Image description
জুলাই গণ অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধন আজ

বাড়িটির পাহারায় এখন আনসার সদস্যরা। চারদিকে লোহার শিকের বেড়া। এর তিন ফুট পরেই মূল দেয়ালের ভাঙা অংশ। কিছুদিন এর নিয়ন্ত্রণে ছিল জাতীয় জাদুঘর কর্তৃপক্ষ। সেই গণভবন এখন জুলাই গণ অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে জাদুঘরটির আজ উদ্বোধন করবেন। গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, ৬ আগস্ট থেকে জুলাই স্মৃতি জাদুঘর সবার জন্য খুলে দেওয়া হবে। তিনি জানান, প্রথম দিন শুধু জুলাই গণ অভ্যুত্থানে শহীদ ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের জন্য বরাদ্দ থাকবে।

জাতীয় সংসদ ভবনের উত্তর-পশ্চিমে ২ নম্বর গেট দিয়ে ঢুকে হাতের ডানেই লাল দোতলা বাড়িটিতেই থাকতেন ভারতে পালিয়ে যাওয়া ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা। কড়া পাহারায় সপরিবারে থাকতেন ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগ পর্যন্ত। জুলাই-আগস্ট বিপ্লবে সেখানে ঢুকে পড়েন লাখো মানুষ। ক্রোধে, ক্ষোভে ব্যাপক ভাঙচুর চলে। বাড়িটিতে মানুষের ক্ষোভ আর ঘৃণার সাক্ষী হিসেবে নানা উপকরণ সংরক্ষণ করা হয়েছে।

পূর্বে পুকুর এবং উত্তরে ফাঁকা স্থান ছেড়ে কিছুটা দূরে জিআই তারের জালে ঘেরা টেনিস কোট। পাশেই পানির পাম্প ও গরুর খামার। এ ছাড়া কর্মচারীদের থাকার কয়েকটি ঘর। আর পশ্চিমে মিরপুর সড়ক পর্যন্ত প্রায় বিস্তীর্ণ চাষের জমিটি এখন সাজানো ঘাষের মাঠ।

আগে যেখানে ধান, গম, ভুট্টা ও সবজিসহ নানা দেশীয় ফলের চাষ ছিল। চারদিকে নানা গাছ-গাছালিতে ভরা। ১ নম্বর গেটের পাশের বিদ্যুতের সাবস্টেশন ও জেনারেটর মেশিন। ভিতরে গণ অভ্যুত্থানে বিধ্বস্ত গাড়িগুলোও সংরক্ষণ করা হয়েছে। অক্ষত রাখা হয়েছে বিভিন্ন জায়গায় ভাঙা সীমানা প্রাচীরটিও।

এখানে কথা হয় আনসার সদস্য নাজমুলের সঙ্গে। তিনি বলেন, স্টাফ ছাড়া কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। উদ্বোধনের পরই সবাইকে ভিতরে ঘুরে দেখতে পাবে।

মূল ভবনে রাখা আছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে নিহত গোলাম নাফিজের দেহ বহনকারী রিকশাটি। সেই রিকশাটি হৃদয় স্পর্শ করেছে সবারই। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই ছবি দেখে চোখের কোণে জল আসেনি এমন মানুষ হয়তো কমই আছে।

সেখানে কর্মরতদের সঙ্গে কথা বলে যা জানা যায়, শেখ হাসিনার সরকারি এ আবাসে দুই ডজনের বেশি কক্ষ আছে। নিচ তলা ছয়টি বেড রুম। দুটি বিশাল হল রুম। সেখানে সংবাদ সম্মেলন ও বৈঠক করতেন। তিনটি ড্রয়িং ও লিভিং রুম। এর সিলিংয়ে ভাঙা ঝাড়বাতির অংশটিকেও স্মৃতি হিসেবে রাখা হয়েছে। দোতলায় সাতটি বেড রুম। ভবনের মূল নকশার বাইরে গিয়ে কাচের ঘেরা লিফট। দোতলার বেড রুমগুলোকে কলাপসিবল গেট দিয়ে সুরক্ষিত রাখা ছিল। মাঝে রাজকীয় সিঁড়ি। পশ্চিম এবং পূর্বেও সিঁড়ি। প্রতিটি অংশ স্মৃতি হিসেবে রাখতে মোটা প্লাস্টিকের চাদরে ঢেকে রাখা হয়েছে। পূর্ব দিকের দরজা দিয়ে মূল ভবনের ভিতরে ঢুকতেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে অসংখ্য কাগজ, কাচ, সিরামিক, কাঠের টুকরা এবং ভাঙা আসবাবপত্র ইত্যাদি যা যেভাবে ছিল তা সেভাবেই প্লাস্টিকে মুড়িয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। প্রতিটি দেয়ালে স্বৈরাচার ও আওয়ামী লীগ বিরোধী নানা স্লোগানে লেখা রয়েছে। শেখ হাসিনার বেড রুমের পাশেই তাঁর ব্যক্তিগত রান্নাঘর।

ভবনটির দক্ষিণ লাইনে মাঝে একটি কক্ষ শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় থাকতেন। মেঝেতে এক কোণে মা, খালা এবং বোনের সঙ্গে থাকা জয়ের একটি ছবিও সংরক্ষণ করা আছে। পাশের আরেকটি কক্ষের রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিকের পোষা প্রাণীর ভাঙা খাঁচা।

মূল ভবনের মূল প্রবেশপথ দিয়ে বের হওয়ার পথে আরও একটি গ্রাফিতি। সাদা দেয়ালে লাল কালিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে শেখ হাসিনাকে ইঙ্গিত করে একটি বার্তা লেখা। আরেক পাশে লেখা ‘হাসু আপা পালাইছে’। পশ্চিমের প্রবেশ পথে ছাত্রলীগকে ইঙ্গিত করে একটি বার্তা লেখা।

শেখ হাসিনার দেশ ছাড়ার পরই গণভবনকে জাদুঘরে রূপান্তরের কাজ শুরু হয়।