সমুদ্র উপকূলবর্তী সুন্দরবন সংলগ্ন জনপদ দাকোপের মানুষ স্বাস্থ্য সেবা পেতে চরম দুর্ভোগ ও হয়রানির শিকার হচ্ছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
অর্থনৈতিকভাবে অনগ্রসর পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠীকে সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা পাওয়ার পরিবর্তে টাকার বিনিময়ে সেবা কিনতে হচ্ছে। আর এ অনিয়মের জন্য তারা দুষছেন হাসপাতালের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা অফিসার ডা. সুদীপ কুমার বালাকে।
দাকোপ থানা স্বাস্থ্য কেন্দ্রকে তিনি ব্যক্তিগত ক্লিনিকে পরিণত করেছেন বলে অভিযোগ তাদের। এনিয়ে ভুক্তভোগী জনগণ একাধিকবার মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছেন। তবে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ডা. সুদীপ বালা অবৈধ অর্থ ও প্রতিপত্তির দাপট দেখিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছেন।
এলাকাবাসীর সাথে কথা বলে ও তাদের দেওয়া অভিযোগের ভিত্তিতে জানা গেছে, ডা. সুদীপ কুমার বালা ২০২২ সালের ১৭ নভেম্বর দাকোপ থানা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে যোগ দেন। এর আগে তিনি কয়রায় কাজ করতেন। দাকোপে যোগ দিয়ে তিনি নিজেকে সাবেক এমপি শেখ তন্ময়ের বন্ধু হিসেবে নানা মহলে পরিচয় দিতে থাকেন। তার বাড়ি বাগেরহাট জেলার দিগরাজে। যেটি পতিত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার চাচাতো ভাইয়ের ছেলে শেখ তন্ময়ের নির্বাচনি আসনে। ফলে জনগণ দ্রুত তা বিশ্বাস করে নেয়। এই পরিচয়ের দাপটে তিনি প্রথম থেকেই ধরাকে সরা জ্ঞান করতে থাকেন। অনিয়মকে পরিণত করেন নিয়মে। নিজের প্রভাবকে পাকাপোক্ত করতে স্থানীয় আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি অসিত সাহার সাথে বিশেষ সম্পর্ক গড়ে তোলেন।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সরকারি এই হাসপাতালে ফ্রি ট্রিটমেন্ট পাওয়ার কথা থাকলেও রোগীদের নগদ অর্থের বিনিময়ে সেবা কিনতে হয়। এক্সরে ছাড়া সব ধরনের প্যাথলজিক্যাল টেস্টের ব্যবস্থা থাকলেও তিনি রোগীদের হরহামেশাই টেস্টের জন্য বাইরে প্রাইভেট প্যাথলজি সেন্টারে পাঠান। সরকারি স্বাস্থ্য কেন্দ্রে আলট্রাসনো মেশিন থাকা সত্ত্বেও রোগীদের বাইরে যেতে হয় টেস্টের জন্য। ২০০ টাকায় আপার অ্যাবডোমিন এবং ২৫০ টাকার হোল অ্যাবডোমিন টেস্ট বাইরে ৭ শত থেকে ৮ শত টাকায় করতে গিয়ে চরম আর্থিক চাপে পড়তে হয় তাদের।
এর চাইতে বড় অনিয়ম ঘটে গর্ভবতী নারীদের সিজারিয়ান অপারেশনে। সাড়ে ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় করতে হয় এক একটি অপারেশনে। ওটিতে সরকারি ভাবে নানা ওষুধ বা সামগ্রী সরবরাহ নেই, অ্যানেসথেশিয়া ডাক্তার নেই বা অ্যাসিস্ট্যান্ট নেই, বাইরে থেকে আনতে হবে, এই অজুহাতে নেওয়া হয় টাকা। এতো টাকা ব্যয়ের সামর্থ্য না থাকায় অনেককেই ধার দেনা করতে হয়।
