Image description

নাটোরের বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়কে প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা, বাড়ছে প্রাণহানি। তবে এ সবই নিছক দুর্ঘটনা, নাকি কিছু দুর্ঘটনার আড়ালে লুকিয়ে আছে পরিকল্পিত হত্যাকান্ড? গাড়িচাপা দিয়ে কাউকে মারা হলে সেটি দুর্ঘটনা, নাকি হত্যাকান্ড? এমন প্রশ্ন তুলেছেন নিহত ব্যক্তিদের স্বজনরা। তাদের দাবি, পরিকল্পিত হত্যার নানান আলামত ও প্রাথমিক প্রমাণ থাকার পরও অনেক ঘটনায় মিলছে না সুষ্ঠু তদন্ত কিংবা বিচার।

সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার চাচা-ভাতিজা এবং নাটোরের বনপাড়ার টিকটকার তরুণী মেধার মৃত্যুতে উঠে এসেছে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও চাঞ্চল্যকর তথ্য। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৪ মার্চ সকাল আনুমানিক ৭টায় সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার হিমনগর গ্রাম থেকে মোটরসাইকেলে আদালতের উদ্দেশে রওনা হন চাচা-ভাতিজা রোকনুজ্জামান ওরফে রোকন ফারুকী ও নাসির উদ্দিন নান্টু। স্বজনদের অভিযোগ, বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়কের হরিণচড়ার নির্জন স্থানে পৌঁছানোর পর একটি সাদা হায়েস মাইক্রোবাস পরিকল্পিতভাবে তাঁদের মোটরসাইকেলে ধাক্কা দিয়ে দ্রুত চলে যায়। ঘটনাস্থলেই মারা যান রোকন ফারুকী।

গুরুতর আহত নাসির উদ্দিন পরদিন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এ ঘটনায় প্রতিবেশী, ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ তাড়াশ উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সদস্য মোনায়েম হোসেন জেমসসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে গুরুদাসপুর আমলি আদালতে হত্যা মামলা দায়ের করে নিহতের পরিবার। নিহত রোকনের মা রোকেয়া বেগম ও ভাই মামুনের অভিযোগ, জমিসংক্রান্ত বিরোধের জেরে পরিকল্পিতভাবে এ হত্যাকান্ড ঘটানো হয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা এবং মোবাইল কল ডিটেইলসে (সিডিআর), অভিযুক্তরা একাধিক মামলার চিহ্নিত আসামি হলেও এবং অভিযুক্তদের সংশ্লিষ্টতার তথ্য মিললেও প্রভাবশালীদের কারণে এ ব্যাপারে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। 

এমনকি তৎকালীন হাইওয়ে পুলিশের এসআই আলমগীর হোসেন তাঁদের অভিযোগের ব্যাপারে গুরুত্ব না দিয়ে সাদা কাগজে স্বাক্ষর নিয়েছেন বলেও পরিবারের অভিযোগ রয়েছে। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় বাসিন্দা সাগর হোসেনের ভাষ্য, এটি তাঁর কাছে স্বাভাবিক সড়ক দুর্ঘটনা বলে মনে হয়নি। তিনি দেখেছেন, প্রায় ফাঁকা সড়কে একটি সাদা হায়েস মাইক্রোবাস মোটরসাইকেলটিকে অনুসরণ করছিল। হরিণচড়ায় পৌঁছেই গাড়িটি আচমকা গতি বাড়িয়ে মোটরসাইকেলটিকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে দ্রুত চলে যায়। দীর্ঘদিন গাড়ি চালানোর অভিজ্ঞতা থেকে তাঁর ধারণা, ঘটনাটি পরিকল্পিত।

এ ঘটনায় পরিকল্পিত হত্যাকান্ডের অভিযোগ এনে ২০২৫ সালের ১৫ এপ্রিল গুরুদাসপুর আমলি আদালতে হত্যা মামলা করেন রোকনের মা রোকেয়া বেগম। আদালতের নির্দেশে প্রাথমিক তদন্ত শেষে হত্যার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট মত না থাকায় তিনি পুনরায় আদালতের শরণাপন্ন হন। বর্তমানে মামলাটি তদন্ত করছে সিআইডি নাটোর। অভিযুক্তরা পলাতক থাকায় একাধিকবার বাড়ি ও মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করেও তাঁদের পাওয়া যায়নি। তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, অভিযুক্তদের সাতটি মোবাইল নম্বরের কল ডিটেইলস (সিডিআর) বিশ্লেষণ করে আরও চারটি নম্বর শনাক্ত করা হয়। এসব নম্বরের অবস্থান ঘটনার দিন ভোর থেকে সকাল পর্যন্ত ঘটনাস্থল ও আশপাশে পাওয়া যায়। একই সময়ে অভিযুক্তদের মধ্যে অন্তত ১২০ বার ফোনালাপ ও একাধিক এসএমএস আদানপ্রদানের তথ্যও উঠে এসেছে।

এ ছাড়া কয়েকটি মোবাইল নম্বর দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর ঘটনার আগের দিন সচল হয়। কিছু নম্বরের লোকেশন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ঘটনার তিন-চার দিন আগে থেকেই সেগুলোর অবস্থান ঘটনাস্থলের আশপাশে ছিল। তদন্তসংশ্লিষ্টদের ধারণা, নির্জন স্থান নির্বাচন ও চলাচলের রুট আগেই পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এ মামলা পরিচালনাকারী নাটোর কোর্টের আইনজীবী গোলাম সারওয়ার হোসেন জানান, সব দুর্ঘটনাই দুর্ঘটনা নয়। এখন অপরাধীরা কৌশল পরিবর্তন করে বিভিন্নভাবে অপরাধ সংঘটিত করছে। সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল মহাসড়কের হরিণচড়ায় সংঘটিত দুর্ঘটনা একটি পরিকল্পিত হত্যাকান্ড বলে দাবি তাঁর।

