মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র। দেশজুড়ে যার সংখ্যা পাঁচ শতাধিক। বেশির ভাগই সাইনবোর্ডসর্বস্ব। ন্যূনতম চিকিৎসার বালাই নেই। উলটো দিনের পর দিন বন্দি রেখে চলে মারধর। পৈশাচিক কায়দায় মধ্যযুগীয় নির্যাতনের অভিযোগও ভূরিভূরি। চুটিয়ে চলে মাদক ব্যবসাও। রোগী ভর্তির পর নানা অজুহাতে অর্থ আদায় করা হয়। এমনকি রোগীকে সুস্থ করে তোলার নামে অভিভাবকদের মাদক কেনার টাকা দিতেও বাধ্য করা হয়। বেশির ভাগ কেন্দ্রের প্রধান টার্গেট অর্থ হাতিয়ে নেওয়া।
এখানেই শেষ নয়, সম্পর্কের টানাপোড়েন থেকে শুরু করে সম্পত্তির বিরোধে ভাড়া খাটে নিরাময় কেন্দ্রের বিশেষ টিম। যাদের নাম ‘ক্যাচিং পার্টি’। টাকার বিনিময়ে ভালো মানুষকেও মাদকাসক্ত সাজিয়ে তারা বন্দি করে রাখে। ফলে নিরাময় কেন্দ্র নামের এসব প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠেছে একেকটি গোপন কারাগার। টাকার মেশিনখ্যাত এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের এমন রহস্যময় সদর-অন্দরের অবিশ্বাস্য রকম নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে যুগান্তরের দীর্ঘ অনুসন্ধানে।
কেস স্টাডি : মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্রগুলোর নানা অপকর্মের অকাট্য তথ্যপ্রমাণ হাতে আসার পর সরেজমিন অন্দরমহলের চিত্র অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় যুগান্তর। এজন্য রাজধানীর অভিজাত পাড়ায় অবস্থিত ভিআইপি ক্যাটাগরির একটি নিরাময়কেন্দ্র বেছে নেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানের নাম বীকন পয়েন্ট। গুলশানের ২৩/এ সড়কের চার নম্বর হোল্ডিং। ছয়তলা বাড়ির তালাবদ্ধ ফটকের সামনে সার্বক্ষণিক কড়া প্রহরা। সেখানে গিয়ে মাদকাসক্তির চিকিৎসার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করলে গেট খুলে দেওয়া হয়। নিরাপত্তাকর্মীদের একজন এসে সঙ্গে করে নিয়ে যান ভবনের দোতলায়। কথিত কাউন্সেলরদের চেম্বারে।
সেখানে ছোট ছোট কয়েকটি কক্ষে বসে আছেন কয়েকজন। একজনের নাম মাহমুদুর রহমান। নানা প্রশ্নের পর তিনি চিকিৎসা ব্যয়ের লম্বা হিসাব ধরিয়ে দেন। জানানো হয়-অন্তত ৩ মাসের চিকিৎসা নিতে হবে। এজন্য দৈনিক খরচ ন্যূনতম ২০ হাজার টাকা। এর সঙ্গে আছে নানা ধরনের পরীক্ষা এবং ওষুধের খরচ। স্বজনের সাক্ষাৎ কিংবা ফোনকল-সবই নিষিদ্ধ। মানতে হবে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ কড়া নিয়মকানুন।
এবার ভর্তি হওয়ার পালা। কিন্তু আসল পরিচয় প্রকাশ হয়ে পড়লে বিপদের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাই বেসরকারি চাকরিজীবী এবং গাঁজাসেবী পরিচয়ে টানা এক সপ্তাহ ধরে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ গড়ে তোলা হয়। এরপর চূড়ান্ত ভর্তির প্রস্তুতি নিয়ে ২৫ জুলাই বিকাল ৫টায় যুগান্তরের অনুসন্ধান সেলের প্রধানসহ তিন সদস্য বীকন পয়েন্টে হাজির হন। কুশল বিনিময় শেষ হতেই চলে আসে ভর্তির ফরম। এরপর টাকা জমা দেওয়ার তাগিদ বাড়তে থাকে। এ সময় অগ্রিম ২ লাখ টাকা দেওয়া হলে তাৎক্ষণিক ভর্তি করে নেওয়া হয়। অথচ নিয়মানুযায়ী মাদকাসক্ত হিসাবে কাউকে ভর্তির আগে ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক।
