জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের (জাগৃক) মালিকানাধীন রাজধানী মিরপুরের রূপনগর থানাধীন দুয়ারীপাড়ায় সরকারি প্লট ঘিরে চলছে দখল-চাঁদাবাজির মহোৎসব। কোথাও গভীর রাতে ঢুকে ইট-বালু ফেলে স্থাপনা নির্মাণের চেষ্টা, কোথাও ইটের দেয়াল ও গেট তুলে দেওয়া, আবার কোথাও সরকারি জায়গায় সাইনবোর্ড বসিয়ে দখল হয়েছে একাধিকবার। একাধিকবার উচ্ছেদ, সীমানা প্রাচীর নির্মাণ, প্লট মালিকদের কাছে দখল হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চালিয়েও থামানো যায়নি সরকারি জমির দখল। জমি দখলের পাশাপাশি এবার নতুন করে প্লট মালিকদের কাছে স্থাপনা নির্মাণের সময় শুরু হয়েছে চাঁদাবাজি। কেউ চাঁদা দিতে না চাইলে দলবল নিয়ে নির্মাণ শ্রমিকদের হুমকি-ধমকি দিয়ে কাজ বন্ধ করে দিচ্ছে চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট। এমনকি রূপনগর থানা থেকে পুলিশ নিয়ে গিয়েও কাজ বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। হুমকি-ধমকি ও নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেওয়ার মতো বেশ কয়েকটি ঘটনার ভিডিও ফুটেজ রয়েছে কালবেলার হাতে।
জাগৃকের মতে, চাঁদাবাজদের হাতে জিম্মি প্লটের সংখ্যা প্রায় অর্ধশতাধিক। এর বাইরেও দুয়ারীপাড়া খ-ব্লকের পূর্ব দিকে ৪০ ফুট প্রশস্ত রাস্তাসহ প্রায় ৯০ কাঠা অবরাদ্দকৃত জায়গা দখলে নিয়েছে চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট। এ দখলি জমিতে রিকশা গ্যারেজ, বস্তিসহ বিভিন্ন ধরনের স্থাপনা বানিয়ে ভাড়া দিয়েছে দখলদার চক্রটি। এ ছাড়া প্লট মালিকদের বুঝিয়ে দেওয়া আরও কিছু প্লট দখলে নিয়েছে চক্রটি। পরিচিত এ দখলদারদের নাম-ঠিকানা উল্লেখ করে জাগৃকের ঢাকা উপবিভাগ-১ থেকে রূপনগর থানায় কয়েক ডজন জিডিও করা হয়েছে। জাগৃকের তথ্যমতে, সব মিলিয়ে এ চাঁদাবাজের সংখ্যা ৩৬ জন। দখল ঠেকাতে গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সরকারি আনসার সদস্যদের সঙ্গে অসদাচরণের পাশাপাশি হুমকিও দিয়েছেন। এমনকি এক ঘটনায় জাগৃকের কর্মকর্তাকে ফোন করে মামলা ও ‘দেখে নেওয়ার’ হুমকির নজিরও রয়েছে। তবে একের পর এক জিডি ও লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরও রূপনগর থানা পুলিশ কোনো ব্যবস্থা তো নিচ্ছেই না, উল্টো দখলদারদের পক্ষেই কাজ করার অভিযোগ উঠেছে। কালবেলার দীর্ঘ অনুসন্ধানে জমি দখল ও চাঁদাবাজির পুরো চিত্র ও দখলদারদের আদ্যোপান্ত উঠে এসেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দুয়ারীপাড়া এলাকার ‘ক’ ও ‘খ’ ব্লকে প্রায় ৩০ একর জমি ৫/৭২-৭৩ এলএ কেসের মাধ্যমে অধিগ্রহণ করে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ। সেসব জমিতে ৪৭৪টি প্লট তৈরি করে বিক্রি করলেও নিজেদের অধিগ্রহণ করা জমি দখলে নিতে ব্যর্থ হয় সংস্থাটি। ফলে প্লট বিক্রি করেও ক্রেতাদের জমির দখল বুঝিয়ে দিতে পারেনি জাগৃক। ২০০৯ ও ২০১৯ সালে দুই দফায় উচ্ছেদ অভিযান চালায় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ। কিন্তু এর পর থেকেই স্থানীয় ভূমিদস্যুদের সঙ্গে এক ধরনের চোর-পুলিশ খেলা চলছে। দীর্ঘসূত্রতা ও প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে প্লট বরাদ্দ পাওয়া মালিকরা জমি বুঝে পাচ্ছেন না। বিগত সরকারের সময় এসব জমির দখলে ছিল স্থানীয় সাবেক সংসদ সদস্য (এমপি) ইলিয়াস মোল্লার অনুসারীদের হাতে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে পুরোনো দখলদাররা এলাকা ছেড়ে গেলেও দখলমুক্ত হয়নি এসব প্লট। নতুন একটা গ্রুপ এখন এসব প্লট দখলে নেতৃত্ব দিচ্ছে। এখন দখলের পাশাপাশি সরকারি প্লট ঘিরে চলছে চাঁদাবাজির মহোৎসব। প্লট মালিকদের কেউ নিজের প্লটে ভবন নির্মাণ করতে গেলে একটি গোষ্ঠীকে মোটা অঙ্কের চাঁদা দিতে হয়। চাহিদামাফিক চাঁদা না দিলে দিনে-দুপুরে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হামলা করে বন্ধ করে দেওয়া হয় নির্মাণকাজ। জানা গেছে, এ চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িতদের প্রায় সবাই স্থানীয় বিএনপি, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। দখলদারদের আরেকটি অংশ দীর্ঘসময় আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও বর্তমানে বিএনপি নেতাদের সঙ্গে চলাফেরা করেন।
জানতে চাইলে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ঢাকা উপবিভাগ-১-এর উপসহকারী প্রকৌশলী মাহমুদুর রহমান কালবেলাকে বলেন, ‘প্লটগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখতে আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছি। সম্প্রতি গৃহায়নের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে আমি দখলদারদের নামের তালিকাসহ রূপনগর থানায় মামলা করতে যাই, তবে থানা মামলা নেয়নি। ওসি সাহেব আমাকে সারাদিন বসিয়ে রেখে বলেন—অভিযোগ দিয়ে চলে যান। পরে আমি বলি—জিডি নেন অন্তত। আমি যে এখানে সারাদিন বসেছিলাম স্যারদের কী বলব? পরে ওসি বলেন, জিডি হবে না। আপনি অভিযোগ দিয়ে চলে যান। পরে আবার আমি অভিযোগ লেখি; কিন্তু তারা সেখানে রিসিভ কপি দেবে না। বলে নিয়ম নেই। পরে আমি বলি যে, রিসিভ কপি তো আমাকে হেড অফিসে জমা দিতে হবে। তখন তারা কোনো রকম একটা সিল মেরে একটা কপি আমাকে দেয়।’
গৃহায়নের এ কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘আমি দখলদারদের নামের তালিকাসহ অভিযোগ দেওয়ার পরও যদি থানা পুলিশ মামলা না নেয়, কোনো ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে আমাদের আর কী করার থাকে? তবে আমরা চেষ্টা করছি, ফের এখানে উচ্ছেদ অভিযান চালানোর চেষ্টা করছি।’