এরই মধ্যে যে তদন্ত প্রতিবেদন হয়েছে তা দেখে এটা স্পষ্ট বোঝা যায়। কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তা অসম্পূর্ণ একটি প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করেছেন। সঠিক তদন্ত হলে সত্য বেরিয়ে আসবে এবং নিহতের পরিবার বিচার পাবে। এদিকে ২৪ জুলাই ভোর ৪টা ২০ মিনিটে বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়কের বড়াইগ্রামের সুতারপাড়ায় টিকটকার তরুণী মেধার ছিন্নভিন্ন লাশ উদ্ধার করে বনপাড়া হাইওয়ে থানা পুলিশ। ঘটনাস্থল থেকে আহত অবস্থায় দুই যুবক মেহেদী হাসান ও পলক আহমেদ এবং একটি নম্বরবিহীন মোটরসাইকেলও উদ্ধার করা হয়। 

ফায়ার সার্ভিস লাশ পুলিশে হস্তান্তর করে আহতদের নাটোর সদর হাসপাতালে পাঠায়। টিকটক ও সমাজমাধ্যমে আফরিন জাহান নামে পরিচিত মেধা বনপাড়ার কালিকাপুরে ভাড়া বাসায় থাকতেন। এ ঘটনায় মেধার বোন সুমি খাতুনকে বাদী করে সড়ক পরিবহন আইনে মামলা করেছে হাইওয়ে পুলিশ। তবে মেধার বাবা মিল্টন হোসেন ও বোন সুমির দাবি, এটি সড়ক দুর্ঘটনা নয়, পরিকল্পিত হত্যাকান্ড। সঠিক তদন্ত হলে রহস্য উন্মোচন হবে। দ্রুত অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিও জানান তাঁরা। 

ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা গেছে, নির্জন ওই স্থানে উদ্ধার হওয়া মোটরসাইকেলটির নম্বরপ্লেট নেই, এমনকি গাড়িটিতেও তেমন ক্ষয়ক্ষতি নেই। অথচ মেধার মাথা, হাত-পাসহ লাশ ভয়াবহভাবে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে, যা স্বাভাবিক দুর্ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। হাইওয়ে পুলিশের ওসি মনিরুজ্জামান ও তদন্ত কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন জানান, ঘটনাস্থলে গিয়ে তাঁরা সড়কে মেধার লাশ এবং পাশে হালকা আহত অবস্থায় মেহেদী ও পলককে পান। তখন তাঁরা পুলিশকে জানান, অজ্ঞাত একটি ট্রাক ধাক্কা দিয়ে পালিয়ে গেছে। 

তবে এখনো ট্রাকটির সন্ধান মেলেনি। ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার জাহিদুল ইসলামের দাবি, আহত দুই যুবককে ভোর সোয়া ৫টার দিকে নাটোর সদর হাসপাতালে ভর্তি করে তাঁরা ফিরে আসেন। তবে নাটোর সদর হাসপাতালে গিয়ে মেলে চাঞ্চল্যকর তথ্য। হাসপাতালের দায়িত্বরত নার্সদের দাবি, ফায়ার সার্ভিস আহত দুই যুবককে রেখে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরই তাঁরা চিকিৎসক-নার্সদের অগোচরে হাসপাতাল থেকে পালিয়ে যান।

পরে তাঁদের গ্রামের বাড়ি গিয়ে জানা গেছে, সদর হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে একটি বেসরকারি ক্লিনিকে প্রাথমিক চিকিৎসা নেন তাঁরা। ক্লিনিক ম্যানেজার আসকান আলীর দাবি, এক্স-রেতে গুরুতর কোনো আঘাত বা হাড় ভাঙার প্রমাণ মেলেনি। হাঁটু ছিলে যাওয়া ও শরীরে সামান্য আঘাত নিয়েই তাঁরা চিকিৎসা শেষে চলে যান।

এরপর মেহেদী ও পলকের খোঁজে তাঁদের বাড়ি গেলেও পরিবারের কেউ কথা বলতে রাজি হননি। পলকের বাড়িতে প্রথমে পরিবারের সদস্যরা তাঁদের পরিচয়ই অস্বীকার করেন। অন্যদিকে মেহেদীর বাবা আবদুুল মান্নান ফোনে বলেন, দীর্ঘদিন ছেলের সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্ক নেই, তাই এ বিষয়ে তিনি কিছু বলতে পারবেন না। পলকের বাবা আবদুল জলিলকে মোবাইল ফোনে কল দিলে তিনিও স্বীকার করেন তাঁর ছেলে সামান্য আঘাত পেয়েছে কিন্তু কোথায় আছেন জানেন না।

অনুসন্ধানের একপর্যায়ে মেহেদী ও পলকের মামাতো ভাই আনিসুর রহমান এই প্রতিবেদকের কাছে বিকাশ নম্বর চেয়ে টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দেন। কারণ জানতে চাইলে বলেন, ‘মিষ্টি খাওয়ার জন্য’ টাকা দিতে চান। রাজশাহী রেঞ্জের উপমহাপুলিশ পরিদর্শক (ডিআইজি) মো. আশিক সাঈদ জানান, তদন্তে যদি দুর্ঘটনার আড়ালে হত্যাকান্ডের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তর করা হবে। একই সঙ্গে তদন্তে কোনো কর্মকর্তার গাফিলতি প্রমাণিত হলে তাঁর বিরুদ্ধেও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।