Image description

রাজনৈতিক দল হিসাবে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে সব মানবতাবিরোধী অপরাধ ও সন্ত্রাসের অভিযোগের তদন্ত চলছে। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রতিপক্ষকে দমনে রক্ষীবাহিনী গঠন থেকে শুরু করে দলটির সব ধরনের অপরাধ তদন্তের আওতায় আনার কাজ শুরু হয়েছে। রক্ষীবাহিনীর অপরাধের তদন্ত ছাড়াও ২০০৬ সালে রাজধানীর পল্টনে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের লগি-বৈঠার হামলায় নির্মমভাবে নিহত বিএনপি-জামায়াত নেতাকর্মীদের হত্যার ঘটনার তদন্তও হচ্ছে। তদন্তে দোষী সাব্যস্ত হলে আওয়ামী লীগের প্রণয়ন করা ট্রাইব্যুনাল আইনের বিধান অনুযায়ী দলটি নিষিদ্ধসহ সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হতে পারে।

ট্রাইব্যুনাল সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের ২ নম্বর ধারা সংশোধন করে ‘অরগানাইজেশন’ বা ‘সংগঠন’ শব্দটি যুক্ত করে ২০১৩ সালে। এখন এই আইনেই রাজনৈতিক দল হিসাবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের লক্ষ্যে এগোচ্ছে সরকার।

রাজনৈতিক দল হিসাবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্ত চলমান আছে বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার সমন্বয়ক (কো-অর্ডিনেটর) আনসার উদ্দিন খান পাঠান। তিনি যুগান্তরকে বলেন, জার্মানিসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন নাৎসি বাহিনী নৃশংস অত্যাচার চালিয়েছিল, ১৯৪৫-৪৬ সালে নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালে নাৎসি বাহিনীর বিচার করা হয়। তাদের দলও নিষিদ্ধ হয়। স্বাধীন বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের দ্বারা যত অপরাধ কর্মকাণ্ড হয়েছে তারও তদন্ত হচ্ছে। বিশেষ করে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে রক্ষীবাহিনী গঠন, ১৯৭৫ সালে ক্রসফায়ারে বিপ্লবী সিরাজ শিকদার হত্যা থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগ আমলের সব অপরাধ তদন্তের আওতায় আসছে।

আনসার উদ্দিন খান পাঠান বলেন, একটা গণতান্ত্রিক দলের প্রতি মানুষের যে প্রত্যাশা থাকে সেটার ব্যত্যয় আওয়ামী লীগ কখন কখন ঘটিয়েছে, তা শুরু থেকে এখন পর্যন্ত আমরা দেখার চেষ্টা করছি। বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর, তাই আমরা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছি। কবে নাগাদ তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, অনেক দিনের ঘটনা, একটু সময় লাগতে পারে। বিদ্যমান ট্রাইব্যুনাল আইনেই আওয়ামী লীগের বিচার করা সম্ভব। বিচারে অপরাধ প্রমাণিত হলে নিষিদ্ধ হতে পারে দলটি।

জানা যায়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় রাজনৈতিক দল হিসাবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ এনে ট্রাইব্যুনালে আবেদন করেছিল জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন (এনডিএম)। আবেদনটি তদন্ত সংস্থায় আসার পর একটি টিম তদন্ত কার্যক্রম শুরু করে। চলতি বছরের ৮ এপ্রিল সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িত ব্যক্তি বা সত্তার কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করার বিধান যুক্ত করে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) অধ্যাদেশ অনুমোদন করে জাতীয় সংসদ। অন্যদিকে ২০২৫ সালের ১০ মে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন সংশোধন করে অধ্যাদেশ জারি করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এতে কোনো রাজনৈতিক দল, তার অঙ্গসংগঠন বা সমর্থক গোষ্ঠীকে শাস্তি দিতে পারবেন ট্রাইব্যুনাল।

ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা অভিযোগ থেকে জানা যায়, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরে ‘বন্দুকযুদ্ধ’ বা ‘ক্রসফায়ার’র নামে অন্তত ১ হাজার ৯২৬ জন বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে নিহত হওয়ার এ হিসাব বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) কাছেও রয়েছে। এছাড়া জাতিসংঘের প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে এক হাজার ৪০০ জন নিহত হয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। জুলাই হত্যাকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড ও ২৫ হাজার ছাত্র-জনতাকে আহত করার নির্দেশদাতা হিসাবে পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।

শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলে বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষকে দমন করতে রক্ষীবাহিনীকে ব্যবহার করা হয়েছিল। এই দমন-পীড়নে প্রায় ৩০ হাজার রাজনৈতিক কর্মী ও মানুষ নিহত হন। তোফায়েল আহমেদ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব এবং আওয়ামী লীগের যুবসংগঠনের শীর্ষ নেতা হওয়ায় তাকে রক্ষী বাহিনীর বিষয়ে দায়িত্ব দেওয়া হয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ তার বিভিন্ন বই ও নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন, রক্ষীবাহিনীর হাতে বহু মানুষ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন।

ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে প্রাথমিক অভিযোগ পাওয়া গেলে দলটির বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার সুযোগ আছে। সংগঠন হিসাবে আওয়ামী লীগের বিচার হবে কি হবে না, সে বিষয়ে সংস্থা তদন্ত হচ্ছে। তদন্ত করার পর যদি সংগঠন হিসাবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে প্রাথমিক অভিযোগ পাওয়া যায়, তাহলে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর হিসাবে প্রতিবেদন প্রাপ্তি সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার সুযোগ আছে।

সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে যুগান্তরকে বলেন, ২০২৫ সাল থেকে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তদন্তের প্রক্রিয়া চলমান ছিল। এরই ধারাবাহিকতায় আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিদ্যমান আইনেই আওয়ামী লীগের বিচার করা সম্ভব। তিনি বলেন, দলকে তো আর সাজা দেওয়া যাবে না। কিন্তু দলকে কী ধরনের সাজা দেওয়া যাবে তা ট্রাইব্যুনালের সংশোধিত আইনে বলা আছে। যেমন, দল নিষিদ্ধ করা, নিবন্ধন বা লাইসেন্স স্থগিত করা; অথবা সম্পত্তি জব্দ করার নির্দেশনা ইস্যু করা।