গৃহায়নের আরেক কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেন, দুয়ারীপাড়ার প্লট দখলের উৎসব চলছে। যে যার মতো দখল করে স্থাপনা বানাচ্ছে। স্থানীয় প্রভাবশালীরা এসব জমি দখল ও চাঁদাবাজিতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ রূপনগর থানায় এক ডজনেরও বেশি জিডি ও অভিযোগ দায়ের করেও প্রতিকার পায়নি। বারবার অভিযোগ দিলেও থানা পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। পুলিশের একটা অংশও এ দখল-চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত।
অনুসন্ধানে কালবেলার হাতে একটি সিসিটিভি ফুটেজ আসে। সেখানে দেখা যায়, গত ১৮ জুলাই দুপুরে কয়েকজন বিএনপি নেতা একটি প্লটে পুলিশ নিয়ে গিয়ে নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেন। ফুটেজে বিএনপি নেতাদের নির্মাণ শ্রমিকদের কাজ বন্ধ করে চলে যাওয়ার জন্য বলতে শোনা যায়। চলে না গেলে তারা শ্রমিকদের শাসাতে থাকেন। এরপর কাজ বন্ধ রাখতে বলে তারা ওখান থেকে চলে যান। অনুসন্ধানে জানা যায়, ঘটনাস্থলে উপস্থিত সবাই স্থানীয় বিএনপি, শ্রমিক দল ও ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। আর উপস্থিত দুই পুলিশ সদস্য রূপনগর থানায় কর্মরত। যে প্লটে গিয়ে তারা হুমকি-ধমকি দিয়েছেন তা ড্যাফোডিল হোমস লিমিটেড নামে একটি ডেভেলপার কোম্পানির নির্মাণাধীন একটি প্রজেক্ট।
অনুসন্ধানে জানা যায়, পুলিশ ও বিএনপি নেতাদের এটি একটি সংঘবদ্ধ চাঁদাবাজচক্র। এ চক্রের সদস্যদের শেল্টার দেন রূপনগর থানা পরিদর্শক (অপারেশন) মো. তারেকুজ্জামান। অনুসন্ধানে সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যাওয়া দুই পুলিশ সদস্যর পরিচয়ও নিশ্চিত হওয়া গেছে। তারা হলেন রূপনগর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আসাদুল ও এএসআই রমজান।
জানা গেছে, নির্মাণাধীন ভবনে গিয়ে বিএনপি নেতারা হুমকি-ধমকি দেওয়ার পর ড্যাফোডিল হোমস লিমিটেডের এমডি আবদুল মান্নান একাধিকবার রূপনগর থানায় গিয়ে আইনি সহায়তা চান। তবে জিডি করে, এমনকি থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েও কোনো প্রতিকার পাননি তিনি। উল্টো পুলিশসহ সন্ত্রাসীরা এসে তার নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেয়। পরে তিনি আদালতে একটি মামলা করেন যার সিআর নম্বর-৫৮৭/২৬।
জানতে চাইলে ড্যাফোডিল হোমস লিমিটেডের এমডি আবদুল মান্নান কালবেলাকে বলেন, ‘শিহাব উদ্দিন, জামাল, শিপু মোল্লা, মামুন, দুলালসহ কয়েকজন আমাদের নির্মাণাধীন প্রজেক্টে বেশ কয়েকবার হামলা করে। তারা আমার কাছে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। চাঁদা না দিলে কাজ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেয়। আমি রূপনগর থানায় গিয়ে ওসির সঙ্গে কথা বলেছি, জিডি করেছি, লিখিত অভিযোগ দিয়েছি; কিন্তু পুলিশ কোনো ব্যবস্থাই নেয়নি। উল্টো সঙ্গে পুলিশ নিয়ে তারা আমার কাজ বন্ধ করে দিয়েছে।’
