৩৫ কোটি টাকা পানিতে ফেলা পথ আবার চালুর তোড়জোড়
তৌফিকুল ইসলাম , ঢাকা রাজধানী ঢাকার চারপাশে ১১০ কিলোমিটার দীর্ঘ বৃত্তাকার নৌপথ আবার চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার । কিন্তু দেড় দশক আগে এই কাজ করে ব্যর্থ হয়েছিল তৎকালীন সরকার । সেখানে ঢালা অর্থের প্রায় পুরোটাই পানিতে গিয়েছিল । নদীদূষণ ও দুর্বল পরিকল্পনা , অবকাঠামোগত ঘাটতি এবং সবকিছুর ফল হিসেবে যাত্রী না পাওয়ায় ওই নৌপথে যাত্রীবাহী নৌযান চালু রাখা যায়নি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা । এবার অবশ্য আগের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে বেসরকারি অংশীদারত্বে নৌযান চালুর চিন্তা করা হচ্ছে । নতুন পরিকল্পনা বিষয়ে জানতে চাইলে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব জাকারিয়া আজকের পত্রিকাকে বলেন , বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সঙ্গে আলোচনা
" টার্মিনাল সংযোগ , পার্কিং সুবিধা , নির্ধারিত বিরতিতে নৌযানের আসা - যাওয়া , যাত্রীবান্ধব নৌযান এবং নদীপথে অনিয়ন্ত্রিত ছোট নৌযান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে । অধ্যাপক হাদিউজ্জামান যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ চলছে । তাঁরা একটি প্রাথমিক প্রস্তাব দিয়েছেন এবং বিস্তারিত প্রস্তাব জমা দিতে দুই সপ্তাহ সময় চেয়েছেন । সেই প্রস্তাব পাওয়ার পর কোন ধরনের নৌযান চলবে , কতটি নৌযান প্রয়োজন হবে এবং কী ধরনের নীতিমালা লাগবে , তা পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে ।
সচিব আরও বলেন , সরকারের লক্ষ্য আগামী তিন মাসের মধ্যে বিষয়টি চূড়ান্ত করা , তবে অগ্রগতি ভালো হলে এক থেকে দেড় মাসের মধ্যেও সিদ্ধান্ত হতে পারে । মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী , সরকার ল্যান্ডিং স্টেশন , রুট ও সময়সূচির মতো সহায়তা দেবে । আর নৌযান সংগ্রহ ও পরিচালনার দায়িত্ব থাকবে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের ওপর ।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে , রাজধানী ঢাকার চারপাশে বুড়িগঙ্গা , তুরাগ , শীতলক্ষ্যা , বালু ও ধলেশ্বরী নদী মিলিয়ে প্রায় ১১০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই বৃত্তাকার নৌপথ একসময় যানজট নিরসনের সম্ভাবনাময় বিকল্প হিসেবে দেখা হয়েছিল । সেই লক্ষ্যে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন ( বিআইডব্লিউটিসি ) ২০১০ সালের ২৮ আগস্ট বাদামতলী - গাবতলী পথে এবং
৩৫ কোটি টাকা পানিতে ফেলা পথ আবার চালুর
২০১৪ সালের ২২ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জ - টঙ্গী পথে ওয়াটার বাস চালু করে । তিন দফায় মোট ১২ টি ওয়াটার বাস নামানো হয় । এগুলো তৈরিতে ব্যয় হয় ৯ কোটি ২০ লাখ ৩২ হাজার ৩০৬ টাকা । কিন্তু আয় - ব্যয়ের হিসাব বলছে , প্রকল্পটি শুরু থেকেই আর্থিকভাবে টেকসই ছিল না । বিআইডব্লিউটিসির তথ্য অনুযায়ী , ওয়াটার বাস পরিচালনা থেকে আয় হয় ২ কোটি ৫২ লাখ টাকা , আর ব্যয় হয় ৩৭ কোটি ৮৬ লাখ টাকা । অর্থাৎ ৩৫ কোটি ৩৪ লাখ টাকা লোকসান ।
এই অবস্থায় চালু না রাখতে পেরে ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে নারায়ণগঞ্জ টঙ্গী এবং ২০২০ সালের মার্চে বাদামতলী - গাবতলী পথে ওয়াটার বাস বন্ধ ঘোষণা করা হয় । ১২ টি ওয়াটার বাসের মধ্যে মাত্র তিনটি এখনো সচল আছে বলে জানা গেছে । এর মধ্যে দুটি আরিচা - কাজিরহাট রুটে ভাড়ায় চলছে ।
