সাপ্তাহিক ছুটির দিনে গতকাল বিভিন্ন স্থানে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ২০ জন। আহত হয়েছেন অর্ধশতাধিক। এর মধ্যে সিলেটে ৯, বগুড়ায় ৭, চট্টগ্রামে ২, বাগেরহাটে ১ এবং ঝিনাইদহে একজন। আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-
সিলেট : সিলেটে যাত্রীবাহী দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ৯ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। গতকাল সকাল ৭টার দিকে সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের ওসমানীনগর উপজেলার কাশিকাপন এলাকায় ইউনিক ও বেঙ্গল পরিবহনের দুটি বাসের মধ্যে সংঘর্ষের এ ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনায় আহত আরও ১৩ জনকে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। হতাহতদের সবাই ইউনিক পরিবহনের যাত্রী। নিহতদের পরিবারকে তাৎক্ষণিক ২০ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দিয়েছে ওসমানীনগর উপজেলা প্রশাসন।
নিহতদের মধ্যে ছয়জনের পরিচয় শনাক্ত করা গেছে। তারা হলেন কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার লক্ষ্মীপুর গ্রামের সাইফুল ইসলাম (৫০), একই জেলার ভৈরব উপজেলার চ-ীবের গ্রামের কালু মিয়ার মেয়ে সংগীতশিল্পী পেহলি ভৈরবী (১৯), ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার বারী মিয়ার ছেলে আবুল হোসেন (৪৬), কুমিল্লার লাকসাম থানার রফিকুল ইসলামের ছেলে আরমান হোসেন রাহিম (১৯), ঢাকা বিক্রমপুরের জাহাঙ্গীর শেখের মেয়ে জাইফা ইসলাম (৩) ও সিলেট মহানগরের সোবহানীঘাটের উত্তম রায়ের ছেলে সপ্তম রায় প্রীতম (২২)।
এর মধ্যে জাইফা ও প্রীতমকে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। বাকিরা ঘটনাস্থলেই মারা যান। নিহত বাকি তিনজনের পরিচয় শনাক্তে আঙুলের ছাপ নিয়ে কাজ করছে পিবিআই। ফেসবুকে দুর্ঘটনার একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। ওই ভিডিওতে দেখা গেছে, ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা সিলেটগামী বেঙ্গল পরিবহনের একটি স্লিপার বাস কাভার্ড ভ্যানকে ওভারটেক করতে গিয়ে বিপরীত দিক থেকে আসা ইউনিক পরিবহনের বাসের লেনে চলে আসে। এ সময় দ্রুতগতির বাস দুটির মধ্যে সংঘর্ষ হলে ইউনিক পরিবহনের বাসটি রাস্তার পাশের খাদে নেমে যায়।
সংঘর্ষে উভয় বাস ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ইউনিক পরিবহনের যাত্রীরাই হতাহত হন। খবর পেয়ে হাইওয়ে ও ওসমানীনগর থানাপুলিশ এবং ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করেন। ওসমানীনগর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের স্টেশন অফিসার অপু মিয়া জানান, খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা দ্রুত উদ্ধার অভিযান শুরু করেন। তারা আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠান। আর শেরপুর হাইওয়ে পুলিশ নিহতদের মৃতদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ওসমানী মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠায়।
ওসমানীনগর থানার ওসি গাজী মোস্তফা জানান, দুর্ঘটনার পর থানাপুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা যৌথভাবে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করেন। দুর্ঘটনাকবলিত বাস দুটি জব্দ করে শেরপুর হাইওয়ে পুলিশের হেফাজতে রাখা হয়েছে। বগুড়া : বগুড়া-নওগাঁ আঞ্চলিক মহাসড়কে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি বাসের চাপায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে সাতজনে দাঁড়িয়েছে। গতকাল ভোর সাড়ে ৫টার দিকে সদর উপজেলার এরুলিয়া উচ্চবিদ্যালয়ের সামনে কাজের সন্ধানে দাঁড়িয়ে থাকা দিনমজুরদের ওপর যাত্রীবাহী বাসটি উঠে গেলে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন প্রায় ২৫ জন। তাঁদের উদ্ধার করে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
