কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া, জামিনে মুক্তি কিংবা পুরোনো মামলায় খালাস—বিভিন্নভাবে কারাগারের বাইরে আসা উগ্রবাদী ও উগ্রবাদসংশ্লিষ্টদের ফের ধরতে গিয়ে নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক বোমা উদ্ধার ও বিস্ফোরণের ঘটনার তদন্তে সামনে আসছে পুরোনো উগ্রবাদী গোষ্ঠীর সদস্যদের নাম। এতে চিন্তায় পড়েছে উগ্রবাদ প্রতিরোধে দায়িত্বে থাকা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ইউনিটগুলো। অবশ্য তলে তলে উগ্রবাদীদের গতিবিধির ওপর নজরদারি ও গ্রেপ্তারেও চলছে অভিযান। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে মিলেছে এসব তথ্য।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে দেশের কয়েকটি কারাগারে হামলা ও বিদ্রোহের ঘটনায় পালিয়ে যাওয়া ২ হাজার ২৪০ বন্দির মধ্যে এখনো অন্তত ৬৯০ জনকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। কারা অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, তাদের মধ্যে ১৬৬ জনের পরিচয়ই সুনির্দিষ্টভাবে শনাক্ত করা যাচ্ছে না। নরসিংদী কারাগার ভেঙে পালানো এসব বন্দির বিষয়ে কারা অধিদপ্তরের নথি কিংবা অনলাইন ব্যবস্থায় কোনো তথ্য নেই। ফলে তাদের কেউ স্বাভাবিক পরিচয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান করলেও পলাতক বন্দি হিসেবে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
এর মধ্যেই গত রোববার রাজধানীর ডেমরায় দুটি পাইপ বোমাসহ গ্রেপ্তার হয়েছে জুয়েল ভূঁইয়া নামে এক ব্যক্তি। উগ্রবাদ প্রতিরোধের দায়িত্বে থাকা পুলিশের অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট (এটিইউ) বলছে, এ জুয়েল ভূঁইয়া উগ্রবাদী সংগঠনের সদস্য, সংগঠনে তার সাংকেতিক নাম ‘ওস্তাদ’। তার সঙ্গে গ্রেপ্তার হয় আরিফ চৌধুরী নামে আরেকজন।
এ ছাড়া উগ্রবাদ প্রতিরোধে নিয়োজিত ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি) ও পুলিশের এটিইউ সূত্র বলছে, জুয়েল ওরফে ওস্তাদ নব্য জেএমবির বোমা তৈরির কারিগর হিসেবে পরিচিত নাজমুল হাসান মামুন ওরফে ‘বোমারু মামুনের’ ঘনিষ্ঠ সহযোগী। ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই নরসিংদী জেলা কারাগারে হামলার সময় পালিয়ে যাওয়া ৯ জঙ্গির একজন ছিলেন এ জুয়েল। পরে তাকে গ্রেপ্তার করা হলেও জামিনে কারামুক্ত হয়ে ফের সক্রিয় হন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রগুলো বলছে, গত বছর কেরানীগঞ্জে একটি মাদ্রাসায় বিস্ফোরণের পর সামনে আসে এ মামুনের নাম। এরপর সম্প্রতি আরও কয়েকটি ঘটনার তদন্তেও মেলে এ বোমা বিশেষজ্ঞের নাম। এ ব্যক্তি কয়েক বছর আগে রাজধানীর পান্থপথে হোটেল ওলিও ইন্টারন্যাশনালে বিস্ফোরণ মামলার আসামি। তাকে গ্রেপ্তার করা হলেও মামলাটিতে আদালতের মাধ্যমে মামুনসহ অন্যদের খালাস দেওয়া হয়। এখন সেই মামুনকেই গ্রেপ্তারের জন্য হন্যে হয়ে খুঁজছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। মূলত তার সন্ধান করতে গিয়েই মেলে জুয়েল ভূঁইয়া ওরফে ওস্তাদের সন্ধান।
সূত্র বলছে, আদালত থেকে খালাস পেলেও মামুন এখন পুলিশের কাছে মোস্টওয়ান্টেন্ড আসামি। এ ব্যক্তি প্রেশার কুকার বোমাসহ নানা ধরনের শক্তিশালী বোমা তৈরিতে পারদর্শী। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ধারণা করছে, জুয়েলসহ বেশ কয়েকজনকে সে বোমা তৈরির কারিগর হিসেবে গড়ে তুলতে পারে।
ডেমরা থেকে গ্রেপ্তার জুয়েল ও আরিফ চৌধুরীকে গত সোমবার ঢাকার আদালতে হাজির করে রিমান্ডে নেয় পুলিশ। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটের (এটিইউ) উপপরিদর্শক মো. রফিকুল ইসলাম দুই আসামিকে আদালতে হাজির করে রিমান্ড আবেদনে বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে আসামিরা ‘দাওলাতুল ইসলাম’-এর সক্রিয় সদস্য। সংগঠনের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করা, দেশকে অস্থিতিশীল করা এবং নাশকতা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনার উদ্দেশ্যে তারা ঘটনাস্থলে একত্রিত হয়েছিল।
কারাগার থেকে বেরিয়ে ফের নেটওয়ার্ক সিটিটিসি ও এটিইউ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর কারাগার থেকে বের হয়ে মামুন ওরফে বোমারু মামুন লাপাত্তা হন। চলতি বছরের জানুয়ারিতে হোটেল ওলিও মামলায় তাকেসহ ৯ আসামিকে খালাস দেওয়া হয়। তবে সাম্প্রতিক কয়েকটি বোমা উদ্ধার ও বিস্ফোরণের ঘটনায় তাকে ঘিরে নতুন করে তদন্ত শুরু হয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের দাবি, মামুনের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া আরিফ ওরফে ইমরান এবং কেরানীগঞ্জের একটি মাদ্রাসায় বোমা তৈরির সময় বিস্ফোরণের পর আত্মগোপনে যাওয়া শেখ আল আমিনের। আরিফকে গ্রেপ্তারের পর তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মামুনের নেটওয়ার্কের বিষয়ে নতুন তথ্য পাওয়া যায়। সম্প্রতি রাজধানী ও এর আশপাশে বোমা উদ্ধার এবং বিস্ফোরণের কয়েকটি ঘটনায় মামুন ও তার সহযোগীদের সংশ্লিষ্টতা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এর মধ্যে কেরানীগঞ্জে বোমা তৈরির সময় বিস্ফোরণ, যাত্রাবাড়ীতে পুলিশের ওপর হামলার পর বোমার ব্যাগ ফেলে পালানো, কুমিল্লায় মন্দিরে বিস্ফোরণ এবং সায়েদাবাদে তল্লাশির সময় বোমা বিস্ফোরণের ঘটনাও রয়েছে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাষ্য।
এদিকে কারাগার ভেঙে পালানো বন্দিদের একটি বড় অংশকে এখনো আইনের আওতায় আনতে না পারার বিষয়টি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে বলে মনে করছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্টরা। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে পাঁচটি কারাগারে হামলা ও বিদ্রোহের ঘটনায় ২ হাজার ২৪০ বন্দি পালিয়ে যায়। কারা অধিদপ্তর জানায়, তাদের মধ্যে জঙ্গি, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত, যাবজ্জীবন ও বিভিন্ন মেয়াদে সাজাপ্রাপ্ত বন্দির পাশাপাশি বিচারাধীন মামলার আসামিও ছিল।
পলাতকদের আত্মসমর্পণের আহ্বান জানানোর পাশাপাশি তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান শুরু করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। দেশত্যাগ ঠেকাতে পলাতকদের তালিকা দেওয়া হয় ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষকেও। এরপর আত্মসমর্পণ ও বিভিন্ন অভিযানে অনেককে গ্রেপ্তার করা হলেও এখনো ৬৯০ জনের হদিস মেলেনি।
কারা অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, পলাতকদের অনেকের বিষয়ে কারাগারের কাছে থাকা ঠিকানা সঠিক নয়। তাদের কেউ কেউ বিদেশে পালিয়ে গিয়ে থাকতে পারে। তবে পরিচয় শনাক্ত না হওয়া ১৬৬ জনের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল।
কারা অধিদপ্তরের দায়িত্বশীল আরেক কর্মকর্তা বলেন, যাদের কারাগারে নথিপত্র নেই, সেই ১৬৬ জনকে শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন। থানায় তাদের তথ্য থাকার কথা থাকলেও বিভিন্ন স্থানে হামলা ও অগ্নিসংযোগে পুলিশের নথিও নষ্ট হয়েছে।
অবশ্য কারাগার থেকে পলাতকদের মধ্যে ‘টপ টেরর’ কেউ নেই বলে জানিয়েছেন কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজন্স) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন। পলাতকরা নিরাপত্তা হুমকি তৈরি করছে কি না—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, যাদের এখন পর্যন্ত ফের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি, তারা নিরাপত্তা হুমকি তৈরি করছে, এটা পর্যাপ্ত ডাটা ছাড়া বলা যাবে না। তবে একটা শঙ্কা থেকেই যায়। কারাগারের পক্ষ থেকে পলাতকদের ফের গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলোর সঙ্গে নিয়মিত তথ্য বিনিময় করা হচ্ছে। প্রতিটি ঘটনায় মামলা হয়েছে, ওয়ারেন্ট ইস্যু হয়েছে। মাঝেমধ্যে এক-দুজন করে ধরাও পড়ছে।
