Image description

বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদ উপাচার্য (ভিসি)। শিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়ন, একাডেমিক পরিবেশ নিশ্চিত করা, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘমেয়াদি নানা পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ভিসির ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অথচ দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এই পদে নিয়োগ ঘিরে বিতর্ক পিছু ছাড়ছে না। নিয়োগের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে প্রজ্ঞাপন বাতিল, মাসের মধ্যে ভিসিকে সরিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে।

বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন লঙ্ঘন করে পছন্দের প্রার্থীকে ভিসি পদে বসানো হয়েছে। এ ছাড়াও বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি নিয়োগে ক্ষেত্রে মেধা, যোগ্যতা, দক্ষতা, গবেষণা ও একাডেমিক ডিগ্রিকে খুব বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়নি। নিয়োগ পাওয়া এসব ভিসির অনেককে ঘিরে রয়েছে নানা বিতর্ক।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দেশে ৫৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রায় ৩০টি পদে ভিসি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এসব নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যক্তিগত পছন্দ, দলীয় ঘনিষ্ঠতা, সুপারিশ ও তদবিরের অভিযোগ রয়েছে। কোনো কোনো নিয়োগের ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে, যা টাকার অঙ্কে ৫ কোটি পর্যন্ত। দেশের একটি বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক দলের শিক্ষক সিন্ডিকেট এসব নিয়োগে সক্রিয় ছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

শিক্ষাসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর মানুষের প্রত্যাশা ছিল, দলীয় পরিচয় বা কোটায় নয়-মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে ভিসি নিয়োগ অগ্রাধিকার পাবে। কিন্তু ঘটেছে উলটো। দলীয় আনুগত্য ও বিষয়ভিত্তিক-একাডেমিক দক্ষতার ঘাটতি থাকা ব্যক্তিদেরও এ পদে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার পরিবর্তন হলেই দলীয় শিক্ষকরা ভিসির মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে বসতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। এজন্য যা যা করা দরকার তারা সব ধরনের চেষ্টাই করেন। এভাবে কেন তারা নিয়োগ পেতে মরিয়া হয়ে উঠেন-এমন প্রশ্নেরও জবাব রয়েছে। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন, উন্নয়ন ও সংস্কার কাজ, টেন্ডার, শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ এসব কাজে বিপুল অঙ্কের অর্থের লেনদেনের ঘটনা ঘটে। ফলে ভিসি পদটি হয়ে উঠেছে লোভনীয়। আর এসব উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এভাবেই নিয়োগ প্রক্রিয়া চালু থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল কাজ গবেষণার মাধ্যমে নতুন নতুন উদ্ভাবনী শক্তির বিকাশ ঘটানোর কাজটি ব্যাহত হচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিং থেকে ছিটকে পড়েছে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।

আইন লঙ্ঘন করে নিয়োগ : গাজীপুর ইউনিভার্সিটি অব ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজি বাংলাদেশের (ইউএফটিবি) ভিসি হিসাবে নিয়োগ পেয়েছেন অধ্যাপক ড. মো. মোক্তার আলী। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে রয়েছে, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে খ্যাতিসম্পন্ন ও প্রশাসনিক কাজে অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে ভিসি হিসাবে নিয়োগ দিতে হবে। সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হিসাবে নিয়োগ পান অধ্যাপক ড. মো. জাকির হুসাইন। তিনি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে স্বনামধন্য একজন শিক্ষাবিদকে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি পদে নিয়োগ প্রদান করতে হবে-আইনে এমনটিই বলা আছে। নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ এমন একজনকে ভিসি নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন মানা হয়নি। একই ভাবে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি করা হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. এবিএম শহিদুল ইসলামকে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ এমন একজন ব্যক্তিকে উপাচার্য পদে নিয়োগ প্রদান করার আইনটি এখানেও উপেক্ষিত।

অপরদিকে, কয়েকটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি নিয়োগে বিশেষ যোগ্যতার উল্লেখ না থাকার সুযোগ নিয়েছে নিয়োগ কমিটি। সিলেট শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) ভিসি পদে নিয়োগ দেওয়া হয় একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসা প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. খাইরুল ইসলামকে। পিরোজপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হয়েছেন ড. মোহাম্মদ ছবিরুল ইসলাম হাওলাদার। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের অধ্যাপক। যদিও বিশ্ববিদ্যালয় আইনে স্বনামধন্য একজন শিক্ষাবিদকে নিয়োগের বিধান রাখা হয়েছে। এ সুযোগ থাকায় একাডেমিক অভিজ্ঞতাকে পাশ কাটিয়ে ভিসি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদে ব্যবসা প্রশাসন বা মানবিক বিভাগের শিক্ষককে নিয়োগ দেওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনা সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তারা।