নিহত সাতজনেরই নাম-পরিচয় জানা গেছে। তাঁরা হলেন বগুড়া সদর উপজেলার ফাঁপোড় মধ্যপাড়ার বেল্লাল হোসেন (৪০), কাহালু উপজেলার নারহট্ট সরদারপাড়ার নুর মোহাম্মদ সরদার (৭৫), জয়পুরহাট জেলার কালাই থানার মো. আনারুল ইসলাম (৫৫), পাঁচবিবি থানার আমিরুল (৪০), গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের আবু সাইদ (৪৫), একই উপজেলার নুর আলম (৪৫) এবং দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার মো. তাজিমুল (৪৭)।
জানা গেছে, রংপুর, গাইবান্ধা, পাবনাসহ বিভিন্ন জেলা থেকে আসা দিনমজুররা প্রতিদিন ভোরে এরুলিয়া বাজারের এই হাটে কাজের সন্ধানে জড়ো হন। স্থানীয় গৃহস্থরা এখান থেকেই দৈনিক মজুরিতে তাঁদের সংগ্রহ করেন। গতকাল ভোরে ঢাকা থেকে নওগাঁ অভিমুখী একটি যাত্রীবাহী বাস দ্রুতগতিতে যাওয়ার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। এ সময় বাসটি দাঁড়িয়ে থাকা দিনমজুরদের চাপা দিয়ে উল্টো ঘুরে বগুড়ামুখী হয়ে পড়ে। এতে ঘটনাস্থলেই তিন শ্রমিক নিহত হন। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যান আরও তিনজন। এরপর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাজিমুল নামে আরেক শ্রমিকের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ২৫ জন। তাঁদের উদ্ধার করে শজিমেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
স্থানীয়রা জানান, বৃষ্টির মধ্যে বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে প্রথমে একটি খুঁটিতে ধাক্কা দেয়। চালক নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করলেও গাড়িটি শ্রমিকদের ওপর উঠে যায়। তারা বলেন, নিহত ও আহত ব্যক্তিরা অত্যন্ত দরিদ্র দিনমজুর। তাঁরা বিভিন্ন স্কুলের বারান্দায় রাত কাটিয়ে ভোরে এই হাটে এসেছিলেন। দুর্ঘটনার পর ক্ষুব্ধ স্থানীয় বাসিন্দারা মহাসড়ক অবরোধ করলে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ ঘটনাস্থলে গতিরোধক (স্পিডব্রেকার) নির্মাণের কাজ শুরু করলে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
এদিকে দুর্ঘটনার খবর পেয়ে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহতদের খোঁজখবর নিতে যান প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডাক্তার মনোয়ারুল কাদির বিটু। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, প্রধানমন্ত্রী এ দুর্ঘটনার খবরে অনেক উদ্বিগ্ন। আমি খবর পেয়েই দ্রুত এখানে ছুটে এসেছি। আহতদের মধ্যে অনেকের মাথায় ও পায়ে গুরুতর আঘাত রয়েছে। আইসিইউতে থাকা একজনের অবস্থা খুবই আশঙ্কাজনক।
তিনি জানান, যাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব, দেওয়া হয়েছে। ওষুধপত্র যা লাগে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষই দেখবে এবং রক্তের প্রয়োজন হলেও সেটার জোগান এখান থেকে দেওয়া হবে। প্রয়োজন অনুসারে রোগীদের ঢাকায় রেফার করা হবে। ইতোমধ্যে জেলা প্রশাসনের সঙ্গেও কথা হয়েছে, তারা একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবারকে ২৫ হাজার এবং আহতদের প্রত্যেককে ১৫ হাজার টাকা করে আর্থিক অনুদান দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
বগুড়া সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) ইব্রাহীম আলী বলেন, প্রাথমিকভাবে জানা গেছে একটি মোটরসাইকেল আরোহীকে বাঁচাতে গিয়ে বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খুঁটিতে ধাক্কা খায় এবং পরে শ্রমিকদের ওপর উঠে যায়। এতে ঘটনাস্থলে তিনজন এবং হাসপাতালে চারজন মারা যান। জনগণের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সওজ কর্তৃপক্ষ স্পিডব্রেকার নির্মাণের কাজ শুরু করায় স্থানীয়রা সড়ক ছেড়ে দেন। বর্তমানে যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। তিনি বলেন, দুর্ঘটনাকবলিত বাসটি পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম : চট্টগ্রাম নগরীর পতেঙ্গা থানার কাঠগড় জেলেপাড়া লিংক রোড এলাকায় মোটরসাইকেল ও ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে দুই যুবক নিহত হয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার রাতে এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত দুজন হলেন শাহিন (২২) ও ইমন (২২)। এ ঘটনায় আরও একজন গুরুতর আহত হয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের ২ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন বলে জানা গেছে। নিহত শাহিন পতেঙ্গা স্টিল মিল এলাকার আবু সিদ্দিকের ছেলে। নিহত ইমনের পরিচয় জানা যায়নি। চমেক হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ নুরুল আলম আশেক বলেন, নিহত দুজনের লাশ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়।