সব প্রস্তুতি শেষ। এবার রোগী সেজে মাদক নিরাময় কেন্দ্রের অভ্যন্তরে অন্তত ২৪ ঘণ্টা থাকার পালা। ২৬ জুলাই সন্ধ্যা ৭টায় সেখানে উপস্থিত হলে দেহ তল্লাশি করা হয়। মোবাইল ফোন, কলম, ঘড়িসহ আরও বেশকিছু ব্যক্তিগত সামগ্রী একটি কক্ষে জমা রাখতে বলা হয়। এরপর নিয়ে যাওয়া হয় নিরাময়কেন্দ্রের বিশেষ নিরাপত্তাবেষ্টিত রেড জোনে। যেখানে বাইরের আর কারও প্রবেশের সুযোগ নেই।
২৪ ঘণ্টার পর্যবেক্ষণ : মূল চিকিৎসাকেন্দ্র বা রেড জোনের অবস্থান ভবনের তৃতীয় তলায়। সেখানে ঢোকানোর পরপরই কারাগারের মতো বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে দেওয়া হয়। জায়গাটির চারপাশ পর্দা ঘেরা। বাইরে আলো-বাতাস এমনকি শব্দ পর্যন্ত ঢোকার ব্যবস্থা নেই। এমন বদ্ধ পরিবেশে কিছুক্ষণ থাকার পর উৎকট গন্ধে গা গুলিয়ে ওঠে। কোনো এক অজানা কারণে গা ছমছমে অবস্থা।
তবে মিনিট পাঁচেক পর কিছুটা স্বস্তি ফিরল। সামনের বড় ডাইনিং রুমে হঠাৎ চারপাশের কক্ষ থেকে আনা হলো ২০-২৫ জনকে। সবাই বয়সে তরুণ। এরা মাদকাসক্ত। তাদের নাকি চিকিৎসা চলছে। বাস্তবে না হলেও চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা নিতে অনুসন্ধান টিমের সদস্যরাও মাদকাসক্তের ভান করে তাদের সঙ্গে মিশে যান। কিন্তু অবাক কাণ্ড, কোনো রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই চিকিৎসা শুরু হয়। নাম না জানা কয়েকটি ট্যাবলেট এবং ক্যাপসুল খেতে বাধ্য করা হলো।
ইতোমধ্যে ভবনের অভ্যন্তরে দুজন নতুন রোগী আগমনের খবর ছড়িয়ে পড়ে। কয়েকজন তরুণ এগিয়ে এসে কুশল বিনিময় করেন। নিচুস্বরে জানতে চান-নিজে থেকে এসেছেন না ‘ক্যাচিং’ (নিরাময়কেন্দ্রের সদস্য কর্তৃক ধরে আনা)। স্বেচ্ছায় আসার কথা শুনে তাদের সন্দেহ হয়। একসঙ্গে একাধিক প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে জানতে চান-কিসের নেশা। ইয়াবা না হেরোইন। নাকি অন্যকিছু। প্রেমঘটিত কেস? কিন্তু তাদের উত্তর শোনার সময় নেই। প্রশ্নোত্তরের মধ্যেই হঠাৎ কেউ একজন অট্টহাসিতে ফেটে পড়েন। এভাবে একে একে অবিশ্বাস্য নানা স্টোরি সামনে আসতে থাকে।
ততক্ষণে রাত সাড়ে ৯টা। খাবারের ডাক পড়ে সবার। পাতে জোটে এক টুকরো মাছ, ডাল আর দুর্গন্ধযুক্ত ভাত। খাবার পর্ব শেষে হতেই শুরু হয় ধূমপানের মহা আয়োজন। রুদ্ধশ্বাসে সেদিকে ছুটলেন অনেকে। চতুর্থ তলার ছোট একটি কক্ষে ধূমপানের ব্যবস্থা। সেখানে অন্তত ২০ জনের জটলা। সবার মুখে জ্বলছে সিগারেট। কিন্তু ধোঁয়া নির্গমনের পথ সংকীর্ণ। ফলে সেখানে বেশিক্ষণ দাঁড়ানো মুশকিল। মিনিট খানেক থাকলেও দম বন্ধ হয়ে আসে।