বৃত্তাকার নৌপথ কেন সফল হয়নি : সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর পর্যালোচনায় দেখা গেছে , ওয়াটার বাস ব্যর্থ হওয়ার পেছনে একক কোনো কারণ ছিল না । বরং একাধিক সমস্যার কারণে যাত্রীরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন । সবচেয়ে বড় কারণ ছিল সড়কপথের প্রতিযোগিতা । গাবতলী - সদরঘাট বেড়িবাঁধ সড়ক চালু হওয়ার পর ওই পথে বাস , মিনিবাস , লেগুনা ও বিআরটিসির দোতলা বাস যাত্রী পরিবহন করতে থাকে । বাদামতলী সেতুর নিচ থেকে প্রতিদিন শতাধিক যান চলাচল করত । ফলে যাত্রীরা কম সময়ে সড়কপথেই গন্তব্যে পৌঁছে যেত । নৌপথ ব্যর্থ হওয়ার দ্বিতীয় বড়
কারণ বুড়িগঙ্গার দূষণ । দুর্গন্ধযুক্ত পানি ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে নৌভ্রমণে যাত্রীদের অনাগ্রহ তৈরি হয় ।
দুর্বল
এ ছাড়া গাবতলী ল্যান্ডিং স্টেশনের যোগাযোগব্যবস্থা , মধ্যবর্তী স্টেশনগুলোতে পর্যাপ্ত ওঠানামার সুবিধা না থাকা এবং খোলামুড়া - বছিলা এলাকায় স্থানীয় ট্রলারমালিকদের বাধাও সেবাটিকে অকার্যকর করে তোলে । নারায়ণগঞ্জ - টঙ্গী পথেও একই চিত্র ছিল । মধ্যবর্তী স্টেশনগুলোতে পন্টুন ও অবকাঠামো না থাকায় ওয়াটার বাস ভেড়ানো যেত না । অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জ - টঙ্গী শাটল ট্রেন দ্রুত ও সুবিধাজনক হওয়ায় যাত্রীরা ট্রেনকেই বেশি বেছে নিত । যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক হাদিউজ্জামান মনে করেন , মূল সমস্যা ছিল পরিকল্পনায় । তিনি বলেন , অতীতে বৃত্তাকার নৌপথকে শুধু ওয়াটার বাস প্রকল্প হিসেবে দেখা হয়েছিল । তাই উদ্যোগগুলো টেকসই হয়নি ।
যদি লক্ষ্য হয় সড়কের যানজট কমানো , তাহলে যাত্রীর বাসা থেকে গন্তব্য পর্যন্ত পুরো যাত্রাপথকে পরিকল্পনার মধ্যে আনতে হবে । অধ্যাপক হাদিউজ্জামানের মতে , শুধু নৌযান কিনে চালু করলেই হবে না । টার্মিনাল সংযোগ , পার্কিং সুবিধা , নির্ধারিত বিরতিতে নৌযানের আসা যাওয়া , যাত্রীবান্ধব নৌযান এবং নদীপথে অনিয়ন্ত্রিত ছোট নৌযান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে । নতুন পরিকল্পনায় কী থাকছে : নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় গত ৩০ জুলাই বৃত্তাকার নৌপথ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করে । পরে ১ আগস্ট বুয়েটের
বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নৌপথ পরিদর্শন করেন । ২ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বৈঠকেও বিষয়টি আলোচনা হয় । এসব বৈঠকে প্রাথমিকভাবে গাবতলী - সদরঘাট নৌপথে বেসরকারি উদ্যোগে যাত্রীবাহী নৌযান চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে । দীর্ঘ মেয়াদে গাবতলী থেকে আশুলিয়া , টঙ্গী , নারায়ণগঞ্জ , সদরঘাট ও বছিলা একটি পূর্ণাঙ্গ বৃত্তাকার পথ বিবেচনায় রয়েছে । সড়ক পরিবহন ও সেতু , রেল এবং নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানিয়েছেন , আগামী দুই মাসের মধ্যে অগ্রগতি পর্যালোচনা করে আবার বৈঠক হবে ।
তখন বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করা , নদীদূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং যাত্রীবান্ধব নৌপরিবহনব্যবস্থা চালুর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে । যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন , নদীপথকে বাস , রেল ও সড়ক পরিবহনের সঙ্গে সমন্বয় না করলে আগের মতো কয়েকটি নৌযান চালুর পর লোকসানের কারণে উদ্যোগটি আবারও বন্ধ হয়ে যেতে পারে ।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন , ঢাকার চারপাশের নদীগুলো যানজট নিরসন , পর্যটন পরিবেশবান্ধব গণপরিবহনের বড় সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে । তবে এ জন্য খণ্ডিত নয় , সমন্বিত ও যাত্রীকেন্দ্রিক পরিকল্পনা প্রয়োজন । দেখার বিষয় , এবারের উদ্যোগে বৃত্তাকার নৌপথ নতুন করে ভেসে উঠবে , নাকি আগের মতো আবারও ডুবে যাবে ।