বাগেরহাট : বাগেরহাট-খুলনা মহাসড়কে ট্রাকের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে মোটরসাইকেল চালক শেখ শাহারিয়ার সৈকত (৩৮) নিহত হয়েছেন। গতকাল বিকালে বাগেরহাট সদর উপজেলার ষাটগম্বুজ ইউনিয়নের শ্রীঘাঠ ফুলবাড়িয়া ব্রিজ এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত শেখ শাহারিয়ার সৈকত বাগেরহাট সদর উপজেলার রঘুনাথপুর গ্রামের শহিদুল ইসলামের ছেলে। বাগেরহাট ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের সিনিয়র অফিসার শেখ মামুনুর রশিদ জানান, বিকালে সদর উপজেলার শ্রীঘাঠ ফুলবাড়িয়া ব্রিজ এলাকায় বাগেরহাট থেকে খুলনাগামী একটি মোটরসাইকেলের সঙ্গে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে মোটরসাইকেল চালক সৈকত সড়কে ছিটকে পড়ে মাথা, মুখ ও বুকে গুরুতর আঘাত পান। খবর পেয়ে বাগেরহাট ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাকে উদ্ধার করে বাগেরহাট জেলা হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
বাগেরহাট সদর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. সামসুল আরেফিন জানান, দুর্ঘটনার পর কিছু সময় বাগেরহাট-খুলনা মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকে। পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ট্রাক ও মোটরসাইকেলটি জব্দ করে। দুর্ঘটনার পর চালক ট্রাক রেখে পালিয়ে যায়। পলাতক ট্রাকচালককে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে অভিযান চলছে। এ ঘটনায় আইনগত প্রক্রিয়া চলমান।
ঝিনাইদহ : ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার বড়দাহ মাদ্রাসা এলাকায় দুই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে তুফান দাস (৩১) নামে এক ট্রাকচালক নিহত হয়েছেন। এ সময় আরও দুজন মারাত্মক আহত হন। বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। নিহত তুফান দাস সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার সোনাবাড়ি গ্রামের হরিপদ দাসের ছেলে। স্থানীয়রা জানান, রাত সাড়ে ১১টার দিকে কুষ্টিয়া থেকে ছেড়ে আসা বালুবাহী একটি ট্রাক ঝিনাইদহ-কুষ্টিয়া মহাসড়কের বড়দাহ মাদ্রাসা এলাকায় পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে ছেড়ে আসা দ্রুতগামী ধানবোঝাই একটি ট্রাকের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। সে সময় বালুবাহী ট্রাকের চালক তুফান দাস ট্রাকের কেবিনে আটকা পড়েন। এ ছাড়া বালুবাহী ট্রাকের হেলপার ও ধানবোঝাই ট্রাকের চালক মারাত্মক আহত হন।
খবর পেয়ে শৈলকুপা ফায়ার সার্ভিসের একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে আহত দুজনকে উদ্ধার করে শৈলকুপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। পরে প্রায় এক ঘণ্টার চেষ্টায় ট্রাকের কেবিন কেটে আটকে থাকা চালক তুফান দাসকে উদ্ধার করা হলেও ততক্ষণে তিনি মারা যান। শৈলকুপা ফায়ার সার্ভিসের ভারপ্রাপ্ত স্টেশন অফিসার মহিউদ্দিন জানান, রাত ১১টা ৩৫ মিনিটে দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধারকাজ শুরু হয়। এরপর আহতদের হাসপাতালে পাঠানো হয়। আরাপপুর হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহানুর আলী বলেন, দুই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে একজন নিহত হয়েছেন। লাশ উদ্ধার করে ঝিনাইদহ সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। দুর্ঘটনাকবলিত ট্রাক দুটি সড়ক থেকে সরিয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক করা হয়।