এদিকে গত সোমবার দুপুরে দুয়ারীপাড়ায় ‘ক’ ব্লকের ১ নম্বর রোডের ৩৫ নম্বর প্লটে কাজ চলাকালে ৯২ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সহসভাপতি জামাল উদ্দিন ওরফে লম্বা জামাল সেখানে গিয়ে কাজে বাধা দেন বলে অভিযোগ উঠেছে। জানা যায়, তারা প্লট মালিকদের অকথ্য ভাষায় গালাগাল করেন। জামাল এক পর্যায়ে ওই প্লটটি নিজের বলে দাবি করেন। ভুক্তভোগীদের সঙ্গে এ সময় জামাল উদ্দিন ও তার দলবলের চরম বাগবিতণ্ডা হয়। এ সময় ঘটনাস্থলে পুলিশের একটি টিম উপস্থিত ছিল।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট ওইদিন জরুরি সহায়তা সেবা ৯৯৯-এ কল করে পুলিশ এনে নির্মাণকাজ বন্ধ করতে যান। পরে প্লট মালিকরা পুলিশকে তাদের কাগজপত্র দেখালে পুলিশ সেখান থেকে চলে যায়।
জানতে চাইলে ওই প্লটের মালিক মো. মোস্তাফিজুর রহমান আশিক কালবেলাকে বলেন, একটা ঘটনা ঘটে গেছে। ওরা আমার প্লটে এসে নির্মাণের মালপত্র নিয়ে যায়। পরে আমরা আমিনুল (যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী) ভাইকে বলি। পরে তারা আবার এসে আমার মালপত্র দিয়ে গেছে। আমার বাবার কাছেও মাফ চেয়ে গেছে। বিষয়টা পরে মিটমাট হয়েছে।’
কালবেলার হাতে থাকা আরও একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ঢাকা মহানগর উত্তর মহিলা দলের নেত্রী লাইলী বেগমকে ধমকাচ্ছেন রূপনগর থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সহসভাপতি মোহাম্মদ মামুন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, লাইলি বেগমের কাছে চাঁদা দাবি করে মামুন। তিনি চাহিদামাফিক চাঁদা না দেওয়ার তার প্লটে গিয়ে কাজ বন্ধ করে দিয়ে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করেন মামুন। ভিডিওতে শোনা যায়, এক পর্যায়ে লাইলী বেগম মামুনকে বলেন, ‘আমার কথা শোনেন—টাকা দিলেই কি সব লিগ্যাল আর টাকা না দিলেই ইলিগ্যাল? তখন মামুন বলেন, কী করবেন আপনি? কী করতে পারবেন আপনি? তখন লাইলী বেগম বলেন, আপনাকে যাইতে বলছি, যান আপনি। তখন মামুন বলেন, আপনি কে, আমি আপনার বাপ? এরপর মামুনকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করতে শোনা যায়, যা প্রকাশযোগ্য নয়।’
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, চাঁদা না পাওয়ায় গত ৬ আগস্ট গভীর রাতে দুয়ারীপাড়ার ৮ নম্বর সেকশনের ‘খ’ ব্লকের ১ নম্বর রোডের ৩৫/১ প্লটে চুরির ঘটনা ঘটে। প্লটের চারদিকে বাউন্ডারি দেওয়া ১৩০ পিস টিন চুরি করে নিয়ে যায় স্থানীয় চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট। এ ঘটনায় ওই প্লটের নিরাপত্তা প্রহরী মো. আশ্রাফ আলী রূপনগর থানায় একটি অভিযোগ দিলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি পুলিশ। পরদিন ৭ আগস্ট রাতে সিসিটিভি ফুটেজ দেখে ওই প্লটের কয়েকজন শেয়ারহোল্ডার চোরকে শনাক্ত করে আটক করেন। পরে রূপনগর থানার পরিদর্শক (অপারেশন) মো. তারেকুজ্জামানকে ফোন করে পুলিশ পাঠাতে বলেন ভুক্তভোগীরা। তারেকুজ্জামানকে তখন সুনির্দিষ্ট প্লট নম্বরসহ ঠিকানা দিতে বলেন। ভুক্তভোগীরা তখন পুলিশ দুয়ারীপাড়া এলাকায় পাঠাতে বলেন। তবে পরিদর্শন তারেকুজ্জামান তখনো সুনির্দিষ্ট ঠিকানা দিতে বলেন। পরে ভুক্তভোগীরা