নিয়োগ দিয়ে ফের বাতিল : নিয়োগের অসঙ্গতির বড় দৃষ্টান্ত বেগম রোকেয়া ও জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি নিয়োগ ও বাতিলের ঘটনা। ১৪ মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. আনিসুর রহমানকে চার বছরের জন্য বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেই নিয়োগ বাতিল করা হয়। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত গণিত বিভাগের অধ্যাপক মো. শওকত আলীকে ভিসি নিয়োগ দেওয়া হয়। একই দিনে জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি নিয়োগ পান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আমির হোসেন ভূঁইয়া। দায়িত্ব গ্রহণের ২৩ দিনের মাথায় ৬ জুন তাকে ভিসি পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। পরে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৌলিতত্ত্ব ও উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগের অধ্যাপক মো. আমির হোসেনকে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়। এসব নিয়োগের ক্ষেত্রে যথাযথ যাচাই-বাছাইও করা হয়নি বলে জানা যায়।

রাজনৈতিক পরিচয় যখন হাতিয়ার : সাম্প্রতিক ভিসি নিয়োগ নিয়ে সবচেয়ে বড় অভিযোগ রাজনৈতিক পরিচয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া। বিশ্ববিদ্যালয়সংশ্লিষ্টদের দাবি, উপাচার্য নিয়োগে যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্য ও ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার বিষয়টি বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। এমন অভিযোগের মাঝেই আলোচনায় আসে গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. নাজমুস সাদাতের ঘটনা। বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির নতুন চারজন সদস্য পদ পাওয়ায় ভিসির অফিশিয়াল প্যাডে ১৭ আগস্ট পৃথক অভিনন্দন বার্তা জানান তিনি। বিষয়টি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় ওঠে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির পদটি নিরপেক্ষ ও প্রাতিষ্ঠানিক হলেও কোনো রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাকে আনুষ্ঠানিক অভিনন্দন জানানোয় তার নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টদের মতে, সাম্প্রতিক নিয়োগকৃত ভিসিদের মধ্যে অন্তত ৯০ শতাংশই রাজনৈতিক বিবেচনায় হয়েছে এবং ৩০ শতাংশ নিয়োগ হয়েছে যোগ্যতা-দক্ষতা ও একাডেমিক মেধার ভিত্তিতে।

দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগে যোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ের জন্য ২ এপ্রিল ছয় সদস্যের সার্চ কমিটি গঠন করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ভিসি নিয়োগে অনিয়ম বা বিতর্কের বিষয়ে জানতে কমিটির সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক মো. মোর্শেদ হাসানকে একাধিকবার ফোন করা হলে তিনি রিসিভ করেননি। কমিটির অপর সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক এবিএম ওবায়দুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, আমি এসব বিষয়ে খুব বেশি কিছু জানি না।

ইউজিসির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এসএমএ ফায়েজ বলেন, ভিসি নিয়োগে মেধা ও যোগ্যতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া উচিত। যারা এ পদের জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেন বা তদবির করেন, সবার আগে তাদের বাদ দেওয়া উচিত। এ পদে আবেদন করে আসা উচিত নয় বলেও মনে করেন তিনি। তার মতে, আওয়ামী লীগ আমলের মতো বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আবার অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা ফিরে আসবে কিনা, সেটিও এখন বড় উদ্বেগের বিষয়।

আওয়ামী আমলে শুরু দলীয় অনুগতদের নিয়োগ প্রক্রিয়া : জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ভিসি অধ্যাপক ড. এএসএম মাকসুদ কামাল ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি ফোনালাপের অডিও প্রকাশ্যে আসে। ওই ফোনালাপে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দমনে কঠোর পদক্ষেপের ইঙ্গিত নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। পরে ফোনালাপটির সত্যতা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের নথিতে উঠে এসেছে। শুধু তাই নয়, আওয়ামী লীগ আমলে দলীয় বিবেচনায় বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি নিয়োগ দেওয়ার ঘটনা ঘটে। তাদের বিরুদ্ধে টেন্ডার, উন্নয়ন, শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগে অনিয়ম, দুর্নীতি ও বিধিবহির্ভূত সিদ্ধান্তের অভিযোগ ওঠে। বিশেষজ্ঞরা সেই অভিজ্ঞতা সামনে রেখে বলছেন, ৫ আগস্টের পরও সেই পুরোনো প্রক্রিয়া অনুসরণ করে দলীয় বিবেচনায় ভিসি নিয়োগ দেওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য নিয়োগসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজে পক্ষপাতমূলক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

শিক্ষাবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, আইনের ব্যত্যয় করে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগ করা ঠিক নয়। যদি নিয়োগে কোনো অনিয়ম বা অর্থ লেনদেনের মতো ঘটনা ঘটে থাকে তা খতিয়ে দেখা জরুরি। দোষীদের বিরুদ্ধে শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) কৃষি বিভাগের শিক্ষার্থী আদনান বলেন, নোবিপ্রবি যেহেতু বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় তাই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতে অভিজ্ঞ কাউকে আমরা প্রত্যাশা করেছিলাম। ভিসির ব্যাকগ্রাউন্ড সমাজ বিজ্ঞানের হওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও গবেষণায় অবদান রাখা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।