Image description

বছর দেড়েক আগে বুড়িগঙ্গা নদীতে রাক্ষুসে সাকার মাছের উপদ্রব অনেকটাই কমে গিয়েছিল। তখন ফজলু মিয়া নামে এক মাঝি ভাইরাল হন। অনেকটা রাগের বশে প্রায় এক বছর একাই কয়েক টন সাকার ধরে আলোচনায় আসেন তিনি। পরে অন্য মাঝি ও জেলেরাও তাঁকে অনুসরণ করায় নদীতে সাকারের সংখ্যা কিছুটা কমে। কিন্তু এবার বর্ষা আসতেই আবার বেড়েছে মাছটির দাপট। অবশ্য এ মাছের অনেক উপকারিতা রয়েছে বলে জানিয়েছেন একজন গবেষক।

সম্প্রতি সরেজমিনে বুড়িগঙ্গা ঘুরে দেখা গেছে, পুরো নদীতেই কিলবিল করছে সাকারের বাচ্চা। বিশেষ করে মিটফোর্ড হাসপাতালসংলগ্ন নদী, খোলামোড়া ঘাট, নবাবচরসহ যেখানে বর্জ্য ফেলা হচ্ছে এবং স্যুয়ারেজের পানি নদীতে মিশছে, সেখানে লাখ লাখ বাচ্চা পানির ওপর ভেসে খাবি খাচ্ছে। পানিতে ছাতা ডোবাতেই ছোট-মাঝারি মিলিয়ে ৪-৫ কেজি সাকার উঠে আসে।

পুরান ঢাকার বাসিন্দা এবং নদীভিত্তিক সংগঠন ‘আমরা দুর্বার’-এর সভাপতি এ সালাম বলেন, ‘ছোটবেলায় বুড়িগঙ্গায় সাঁতার কেটে বড় হয়েছি। এখন সাকারের কারণে নদীতে নামা যায় না। গত বছরও সাকার কিছুটা কম ছিল। এ ছাড়া শীতকালে দূষণ বেশি থাকায় মাছগুলো মাটির সঙ্গে মিশে থাকে। বর্ষায় পানি পরিষ্কার হওয়ায় প্রচুর বাচ্চা ফুটেছে। যেখানে ময়লা ফেলা হয়, খাবারের জন্য মাছ সেখানে ভিড় করে। এসব জায়গায় এখনো জাল ফেললে টেনে তোলা কঠিন।’

শুধু বুড়িগঙ্গা নয়, তুরাগের কালো পানিতেও এখন সাকারের আধিপত্য। বুড়িগঙ্গায় দুই দশকের বেশি সময় মাছ ধরা মনসুর মোল্লা এখন সবজি ফেরি করেন। তিনি বলেন, ‘বুড়িগঙ্গায় আগে শিং, মাগুর, বেলে, পুঁটিসহ অনেক দেশি মাছ পাওয়া যেত। সাকারের কারণে অন্য মাছ হারিয়ে গেছে। মাছটির ধারালো পাখনার আঘাতে জেলেরা আহত হন। বাজারে বিক্রি করা যায় না। এ কারণে বেশির ভাগ জেলে মাছ ধরা ছেড়ে দিয়েছেন।’ গবেষকদের মতে সাকার ইতোমধ্যে দেশের ৬৪ জেলাতেই ছড়িয়ে পড়েছে। 

শুধু নদী-খাল নয়, বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) গবেষণা পুকুরেও এটি পাওয়া গেছে। মাছটি দ্রুত বংশ বিস্তার করে এবং দেশি মাছের ডিম ও লার্ভা খেয়ে ফেলে। এর ধারালো পাখনার আঘাতে অন্য মাছের শরীরে ক্ষত হয়ে সংক্রমণও হয়। দূষিত পানিতে, যেখানে অন্য মাছ টিকতে পারে না, সেখানেও সাকার অনায়াসে বেঁচে থাকে এবং এমনকি তিন দিন পর্যন্ত পানি ছাড়াও বেঁচে থাকতে পারে। ফলে দেশি মাছের জন্য এটি বড় হুমকি হয়ে উঠছে।

এদিকে ২০২২ সালে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সাকার মাছের আমদানি, উৎপাদন ও বিপণন নিষিদ্ধ করে। ধরা পড়লে মাছটি মাটিতে পুঁতে ফেলার নির্দেশনা দেওয়া হয়। এটাকেই ভুল সিদ্ধান্ত বলে মনে করছেন গবেষক ও মৎস্যজীবীরা। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশিং অ্যান্ড পোস্ট হারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান, সহকারী অধ্যাপক ড. মো. মাসুদ রানা বলেন, ‘মাছটি যদি বিক্রিই করা না যায়, তাহলে কার দায় পড়েছে এটা ধরে মাটিতে পুঁতে ফেলবে?’ তিনি বলেন, ‘দূষিত পানিতে বাঁচতে পারলেও পরিষ্কার পানিতে সাকার বেশি প্রজনন করে।

এ কারণে বর্ষায় আবার বুড়িগঙ্গায় সাকার বেড়েছে।’ তিনি বলেন, ‘জীববৈচিত্র্যের জন্য সাকার হুমকি। তবে এটিকে সম্পদে পরিণত করা সম্ভব।’ তিনি নিজে মাছটি খেয়েছেন দাবি করে বলেন, ‘সাকারের শুঁটকিতে ২৫ থেকে ২৮ শতাংশ আমিষ রয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পুষ্টিগুণ আছে। বিশ্বের অনেক দেশে এ মাছ দিয়ে শুঁটকি, পোষা প্রাণীর খাবার, মাছ ও পোলট্রি ফিড, জৈবসার ও বায়োডিজেল তৈরি হচ্ছে। 

দূষিত পানির সাকারে ভারী ধাতু পাওয়া গেলেও পরিষ্কার জলাশয়ের মাছের ক্ষেত্রে ক্ষতিকর মাত্রা পাওয়া যায়নি। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে কিছুদিন ট্যাংকে রেখে মাছটি নিরাপদ করা সম্ভব। জেলেদের কাছ থেকে মাছ কিনে শিল্পে ব্যবহার শুরু করা গেলে তাঁরা মাছটি ধরবেন, ফলে জলাশয়েও এর সংখ্যা কমবে। অন্যথায় অচিরেই এটি দেশের জলজ জীববৈচিত্র্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠবে।’