ঠিকানা দিলে পুলিশ আসার পরিবর্তে সেই চাঁদাবাজ সিন্ডিকেটের লোকজন এসে আটক করা চোরকে ছাড়িয়ে নিয়ে যায়। তবে পুলিশ আর আসেনি। পরে একজন শেয়ারহোল্ডার তারেকুজ্জামানকে ম্যাসেজ পাঠিয়ে বলেন, ‘ভাই, কাজটা ভালো করেননি। পুলিশ পাঠানোর আগে আপনি বারবার আমাকে লোকেশন জিজ্ঞেস করছেন। তখনই আমার সন্দেহ হয়েছে যে, আপনার পুলিশ যাওয়ার আগে আসামিপক্ষের লোক আসামির কাছে আসবে এবং আসামি পালিয়ে যাবে। সেটাই হয়েছে।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ চাঁদাবাজ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কয়েক ডজন সাধারণ ডায়েরি করেছেন গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্লট মালিকরা। এসব জিডি ও অভিযোগে চাঁদাবাজ ও দখলদারদের নামের তালিকাসহ তাদের বিস্তারিত তথ্য বিবরণী দেওয়া আছে। এমন বেশ কয়েকটি জিডি ও অভিযোগের কপি এসেছে কালবেলার হাতে। গত ৬ আগস্ট থানায় জমা দেওয়া একটি অভিযোগে এনামুল হক নামে একজন ‘ক’ ব্লকের ৭ নম্বর রোডের ২৪ নম্বর প্লট বেদখলের অভিযোগ করেন। জিডিতে ৩৭ দখলদারের নাম-ঠিকানা উল্লেখ রয়েছে। গত ৯ মে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ঢাকা উপবিভাগ-১-এর উপসহকারী প্রকৌশলী মাহমুদুর রহমান দায়ের করা একটি অভিযোগে ব্লক ‘ক’ এবং ‘খ’ ব্লকের ১ থেকে ৫ নম্বর রোড পর্যন্ত জায়গাটি ৪০ ফুট সরকারি রাস্তাসহ দখলের অভিযোগ করা হয়েছে। এ অভিযোগে ১৫ জন নামীয়সহ আরও ২০-২৫ জন অজ্ঞাত দখলদারের কথা উল্লেখ রয়েছে।
এ ছাড়া ২০২৫ সালের ২৮ জানুয়ারি করা তিনটি জিডিতে ‘ক’ ব্লকের ৫ নম্বর রোডের ১১, ২৬ ও ২৮ নম্বর এবং ৪ নম্বর রোডের ১৪ নম্বর প্লট বেদখলের কথা বলা হয়। ৭ এপ্রিল করা জিডিতে ৬ নম্বর রোডের ১০ নম্বর প্লট এবং ২৭ মার্চের জিডিতে ৭ নম্বর রোডের ২৯ নম্বর প্লট দখলের অভিযোগ করা হয়। ২৬ মার্চের জিডিতে ‘ক’ ব্লকের ৭ নম্বর রোডের ৩২ নম্বর প্লট দখলের কথা বলা হয়েছে। ১৫ মে করা আরেক জিডিতে ৭ নম্বর রোডের ৩২ নম্বর প্লট এবং ৩ মার্চের জিডিতে ‘বি’ ব্লকের ১ নম্বর রোডের ২৩, ২৫ ও ২৭ নম্বর প্লট দখলের অভিযোগ করা হয়। এ ছাড়া গৃহায়নের আনসারদের ওপর হামলা, ঘর ভাঙচুরসহ একাধিক ঘটনায় মামলাও হয়েছে। এ ছাড়া অনুসন্ধানে গৃহায়নের আরও বেশকিছু প্লট বেদখল হওয়ার তথ্যপ্রমাণ পেয়েছে কালবেলা। সেসব প্লটের মধ্যে রয়েছে, সেকশন- ৮, ব্লক - ক ও ২ নম্বর রোডের প্লট নম্বর ২২, ২৪, ৩০, ৮, ৬; ৫ নম্বর রোডের প্লট নম্বর ৮, ১৬, ৩১, ১১; ৬ নম্বর রোডের প্লট নাম্বার ৩১, ১৮, ২৩; ৭ নম্বর রোডের প্লট নম্বর ২০, ২২, ২৪, ২৬, ৩১; ৮ নম্বর রোডের প্লট নম্বর ১১, ২৪, ২৩ এবং খ ব্লকের ২ নম্বর রোডের প্লট নম্বর ৩৬, ৩ নম্বর রোডের প্লট নম্বর ২৯, ৪ নম্বর রোডের প্লট নম্বর ৩৬ ও ১। আইনি প্রতিকার চেয়ে ভুক্তভোগী ও গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ থানায় ডজন ডজন জিডি ও অভিযোগ দিলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি থানা পুলিশ। এ ছাড়া গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ ৩১ জন চিহ্নিত দখলদারের তালিকা তৈরি করেছে। এ ছাড়া বেশ কয়েকটি জিডি ও অভিযোগ ও সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ৩৬ জন দখলদার-চাঁদাবাজকে চিহ্নিত করেছে কালবেলা, যারা দীর্ঘদিন ধরে গৃহায়নের প্লট দখলের চেষ্টা করছেন।
