশের বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে আশ্রিত নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ লাখ ২ হাজার ৩৪ জন। সবশেষ ২০২৩ সালের শেষ দিকে রাখাইনে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ার পর অন্তত দেড় লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। এর মধ্যে কক্সবাজারে ৩৩টি ক্যাম্পে আছে ১১ লাখ ৬৮ হাজার ৩৭৫ জন এবং নোয়াখালীর ভাসানচরের শরণার্থী শিবিরে আছেন ৩৩ হাজান ৬৫৯ জন রোহিঙ্গা। ৯ বছরে একজন রোহিঙ্গাকে ফেরত না পাঠাতে পারলেও নতুন করে আশ্রয় নিয়েছেন আরও অন্তত সাড়ে চার লাখ রোহিঙ্গা। নিবন্ধিতদের বাইরেও আরও প্রায় ২ লাখ রোহিঙ্গা আছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট সরকারি ও বেসরকারি কর্মকর্তারা।
বারবার ব্যর্থ উদ্যোগ : ২০১৮ ও ২০১৯ সালে প্রত্যাবাসনের জন্য দিনক্ষণ নির্ধারণ করা হলেও রোহিঙ্গাদের অনাগ্রহ, মিয়ানমারের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও নাগরিকত্বের নিশ্চয়তার ঘাটতির কারণে তা কার্যকর হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে অবশ্য কূটনৈতিক তৎপরতায় কিছুটা অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। চলতি মাসে মিয়ানমার জানিয়েছে, বাংলাদেশের পাঠানো ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জনের তালিকা থেকে ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনের তথ্য তারা যাচাই করেছে। এর মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইনের নিবন্ধিত বাসিন্দা হিসেবে নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে প্রত্যাবাসনের বাস্তব পরিবেশ নিয়ে এখনো বড় প্রশ্ন রয়েছে। রাখাইনের বড় অংশ এখন আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে। সেখানে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মির সংঘাত অব্যাহত রয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন, চলাচলে বাধা এবং খাদ্য ও জীবিকার সংকটও রয়েছে। ফলে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও টেকসই প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি হয়েছে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে।
দরকার নতুন কৌশল : রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের নীতি নতুন করে সাজানোর পরামর্শ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা। এজন্য দ্বিপক্ষীয় ও ত্রিপক্ষীয় উদ্যোগের বাইরে গিয়ে ‘আরাকান স্টেবিলাইজেশন প্ল্যান’ বাস্তবায়নের পরামর্শ দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ। তিনি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, এখন পর্যন্ত দ্বিপক্ষীয় ও ত্রিপক্ষীয় নানা উদ্যোগের মাধ্যমে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের চেষ্টা করা হয়েছে। এসব উদ্যোগ কোনো কাজে আসেনি। ফলে ‘আরাকান স্টেবিলাইজেশন প্ল্যান’ বাস্তবায়নের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কাঠামো উন্নয়ন করতে হবে। জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেইজিং সফরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডরের প্রস্তাব দিয়েছেন। এই করিডর বাস্তবায়িত হলে তা স্বাভাবিকভাবেই রাখাইনের ওপর দিয়েই যাবে। ইমতিয়াজ আহমেদ আরও বলেন, এই ইকোনমিক করিডরের মাধ্যমে রোহিঙ্গা সংকট সমস্যার সমাধানও সম্ভব। চীন যেহেতু ইকোনমিক করিডরের প্রস্তাব দিয়ে সেই সুযোগটা তৈরি করে দিয়েছে তা কাজে লাগানো দরকার। তবে তার আগে গবেষণা করে দেখা দরকার এর মাধ্যমে বাংলাদেশের কী লাভ হবে এবং রোহিঙ্গা সমস্যা কীভাবে সমাধান হতে পারে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ৯ বছর অনেক ধরনের চেষ্টাই তো করা হলো। এখন নতুনভাবে চিন্তা করার সময় এসেছে। রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে আমরা মূলত জাতিসংঘকেন্দ্রিক চেষ্টা করেছি। আন্তর্জাতিকভাবে এটা অনেক বড় পরিসর হলেও এই সমস্যার সমাধানে দুই-তিনটা শক্তির প্রভাব সবচেয়ে বেশি। তারা একটু সক্রিয় হলেই রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান সম্ভব। এর মধ্যে চীন ও আশিয়ান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম গতকাল বলেছেন, সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের সম্মানজনক প্রত্যাবাসনের পথেই হাঁটছে