Image description

সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই মন্ত্রিসভায় সম্ভাব্য রদবদল নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে জোর আলোচনা। আগামী ১৭ আগস্ট বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হতে যাচ্ছে।

এরই মধ্যে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের কর্মদক্ষতা, মন্ত্রণালয় পরিচালনায় সক্ষমতা এবং ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে মূল্যায়ন চলছে বলে সরকারসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মন্ত্রিসভার কারো কারো দপ্তর পরিবর্তন হতে পারে। আবার কারো দায়িত্ব কমতে পারে, একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা কয়েকজনের দপ্তর ভাগ করে দেওয়া হতে পারে। একই সঙ্গে মন্ত্রিসভায় নতুন মুখ যুক্ত করার বিষয়েও জোরালো আলোচনা রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত মন্ত্রিসভা গত ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ গ্রহণ করে। এই মন্ত্রিসভায় প্রধানমন্ত্রীসহ মোট ৪৯ জন সদস্য রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ২৫ জন মন্ত্রী এবং ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী। এ ছাড়া পরে কয়েকজন উপদেষ্টা অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন।

১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর তারেক রহমানের নেতৃত্বে ১৭ ফেব্রুয়ারি নতুন সরকার গঠিত হয়। পরদিন ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৮০ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

রাজনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, দলের সিনিয়র নেতাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন মন্ত্রিসভায় যুক্ত হতে পারেন। এর মধ্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় এমপি, ড. আব্দুল মঈন খান এমপি ও সেলিমা রহমান এমপিকে মন্ত্রী করা হতে পারে। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেতে পারেন।

মন্ত্রিপরিষদে যুক্ত হতে পারেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা জয়নুল আবদিন ফারুক এমপি, বিএনপির সহসাংগঠনিক সম্পাদক ও কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম বাবুল এমপি।

এদিকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে পূর্ণ মন্ত্রী করা হতে পারে। এ ছাড়া দু-তিনটি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীকে মন্ত্রী করা হতে পারে।

এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, মন্ত্রিপরিষদের কারো কর্মদক্ষতায় সন্তুষ্ট না হলে দপ্তর পুনর্বণ্টন কিংবা নতুন কাউকে দায়িত্ব দেওয়া স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অংশ। প্রধানমন্ত্রী চাইলে যেকোনো সময় পরিবর্তন আনতে পারেন।

তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় না এখনই কোনো রদবদল হচ্ছে। আগে ১৮০ দিন শেষ হোক। তারপর কাজ পর্যালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এই মুহূর্তে আমার কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই।’

সরকার গঠনের শুরুতেই মন্ত্রণালয়গুলোর

জন্য নির্দিষ্ট সময়ের কর্মপরিকল্পনা এবং তা বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। সরকারের প্রথম বৈঠকেই মন্ত্রণালয়গুলোকে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা দেওয়ার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ফলে ছয় মাস পূর্তিতে কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের অগ্রগতি এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সরকারসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের মূল্যায়নে শুধু রাজনৈতিক বিবেচনাই নয়, বাস্তব কর্মদক্ষতাকে গুরুত্ব দেওয়া হতে পারে। নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের অগ্রগতি, প্রশাসনিক জটিলতা নিরসন, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমাতে নেওয়া উদ্যোগ, মাঠ প্রশাসনের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং সংসদে জবাবদিহির বিষয়গুলোও মূল্যায়নের আওতায় আসতে পারে।

ছয় মাসে কর্মপরিকল্পনার অগ্রগতি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে জমা দিতে তৎপরতা : ছয় মাসের মূল্যায়ন সামনে রেখে মন্ত্রিসভার সদস্যদের মধ্যেও সতর্কতা বেড়েছে। প্রথম ছয় মাসে অর্জন ও কর্মপরিকল্পনার খাতভিত্তিক সুনির্দিষ্ট অগ্রগতির সব তথ্য-উপাত্ত ১০ আগস্টের মধ্যে জমা দিতে তৎপর রয়েছে মন্ত্রণালয়গুলো। মন্ত্রিপরিষদের একাধিক সদস্য কালের কণ্ঠকে তা নিশ্চিত করেছেন।

এ ব্যাপারে বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো. শরিফুল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘১৮০ দিনের কর্মসূচি বাস্তবায়নের অগ্রগতির তথ্য প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে চাওয়া হয়েছে। আমাদের মন্ত্রণালয় থেকে আগামী ১০ আগস্টের মধ্যেই কাজে অগ্রগতির সব তথ্য-উপাত্ত জমা দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।’

একাধিক মন্ত্রণালয়, চাপ বাড়ছে : সরকারের ভেতরে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা মন্ত্রীদের বিষয়টি। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ধারণা, এক ব্যক্তির হাতে দুই বা তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থাকায় অনেক ক্ষেত্রে কাজের চাপ বেড়েছে। এতে মন্ত্রণালয় পরিচালনায় কাঙ্ক্ষিত গতি ব্যাহত হচ্ছে কি না, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।

বর্তমানে খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন। শেখ রবিউল আলমের হাতে রয়েছে সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়।

এ ছাড়া মো. আমিন উর রশিদ কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করছেন। আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন। ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আছেন।

ফকির মাহবুব আনাম স্বপন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন। আরিফুল হক চৌধুরী শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সামলাচ্ছেন। ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেনের দায়িত্বে রয়েছে মহিলা ও শিশু বিষয়ক এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা কয়েকজনের দপ্তর ভাগ করে দেওয়া হলে প্রশাসনিক কাজে গতি বাড়তে পারে। এ ক্ষেত্রে নতুন কয়েকজনকে মন্ত্রিসভায় এনে দায়িত্ব দেওয়ার সম্ভাবনাও আলোচনায় রয়েছে।

‘বাদ’ নয়, সতর্কবার্তাও হতে পারে : মন্ত্রিসভায় রদবদলের আলোচনা জোরালো হলেও প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ করতে না পারা প্রত্যেক মন্ত্রীকে সরিয়ে দেওয়া হবে—এমন সিদ্ধান্ত না-ও আসতে পারে।

সরকারের ভেতরের একটি সূত্র বলছে, যাঁদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের বিতর্ক নেই, কিন্তু কর্মদক্ষতায় ঘাটতি রয়েছে, তাঁদের সতর্ক করে আরো সময় দেওয়া হতে পারে। অর্থাৎ ১৮০ দিনের মূল্যায়নের পরই সবার ভাগ্যে ‘বিদায়’ লেখা হচ্ছে—এমনটা নিশ্চিত নয়। বরং কাজের গতি বাড়াতে দায়িত্বের পুনর্বিন্যাস, মন্ত্রণালয় ভাগ করে দেওয়া কিংবা নির্দিষ্ট কিছু মন্ত্রীকে নতুন লক্ষ্য বেঁধে দেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আগামী কয়েক সপ্তাহ সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। মন্ত্রিসভায় বড় ধরনের পরিবর্তন হবে, নাকি সীমিত পরিসরে দপ্তর পুনর্বণ্টন করে নতুন মুখ যুক্ত করা হবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।