শিল্পপতি পিতাও বন্দি : তখন গভীর রাত। সব আলো নিভিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বন্দি এক বৃদ্ধের ঘুম নেই। ডাইনিং টেবিলের এক কোণে মাথা নিচু করে নীরবে বসে আছেন তিনি। কাছে গিয়ে নাম জানতে চাইলে তিনি খানিকটা হকচকিয়ে ওঠেন। নিরাময়কেন্দ্রে ভর্তির কারণ জানতে চাইলে বেশ কিছু সময় নীরব থাকেন। এরপর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নিজের বন্দি জীবনের এক অবিশ্বাস্য করুণ কাহিনি শোনান তিনি।
নাম মোহাম্মদ শাহজাহান। বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং শিল্পপতি। শতভাগ রপ্তানিমুখী গার্মেন্ট ওয়াই টেক্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান। মাদক দূরের কথা, জীবনে কোনোদিন তিনি একটি সিগারেটেও টান দেননি। অথচ সম্পত্তির লোভে নিজের সন্তানই এই অন্ধকারে তাকে বন্দি করে রেখেছে। শত চেষ্টা করেও মুক্তি মিলছে না তার।
এরপর কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ২০২৪ সালে স্ত্রীর মৃত্যুর পর তিনি একা হয়ে পড়েন। দুর্বিষহ নিঃসঙ্গতা কাটাতে জীবনসঙ্গীর প্রয়োজনীয়তার কথা জানান। এতে তার ছেলে ক্ষুব্ধ হয়। কিছু না জানিয়ে আকস্মিক একদিন গভীর রাতে তাকে বাসা থেকে তুলে আনা হয়। যোগাযোগ বন্ধ করতে কেড়ে নেওয়া হয় মোবাইল ফোন। এরপর মাদকাসক্ত পরিচয়ে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে এখানে বন্দি। অথচ তিনি সম্মুখসারির একজন মুক্তিযোদ্ধা। গুলশানে বাড়ি, গাজীপুরে বিশাল খামার, মিল-ফ্যাক্টরিসহ তার শতকোটি টাকার সম্পদ। যার সবই এখন তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
শাহজাহান আরও বলেন, চাইলেই যে কাউকে ধরে এনে এখানে বন্দি করে রাখা সহজ। মামলা করতে হয় না। থানা পুলিশের ঝামেলাও নেই। টাকা পেলে নিরাময় কেন্দ্রের লোকজনই (ক্যাচিং পার্টি) ধরে আনে। এরপর শত চেষ্টা করলেও মুক্তি মেলে না। তার মতো আরও কেউ হয়তো এখানে বন্দি রয়েছেন। কিন্তু এসবের খোঁজ নেওয়ার কেউ নেই। মাঝে-মধ্যে প্রশাসনের লোকজন এলেও তারা অফিসে বসে চা পান করেই দায়িত্ব শেষ করেন। ভেতরের প্রকৃত অবস্থার খোঁজ নেন না তারা।
বন্দিশালায় ধনাঢ্য পুত্রের পরিণতি : ভবনের তৃতীয় এবং চতুর্থ তলা ঘুরে দেখা যায়, একেকটি কক্ষে ৩-৪ জন করে থাকার ব্যবস্থা। বেশির ভাগই মাদকাসক্ত। কেউ ইয়াবা, কেউ হেরোইন কিংবা গাঁজার নেশা করেন। এদের মধ্যে মাত্র ২১ বছর বয়সি এক তরুণকে বন্দি রেখেছে তার পরিবার। নিজের মাদকাসক্তির বিষয়ে রীতিমতো রক্ত হিম করা বর্ণনা দেন তিনি।
তিনি বলেন, তার বাবা নারায়ণগঞ্জের একজন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী। শুধু হাত খরচের জন্যই প্রতি মাসে তার বরাদ্দ ছিল লাখ টাকার বেশি। স্থানীয় রসুলপুর কলেজের প্রথমবর্ষে পড়ার সময় তিনি ইয়াবা আসক্ত হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে ইয়াবা সেবনের পাশাপাশি বিষধর সাপের ছোবলের মাধ্যমে নেশা করতেন। এসব নিয়ে পরিবারে ঝামেলা শুরু হলে ‘ক্যাচিং পার্টি’ ডেকে তাকে ধরিয়ে দেওয়া হয়। সেই থেকে তিনি বন্দি।