চিহ্নিত দখলদার যারা: রূপনগর থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক শিপু মোল্লা, ৯২ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সভাপতি আমজাদ হোসেন মোল্লা, ভাষানটেক থানা যুবদল নেতা জাকির হোসেন শান্ত, ক্যান্টনমেন্ট থানা ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক পরিচয়দানকারী মো. সিয়াব উদ্দিন, ৯২ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সভাপতি মো. নজরুল ইসলাম (নজু), ভোলা বস্তির ইউনিট যুবদল নেতা মো. আক্তার হোসেন, রূপনগর থানার সাবেক স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা হুমায়ুন কবির স্বপন, রূপনগর থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সহসভাপতি মোহাম্মদ মামুন, ৯২ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সহসভাপতি জামাল ওরফে লাম্বা জামাল, দুয়ারীপাড়া ইউনিট আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা আইজল, দুয়ারীপাড়া ইউনিট আওয়ামী লীগের সভাপতি মোবারক হোসেন মেম্বার, গালিব হোসেন আরিফ, মো. রাজু (চান্দি রাজু), সুমন (পিতলা সুমন), ভোলা বস্তি ইউনিট যুবদলের সভাপতি এরশাদ খোকন, সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা ও বর্তমানে বিএনপির নেতা আব্দুল হক, ৯২ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির নেতা কামাল ওরফে সিএনজি কামাল, আজিজুল হক, দুলাল, মো. স্বপন, মো. সোহেল, সোহেল আনসারী, আবুল কালাম আনসারী (জামাল), মো. বাশার, শফিক গং, জহিরুল ইসলাম গং, সাইফুল ইসলাম গং, জসিম (জামাই জসিম) গং, ইউসুফ, সেলিম গং, জান্নাতুল ফেরদোস সুমি, শারমিন আক্তার, শিল্পী ওরফে খালিদা, মো. দুলার, এরশাদ খোকন গং ও তরিকুল ইসলাম মইন গং।
বিস্তারিত জানতে রূপনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) একাধিকবার ফোন দিয়েও পাওয়া যায়নি। পরে জানতে চাইলে রূপনগর থানার পরিদর্শক (অপারেশন) মো. তারেকুজ্জামান কালবেলাকে বলেন, ‘থানায় তো আমি একা নই, এখানে অফিসার ইনচার্জ ও ওসি তদন্ত আছেন। আমি ওসি অপারেশন। তাদের সঙ্গে কথা বললে বিস্তারিত জানতে পারবেন।’ এরপর তিনি আরও বলেন, ‘যেসব অভিযোগের বিষয় বললেন এসব বিষয়ের সঙ্গে আমার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। আর দুয়ারীপাড়া সংশ্লিষ্ট কোনো অভিযোগে আমি জড়াই না।’
রূপনগর থানা বিএনপির আহ্বায়ক এম আশরাফ ইসলাম কালবেলাকে বলেন, ‘দলের নামে ভাঙিয়ে কোনো অনিয়ম বা চাঁদাবাজি করার সুযোগ নেই। কেউ করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’