Image description
দুর্নীতি দমন কমিশন

চেয়ারম্যানসহ দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদকের) পদত্যাগের ১৬৬ দিন পর গত সোমবার রাতে শূন্য পদ পূরণ হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি মো. আসাদুজ্জামানকে চেয়ারম্যান করে তিন সদস্যের কমিশন নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকারের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। দুই কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন—সাবেক সচিব জাহাঙ্গীর আলম খান ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক সদস্য মো. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া।

স্বাধীন ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে দুদক প্রতিষ্ঠার পর থেকে এমন দীর্ঘ সময় ধরে কমিশন ফাঁকা থাকার ইতিহাস আর নেই। কমিশন না থাকায় নতুন অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত, মামলা দায়ের, তদন্ত প্রতিবেদন ও অভিযোগপত্র অনুমোদনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ আটকে রয়েছে। সম্পদ জব্দ এবং বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞার মতো সিদ্ধান্তও কমিশনের অনুমোদন ছাড়া এগোয়নি। ফলে স্থবির হয়ে পড়েছে দুর্নীতিবিরোধী কর্মকাণ্ড।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন কমিশন নিয়োগ করায় দুদকের সেই স্থবিরতা কেটে যাবে। জানতে চাওয়া হলে দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) মো. আকতারুল ইসলাম জানান, ‘আজ (মঙ্গলবার) চেয়ারম্যান ও দুজন কমিশনারই মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে যোগদান করেছেন। আগামীকাল সকালে পূর্ণ কমিশন দুদকে যোগদান করবে। নতুন কমিশন যোগদান করায় দুদকের কর্মকাণ্ডে গতি ফিরে আসবে।’ দুদকের আগের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মোমেন এবং দুই কমিশনার মিঞা মুহাম্মদ আলী আকবার আজিজী ও অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাফিজ আহসান ফরিদ গত ৩ মার্চ পদত্যাগ করেন।

নতুন চেয়ারম্যানের পরিচয় ও কর্মজীবন সাবেক বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামানের বাড়ি নওগাঁ জেলার সাপাহার উপজেলার খঞ্জনপুর তালকুড়া গ্রামে। ১৯৫৯ সালের ১ মার্চ তিনি এই গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। কর্মজীবনে আসাদুজ্জামান ১৯৮৩ সালের ৫ সেপ্টেম্বর জেলা আদালতে আইনজীবী হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৮৫ সালের ৫ সেপ্টেম্বর তিনি হাইকোর্ট বিভাগের আইনজীবী হন। এরপর ২০০১ সালের ২৫ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী হন। চারদলীয় জোট সরকারের আমলে ২০০৩ সালের ২৭ আগস্ট তিনি হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত বিচারক হিসেবে নিযুক্ত হন। ২০০৫ সালের ২৭ আগস্ট স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান।

২০১২ সালের ১৫ জুন আসাদুজ্জামান ও বিচারপতি মাহমুদুল হককে হাইকোর্ট বিভাগে জামিন ও আপিল আবেদনের শুনানির দায়িত্ব দেওয়া হয়। একই বছরের ৩১ জুলাই আসাদুজ্জামান ও বিচারপতি আবু তাহের মো. সাইফুর রহমান ২০০৮ সালের কর ফাঁকির মামলায় গিয়াসউদ্দিন আল মামুনের ১০ বছরের কারাদণ্ড বাতিল করেন। ২০১৬ সালের ৭ জুন আসাদুজ্জামান এবং বিচারপতি আতাউর রহমান খান ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনামকে জামিন দেন। ২০১৭ সালের ২৬ নভেম্বর তার নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের রাজনীতিবিদ মাহাতাব উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী মিনারকে জামিন দেন। আসাদুজ্জামান ও বিচারপতি এস এম মজিবুর রহমান ২৩ জুলাই ২০১৮ কুমিল্লার বিশেষ জজ আদালতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে করা মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির নির্দেশ দেন। আসাদুজ্জামান এবং বিচারপতি এস এম মজিবুর রহমান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবার সম্পর্কে মন্তব্যের বিষয়ে একটি মানহানির মামলায় আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে ২০১৮ সালের ৩০ জুলাই জামিন দেন। ২০২১ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর আসাদুজ্জামান ও বিচারপতি কাজী মো. ইজারুল হক আকন্দ সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জামিনের মেয়াদ বৃদ্ধি করেন। চব্বিশের ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মামলাসহ বিএনপির অনেক নেতার সাজার রায় বাতিল করেন। ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে শপথ নেন তিনি। ৬৭ বছর পূর্ণ হওয়ায় সংবিধান অনুসারে চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি অবসরে যান তিনি।

কমিশনার ড. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়ার পরিচয় ও কর্মজীবন