এখানেই শেষ নয়। হাসপাতালের সরকারি অ্যাম্বুলেন্স খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পর্যন্ত আসা যাওয়ায় সরকার নির্ধারিত রেট ৮০০ টাকা। সুদীপ বালা আসার পর তা এক লাফে বেড়ে ১ হাজার ২০০ টাকা করা হয়। আর এই অ্যাম্বুলেন্স চালানোর জন্য তিনি পূর্বের কর্মস্থল কয়রা থেকে মো. আসাদ হোসেন নামে এক ব্যক্তিকে দাকোপে নিয়ে আসেন। তাকে মাস্টার রোলে মালী পদে নিয়োগ দিলেও তিনি মূলত অ্যাম্বুলেন্স চালাতেন। সম্প্রতি সেখানে স্থানীয় এমপির সুপারিশে স্থানীয় একজনকে ড্রাইভার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ফলে আসাদ এখন ডাক্তার সুদীপের ব্যক্তিগত গাড়ি চালাচ্ছেন।
এছাড়া হাসপাতালে প্রতিবছর ওষুধ ক্রয়সহ অন্যান্য কেনাকাটায় অনিয়মের আশ্রয় নেওয়া হয় বলে প্রাপ্ত অভিযোগে জানা গেছে।
অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে মুঠোফোনে দাকোপ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মকর্তা ডা. সুদীপ বালার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গাইনি ও অ্যানেসথেশিয়া চিকিৎসক না থাকায় বাইরে থেকে চিকিৎসক এনে সিজারিয়ান অপারেশন করাতে হয়। এক্ষেত্রে অপারেশন প্রতি তাদের প্রায় ৪ হাজার ৫০০ টাকা দিতে হয়। তবে এ টাকা তিনি নিজে নেন না বলে দাবি করেন। যারা সিজারিয়ান অপারেশন করেন, তাদেরই এই টাকা দেওয়া হয় বলে জানান তিনি।
সরেজমিনে অনুসন্ধান সাপেক্ষে জানা যায় যে, সিজারিয়ান অপারেশনের জন্য তিনি বাইরে থেকে কোনো সার্জন না এনে নিজেই অপারেশন করেন, নিজেই সেই টাকা নেন। এখন সামান্য কিছু টাকা এনেসেথেসিয়া ডাক্তার এবং স্টাফদের দিয়ে থাকেন। এছাড়া কেবিনের জন্য রোগীদের গুনতে হয় অতিরিক্ত অর্থও।
অ্যাম্বুলেন্সের সরকারি নির্ধারিত ভাড়া ৮০০ টাকার পরিবর্তে ১ হাজার ২০০ টাকা নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে ডা. সুদীপ বালা বলেন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সরকারি অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও এর জন্য কোনো চালক নেই। ফলে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে একজন চালক দিয়ে রোগীদের খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। অতিরিক্ত ৪০০ টাকা ওই চালককে দেওয়া হয় বলে তিনি জানান।
তিনি আরও বলেন, এসব বিষয়ে একটি রেজুলেশন করা আছে। আগের সংসদ সদস্যের (এমপি) সময় ওই রেজুলেশন করা হয়েছিল এবং বিষয়টি বর্তমান সিভিল সার্জনকেও অবহিত করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
তবে রোগীদের বিভিন্ন বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠানো এবং বাইরে ক্লিনিকে অপারেশন করিয়ে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন ডা. সুদীপ বালা।
থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ঘটে চলা অনিয়ম শুনে বিষময় প্রকাশ করেন খুলনার সিভিল সার্জন মোছা. মাহফুজা খাতুন। তিনি বলেন, লোকমুখে বিষয়টি জানতে পেরে দাকোপ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মকর্তার কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, আগের এমপি থাকাকালে এ বিষয়ে একটি রেজুলেশন করা হয়েছিল। তবে ওই রেজুলেশনের বিষয়ে তাকে অবহিত করা হয়নি এবং তার দপ্তরেও এ-সংক্রান্ত কোনো কাগজপত্র নেই।
সিভিল সার্জন মোছা. মাহফুজা খাতুন আরও বলেন, এ ধরনের বিষয়ে কেউ লিখিত অভিযোগ দিলে সত্যতা যাচাই করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।