তিনি জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় মাদক চক্রের গোপন আস্তানায় গিয়ে সাপের ছোবল নিতেন তিনি। প্রতিবার ছোবল নিতে ১৫ হাজার টাকা লাগে।
উচ্চশিক্ষিত তরুণদেরও জীবন ধ্বংস : ভয়ংকর মাদক কোকেন আসক্ত আরেক তরুণকেও নিরাময়কেন্দ্রে বন্দি রেখেছে তার বাবা-মা। অস্ট্রেলিয়ার একটি নাম করা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গিয়ে মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন তিনি। এছাড়া মাদকাসক্তির কারণে বন্দি একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের ঢাকা অফিসের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাও। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী এবং বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বৈত নাগরিক।
ভয়াবহ মাদকাসক্তি নিয়ে নিরাময়কেন্দ্রে বন্দি রয়েছেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএর এক ছাত্র। তাকেও নিরাময়কেন্দ্রের ক্যাচিং পার্টির সাহায্যে ধরে আনা হয়। এখানে আসার আগে নেশার জন্য প্রতিদিন অন্তত ১৫টি ইয়াবা ট্যাবলেট সেবন করতে হতো তাকে। তবে নিরাময়কেন্দ্রে ভর্তির পর সুস্থ হওয়া দূরের কথা, বন্দিশালায় ক্রমেই মানসিক রোগীতে পরিণত হচ্ছেন তিনি। তার বাবা বেসরকারি বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (সিভিল এভিয়েশন) সাবেক পরিচালক। এছাড়া কুমিল্লার বাসিন্দা বিএনপিদলীয় সাবেক এক এমপি তার মাদকাসক্ত ছেলেকেও এখানে বন্দি করে রেখেছেন।
ক্যাচিং পার্টির ফি : সংশ্লিষ্টরা জানান, নিরাময়কেন্দ্রের ক্যাচিং পার্টির মাধ্যমে কাউকে ধরে আনতে বিশেষ কয়েকটি প্যাকেজ চালু আছে। যেমন-ঢাকার মধ্যে যে কোনো জায়গা থেকে ধরে আনার ফি ২৫ হাজার টাকা। ঢাকার বাইরে খরচ আরও বেশি। সেক্ষেত্রে প্রতি কিলোমিটার হিসাবে টাকা দিতে হয়। তবে চট্টগ্রাম কিংবা সিলেট থেকে কাউকে ধরে আনার ন্যূনতম খরচ ৫০ হাজার টাকা।
বীকন পয়েন্টের কর্মচারীদের কয়েকজন জানান, তাদের প্রতিষ্ঠানে মাদকাসক্তির পাশাপাশি মানসিক রোগী ছাড়াও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, স্মার্ট ফোন এবং মোবাইল গেমসে আসক্তদেরও চিকিৎসা দেওয়া হয়। তবে এসবের জন্য পৃথক কোনো ব্যবস্থাপনা নেই। সবাইকে এক ভবনে জড়ো করে দেওয়া হচ্ছে কথিত চিকিৎসা।
দায়িত্বরত এক কর্মচারীর ভাষায়-‘ডেরাগ কিংবা মানসিক’ সবাইরে একখানেই থাকতে হইব। এটাই নিয়ম। এর কোনো বিকল্প নাই। সাবেক রাষ্ট্রপতি চুপ্পু (সাহাবউদ্দিন চুপ্পু) স্যার যদি উনার মাদকাসক্ত নাতিরে এখানে বন্দি করে রাখতে পারেন-তাইলে বুঝে নেন আর বাকি থাকে কারা।’ তিনি জানান, ‘সে সময় পুলিশ, ডিবিসহ প্রশাসনের লোক দিন-রাত অস্ত্রসহ ভেতরে ও বাইরে পাহারা দিছে। উনি তখন রাষ্ট্রপতি ছিলেন।’