বাংলাদেশ। রোহিঙ্গাদের সমস্যা সরকারের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিকভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। রোহিঙ্গাদের এই বিপর্যয়ের কথা আন্তর্জাতিক ফোরামে বারবার বলে আসছি। রোহিঙ্গাদের যাতে সম্মানজনক ও নিরাপদে প্রত্যাবাসন করা হয় সেই দাবি জানানো হচ্ছে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অনিশ্চিত জীবনের কথা তুলে ধরে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছেন, দশ বছর অনেক লম্বা সময়। কিন্তু ক্যাম্পে বেড়ে ওঠা শিশুর জন্য দশ বছর হচ্ছে তার শৈশব। একজন যুবকের জন্য এটা পড়াশোনাহীন থাকা। একটি পরিবারের জন্য এটা ঘরবাড়িহীন একটি দশক। আর একটি সম্প্রদায়ের জন্য এটি অনিশ্চয়তায় জন্ম নেওয়া প্রজন্ম। আমরা দশ বছরকে বিশ বছর হতে দিতে পারি না।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের শীর্ষ এক কর্মকর্তা জানান, এরই মধ্যে সরকার রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় নতুন জাতীয় কর্মকৌশল তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। জুলাইয়ে প্রধানমন্ত্রীকে সভাপতি করে ১১ সদস্যের ‘রোহিঙ্গাবিষয়ক জাতীয় কর্মকৌশল প্রণয়ন কমিটি’ গঠন করা হয়েছে। প্রত্যাবাসনসহ সংকটের বিভিন্ন বিষয়ে অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যপরিধি নির্ধারণ এই কমিটির অন্যতম দায়িত্ব।
সহায়তা কমায় বড় চাপে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও স্থানীয় জনগোষ্ঠী : শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয় সূত্র জানায়, দীর্ঘস্থায়ী এই সংকটের সবচেয়ে বড় চাপ পড়ছে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর। প্রায় এক দশক ধরে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিতে গিয়ে খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নিরাপত্তা, পানি, স্যানিটেশন ও অবকাঠামো খাতে ব্যাপক ব্যয় করতে হচ্ছে। জাতিসংঘ ও সহযোগী সংস্থাগুলো ২০২৬ সালে রোহিঙ্গা শরণার্থী ও আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর জরুরি প্রয়োজন মেটাতে ৭১০ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার সহায়তার আবেদন জানিয়েছে। এই অর্থ দিয়ে কক্সবাজার, ভাসানচর এবং উখিয়া-টেকনাফের আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীসহ প্রায় ১৬ লাখ মানুষের প্রয়োজন মেটানোর পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় সংকট আরও জটিল হচ্ছে। খাদ্য, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে অর্থের সংকট তৈরি হয়েছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা জানিয়েছে, অর্থায়নের ঘাটতির কারণে রোহিঙ্গা শিবিরে জরুরি সেবাগুলোও ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।
রোহিঙ্গা রিফিউজি রেসপন্স বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর রোহিঙ্গা শরণার্থী সহায়তার মোট চাহিদার কেবল ৪৬ শতাংশ পাওয়া গেছে। ৯৩৪ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার চাহিদা থাকলেও পাওয়া গেছে মাত্র ৩৮৮ মিলিয়ন ও প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে ৪৬ মিলিয়ন ডলারের। এ ছাড়া রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা দিনদিন কমে যাচ্ছে। ২০১৮ সালে রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা ছিল ৬৮৮ দশমিক ১ মিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে গতকাল রোহিঙ্গাদের জন্য বরাদ্দ এসেছে ৪৩৪ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার। আট বছরের রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সংখ্যা ও চাহিদা বাড়লেও সহায়তা কমেছে এক-তৃতীয়াংশ।
ঘরে ফিরতে চায় ওরা : শরণার্থী শিবিরের রোহিঙ্গাদের বড় একটি অংশ নিজ দেশে ফিরতে চায়। বিশেষ করে মধ্য বয়সি যুবকরা বলছেন, এটা মানুষের জীবনযাত্রা হতে পারে না। আমার পূর্বের আরাকানের পরিবেশে ফিরতে চাই। তাদের চাওয়া, ফিরে গিয়ে যেন আবারও নির্যাতন, বাস্তুচ্যুতি কিংবা নাগরিকত্বহীনতার শিকার হতে না হয়। রোহিঙ্গারা বলছে, মিয়ানমারে নিরাপদ পরিবেশ, নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা, নিজেদের জাতিগত পরিচয়ের স্বীকৃতি এবং ভিটেমাটি ও সম্পত্তির অধিকার নিশ্চিত হলেই তারা মর্যাদার সঙ্গে স্বদেশে ফিরতে প্রস্তুত।