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, ড. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) ট্যাক্স ক্যাডারে নবম ব্যাচের কর্মকর্তা। দীর্ঘ কর্মজীবন শেষে ২০২২ সালে চলতি দায়িত্বে কমিশনার হিসেবে অবসরে যান। সবশেষ তিনি ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। ২০২৫ সালের ৪ মে তাকে ওই পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে ক্যাশ ফ্লো অ্যানালাইসিস, ট্যাক্স আইন, করনীতি এবং অর্থ পাচার রোধসহ আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণে তার দীর্ঘ তিন দশকের বেশি অভিজ্ঞতা রয়েছে। সাবেক উচ্চপদস্থ কর কর্মকর্তা ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি ১৯৮৪ সালে প্রথম শ্রেণিতে বি.কম (সম্মান) এবং ১৯৮৫ সালে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে এম.কম ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে তিনি বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের ওপর ডক্টর অব ফিলোসফি (পিএইচডি) ডিগ্রি অর্জন করেন। তার শিক্ষাজীবনের শুরুতে তিনি ১৯৭৯ সালে কুমিল্লার দাউদকান্দির বাতাকান্দি এসএসএএইচএম হাইস্কুল থেকে এসএসসি এবং ১৯৮১ সালে কবি নজরুল সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। ড. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া বর্ণাঢ্য কর্মজীবন শুরু হয় ব্যাংকার হিসেবে। ১৯৮৭ সালে আইসিবির সিনিয়র অফিসার হিসেবে যোগদান করেন। এক বছরের মাথায় ১৯৮৮ সালে এবি ব্যাংক পিএলসিতে প্রভিশনারি অফিসার হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৮৯ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগে প্রভাষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আর ১৯৯১ সালে তিনি বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) ট্যাক্স ক্যাডারে যোগদান করেন।

এনবিআরের আয়কর ও কাস্টমস ক্যাডারের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনি নানা বঞ্চনার শিকার হয়েছেন। দক্ষ এই সৎ কর্মকর্তাকে তৎকালীন প্রশাসন দফায় দফায় পদোন্নতি বঞ্চিত করে। যার কারণে সর্বশেষ তিনি চলতি দায়িত্বে কর কমিশনার হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। ৫ আগস্ট-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকার তাকে এনবিআরের সদস্য হিসেবে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দেয়। একই সঙ্গে আয়কর বিভাগের চৌকস এই কর্মকর্তাকে ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়।

এনবিআর সূত্র জানায়, বিসিএস ট্যাক্সেশন ক্যাডারের এই কর্মকর্তা যেমন সৎ, তেমনি দক্ষ ছিলেন। বহুল আলোচিত উত্তরা ষড়যন্ত্র মামলায় তাকে আসামি করা হয়। পরে সার্ভিসে ফিরলে, তাকে দফায় দফায় পদোন্নতি বঞ্চিত করা হয়। একই সঙ্গে কম গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে তাকে পদায়ন করা হয়। এত কিছুর পর বর্তমান আয়কর আইন প্রণয়নে তার ছিল উল্লেখযোগ্য ভূমিকা। সার্ভিস লাইফে তার ক্লিন ইমেজের কারণে কর কর্মকর্তাদের কাছে তিনি ছিলেন আইডল। উচ্চশিক্ষার প্রসারেও ড. ভূঁইয়ার অনন্য অবদান রয়েছে। বর্তমানে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (আইবিএ), ফিন্যান্স বিভাগ, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি, ইনডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ (আইইউবি), স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ (ইউএলএবি) এবং ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকসহ দেশের স্বনামধন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অ্যাডজাংক্ট ফ্যাকাল্টি হিসেবেও যুক্ত আছেন বলেও নিশ্চিত করেছে এনবিআর সূত্র।

কমিশনার জাহাঙ্গীর আলমের পরিচয় ও কর্মজীবন দুদক কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পাওয়া ড. জাহাঙ্গীর আলম খান বাংলাদেশ সরকারের সাবেক সচিব। তিনি ২০১৫ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ওএসডি ছিলেন। বিসিএস প্রশাসন ক্যাডার সপ্তম ব্যাচের মেধাবী এ কর্মকর্তাকে নানাভাবে বঞ্চিত করেছিল পতিত আওয়ামী লীগ সরকার। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে বঞ্চিত কর্মকর্তাদের ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দেয়। তখন ড. জাহাঙ্গীর আলম খান ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি পেয়ে সচিব হন। তবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাননি তিনি। অবশেষে তাকে দুদকের কমিশনার নিয়োগ দিয়েছে সরকার। ড. জাহাঙ্গীর আলম মানিকগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন তিনি। পরে বিদেশে পিএইচডি করেন ড. আলম। সবশেষ বেসরকারি আশা ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতা করছিলেন তিনি।