Image description

ক্ষমতার পালাবদল হলেও হবিগঞ্জের রেমা-কালেঙ্গা ও সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে থামেনি বন উজাড়। উলটো রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সংরক্ষিত বনের গাছ কেটে পাচারের অভিযোগে এবার একই মামলায় আসামি হয়েছেন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির স্থানীয় নেতাসহ অন্তত ২০ জন। এ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক গোপনীয় প্রতিবেদনের পর নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই গাছ চুরি ও কাঠ পাচারের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া শুরু করেছে বন বিভাগ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে হবিগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. তারেক মাহমুদ যুগান্তরকে বলেন, সাতছড়ির বন উজাড়ের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। তারা পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে গাছ কেটে নেয়।

তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান থেকে গাছ কাটা ও চোরাই কাঠ পাচারের অভিযোগ নিয়ে সম্প্রতি একটি বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থা অনুসন্ধান চালায়। পরে তারা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একটি গোপনীয় প্রতিবেদন জমা দেয়। ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ৭ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপর ২০ জুলাই পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় থেকেও মামলা করার নির্দেশনা আসে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৮ আগস্ট চুনারুঘাট থানায় বন আইনে মামলাটি করেন সাতছড়ি বন্যপ্রাণী রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. মোবারক হোসেন। মামলা নম্বর ৩৪।

মামলার আসামিদের মধ্যে রয়েছেন-মিরাশী ইউনিয়ন কৃষক লীগের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান সোহাগ, চুনারুঘাট উপজেলা ছাত্রদলের সদস্য সচিব মো. মারুফ মিয়া, উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক করিম সরকার, উপজেলা শ্রমিক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক জাহাঙ্গীর খান এবং যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক শফিক মিয়া মহালদার।

এজাহারে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ১২ জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ১৫ মে পর্যন্ত সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের সংরক্ষিত বনভূমি থেকে আসামিরা অবৈধভাবে গাছ কেটে ও উপড়ে ফেলেন। এতে বনজ সম্পদের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৫ লাখ টাকা বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। মামলায় গাছ কাটার অভিযোগে ১২ জন এবং চোরাই কাঠ কেনা ও পাচারের অভিযোগে ৮ জনকে আসামি করা হয়েছে।

জেলা পুলিশের একজন কর্মকর্তা যুগান্তরকে জানান, গত ১৭ বছর ধরে সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ-সদস্য মাহবুব আলী ও ব্যারিস্টার সুমনের দাপটে স্থানীয় কৃষক লীগ নেতা মিজানুর রহমান সোহাগ রেমা-কালেঙ্গার মূল্যবান বৃক্ষসম্পদ লুটে নিয়ে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক দৃশ্যপট পালটালেও থামেনি তার অপতৎপরতা। নতুন করে অসাধু বন কর্মকর্তা ও স্থানীয় বিএনপি নেতাদের সঙ্গে আঁতাত করে গড়ে তোলেন ‘রাজনৈতিক চোর সিন্ডিকেট’। ছাত্র-জনতার ওপর হামলা ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলাসহ তার বিরুদ্ধে ৯টি মামলা রয়েছে।

২০ আসামির তালিকা : গাছ কাটার অভিযোগে আসামিরা হলেন-মারুফ মিয়া (দেওরগাছ), মুনায়েম (উত্তর আমকান্দি), শফিকুল ইসলাম আবুল (রতনপুর), কালা মিয়া (দেওরগাছ), আব্দুল কুদ্দুস (কাঁঠালবাড়িয়া), জসিম (মাজিসাইল), তাহির মিয়া (গাজীপুর), আ. জলিল মিয়া (বদরগাজী), রফিক মিয়া, হেলাল মিয়া, মকবুল মিয়া (করমপুর) এবং মাসুম বিল্লাহ (ইটাখোলা)। চোরাই কাঠ কেনা ও পাচারের আসামিরা হলেন-মারুফ মিয়া (ময়নাবাদ), জাহাঙ্গীর খান (আইটন), শফিক মিয়া মহালদার (ধলাইপাড়), করিম সরকার (পাকুরিয়া), বেলাল (কৃষ্ণনগর), জমরুত (বড়াব্দা), সোহেল মিয়া (পাকুরিয়া) ও মিজানুর রহমান সোহাগ (রতনপুর)।

পুলিশের অভিযান : চুনারুঘাট থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, বন আইনের ২৬ (১ক)-এর (খ) ও (ঘ) ধারায় মামলাটি করা হয়েছে। তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে থানার সাব-ইন্সপেক্টর নুরুজ্জামানকে। আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান শুরু হয়েছে বলেও জানান তিনি। এদিকে আলোচিত এই মামলার পর থেকে অভিযুক্ত রাজনৈতিক দলের সদস্যরা পলাতক থাকায় তাদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

বন রক্ষায় নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন : রেমা-কালেঙ্গা ও সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান দেশের গুরুত্বপূর্ণ বন ও জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ এলাকা। এসব বনাঞ্চল থেকে বছরের পর বছর ধরে গাছ কাটা ও কাঠ পাচারের অভিযোগ থাকলেও কার্যকর ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় কেউ বন উজাড়ে জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।