উগ্রবাদ নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে কর্মকর্তাদের অনীহা দেশের বিভিন্নস্থানে বিস্ফোরকদ্রব্য উদ্ধার, জঙ্গি সম্পৃক্ততা, উগ্রবাদের বিস্তার—এসব বিষয় কয়েক সপ্তাহ ধরে নিয়মিত ঘটনা। এটিইউ, সিটিটিসি ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে বোম্ব ডিসপোজাল, তদন্ত, আসামি গ্রেপ্তারের কাজ করলেও প্রকাশ্যে কথা বলতে অনীহা দেখা যাচ্ছে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর কর্মকর্তাদের মধ্যে।
মতিঝিল ও সাভারে বোমা উদ্ধার নিয়ে সংবাদ সম্মেলন ডাকা হলেও ‘অনিবার্যকারণ’ দেখিয়ে তা স্থগিত করে সিটিটিসি। স্থগিত করার কারণ হিসেবে সিটিটিসির দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বলেন, সংবাদ সম্মেলন করা হলে জঙ্গি বা উগ্রবাদ নিয়ে নানা ধরনের প্রশ্ন আসবে। এসব প্রশ্ন নিয়ে তারা গণমাধ্যমের মুখোমুখি হতে চান না।
পলাতক উগ্রবাদীদের নতুন করে সংগঠিত হওয়ার বিষয়ে সিটিটিসির প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ শামসুল হকের বক্তব্য জানতে চাইলেও তিনি এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।
সিটিটিসির দায়িত্বশীল অপর এক কর্মকর্তাও এ বিষয়ে স্বনামে কোনো মন্তব্য করতে চাননি। তিনি বলেন, ‘জঙ্গিবাদ নিয়ে কথা বললে, নানা ধরনের সমস্যা হয়, উপরের চাপও আছে, সেজন্য কিছু বলছি না।’
তা ছাড়া পুরো বিষয়টি নিয়ে সারা দেশে উগ্রবাদ প্রতিরোধে পুলিশের বিশেষায়িত অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. রেজাউল করিমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তার কোনো বক্তব্য নিতে পারেনি কালবেলা।
ওই দুটি সংস্থার একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো মোকাবিলায় তাদের সফলতা রয়েছে। মতিঝিলে উল্টোরথ যাত্রার দিনে পাওয়া ছাতা বোমার সূত্র ধরে সাভারেও অভিযান চলেছে। এরই ধারাবাহিকতায় ডেমরা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় দুজন উগ্রবাদীকে। আরও অনেককেই চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা চলছে। তা ছাড়া পুলিশের আগাম কার্যক্রমের কারণে অনেক ঘটনাই নস্যাৎ করা সম্ভব হয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগ) নিয়াজ মেহেদী কালবেলাকে বলেন, যারা উগ্রবাদ ছড়াচ্ছে বা জড়িয়েছে, পুলিশ তাদের নজরদারিতে রেখেছে। ঢাকা ও ঢাকার বাইরে সাম্প্রতিক সময়ে যেসব বোমা বা বোমা সদৃশ বস্তু পাওয়া গেছে, সেগুলো কোনো ধরনের ক্যাজুয়ালিটি ছাড়াই নিষ্ক্রিয় করা সম্ভব হয়েছে। এতে জনগণের জানমাল রক্ষা পেয়েছে।
তিনি বলেন, ভবিষ্যতেও গোয়েন্দা নজরদারি, জড়িতদের গ্রেপ্তার কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। এ পর্যন্ত যারা গ্রেপ্তার হয়েছে, তাদের বিষয়ে তদন্ত চলমান। তদন্ত শেষে বিস্তারিত বলা যাবে।
সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. তৌহিদুল হক কালবেলাকে বলেন, বাংলাদেশে ভৌগোলিক বৈচিত্র্য, রাজনৈতিক অনৈক্য, বহুমাত্রিক শিক্ষাব্যবস্থা এবং ৫ আগস্টের পরের ভারসাম্যহীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে উগ্রবাদ বা জঙ্গিবাদের মতবাদ ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে অনেক সংকট পেয়েছে। এসব সংকট থেকে উত্তরণ হয়তো ক্রমান্বয়ে সম্ভব হবে। তবে জঙ্গিবাদ ও উগ্রবাদের বিষয়টিতে সরকারকে আরও মনোযোগী হতে হবে।
তিনি বলেন, উগ্রবাদে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা এবং কারাগারে থাকা বা মুক্তি পাওয়া ব্যক্তিদের সংশোধন ও পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়গুলোতে সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন, তা এখনো যথাযথভাবে হচ্ছে না। ফলে পুরোনো উগ্রবাদীরা নতুন করে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে কি না, সেটিও গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা দরকার।