জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার ও আহত ব্যক্তিদের সহায়তার জন্য গঠিত জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন এখন নিজেই টিকে থাকার সংকটে। টানা ৫ মাস ধরে বেতন-ভাতা পাননি ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। পাননি ঈদ বোনাসও। রাজধানীর শাহবাগে ফাউন্ডেশনের কার্যালয়ের ১২ মাসের অফিস ভাড়াও পরিশোধ করতে পারেননি তারা। অর্থ বরাদ্দ না থাকায় দৈনন্দিন কার্যক্রম চালানোও কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন ফাউন্ডেশন সম্পৃক্তরা। তারা বলছেন, আর্থিক বরাদ্দের প্রত্যাশায় ফাউন্ডেশন থেকে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন করা হয়েছে। বরাদ্দের আশা দেখিয়ে তাদের এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু গত ৫ মাসে আশানুরূপ কিছু পাননি তারা।
এদিকে জুলাই আন্দোলনের দুই বছর পার না হতেই ফাউন্ডেশনটির এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। তাদের ভাষ্য, জুলাইয়ের রক্তের ওপর প্রতিষ্ঠিত এই ফাউন্ডেশনটি এত দ্রুত অর্থ সংকটে পড়বে এটা অপ্রত্যাশিত এবং অনাকাঙ্ক্ষিত। তারা এমন পরিস্থিতির দ্রুত উত্তরণ চান। এদিকে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি থেকে জানানো হয়, এ নিয়ে সরকারের বিভিন্ন মহলে আলোচনা হয়েছে। শিগগিরই এ বিষয়ে একটি সমাধান আসবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, অর্থ বরাদ্দের জন্য সমাজসেবা অধিদপ্তর, মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন জানানো হয়েছে। এক দপ্তর অন্য দপ্তরে যাওয়ার জন্য বলেছে। সর্বশেষ অর্থ মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছে। সেখান থেকে এখন পর্যন্ত আশানুরূপ কিছু আসেনি বলে জানানো হয়। জুলাই ফাউন্ডেশনের একজন কর্মকর্তা বলেন, কী এক কারণে সরকার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছে না। কেবল আশা দেখিয়ে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ঘুরানো হচ্ছে। এটা দুঃখজনক।
ফাউন্ডেশন থেকে জানানো হয়, বেতন-ভাতা, প্রশাসনিক ব্যয়, অফিস ভাড়া, যানবাহন, জ্বালানি, ভ্রমণ ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয়ের জন্য ২০২৪-২৫ অর্থবছরে স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে তিন কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। সেই অর্থ দিয়েই এতদিন কার্যক্রম পরিচালিত হয়। বর্তমানে ওই বরাদ্দ শেষ হয়ে যাওয়ায় বেতন-ভাতা ও অন্যান্য ব্যয়ভার বন্ধ আছে। এছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল থেকে দেওয়া ১০০ কোটি টাকা এবং পরে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অনুদান মিলিয়ে যে অর্থ এসেছে, তা কেবল এমআইএসভুক্ত শহীদ পরিবার ও আহত ব্যক্তিদের সহায়তার জন্য নির্ধারিত। ওই অর্থ থেকে অফিস পরিচালনা বা কর্মীদের বেতন-ভাতা পরিশোধের সুযোগ নেই। ফলে ফাউন্ডেশনের কর্মীদের অনেকে অবৈতনিক ছুটি কাটাচ্ছেন। কেউ কেউ নিয়মিত অফিসে আসছেন না। কেউ আবার ফাউন্ডেশনের কাজ ছেড়ে দিয়েছেন। একাধিক কর্মী বেতন না পেয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন।
জানতে চাইলে ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) লে. কর্নেল (অব.) কামাল আকবর যুগান্তরকে বলেন, ‘জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে এবং বিষয়টি বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের পরিচালনা ব্যয়ের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ে চাহিদাপত্র দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি সংসদেও আলোচনা হয়েছে। স্পিকার মহোদয়ের মাধ্যমে বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের কাছে গেছে। এখন অর্থ মন্ত্রণালয়ে এটি নিয়ে কাজ চলছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, দ্রুত বরাদ্দ পাওয়া গেলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বকেয়া বেতন-ভাতার সমস্যার সমাধান হবে।
বিষয়টি নিয়ে জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম গত ২৮ জুন সংসদে বলেছেন, জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন অর্থের অভাবে চলতে পারছে না। তিনি সরকারের কাছে ফাউন্ডেশনের জন্য অর্থ বরাদ্দের দাবি জানান।
বিভিন্ন মহলে ক্ষোভ : গত রোববার জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশনের অনুষ্ঠানে এসে অতিথিরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সংগীতশিল্পী আসিফ আকবর কাউকে দায়ী না করে বলেন, এই ফাউন্ডেশন আছে এবং থাকবে। তিনি সর্বোচ্চ আন্তরিকতা দিয়ে এই ফাউন্ডেশনের পাশে থাকবেন বলে অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
সংসদ-সদস্য (সংরক্ষিত) নুসরাত তাবাসসুম বলেন, এ নিয়ে ইতোমধ্যে সংসদে আলোচনা হয়েছে। প্রয়োজনে আমরা আবারও কথা বলব। এই ফাউন্ডেশন জুলাইয়ের চেতনা ধারণ করে এগিয়ে যাবে। একই অনুষ্ঠানে ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার ফুয়াদ। তিনি ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, রাষ্ট্রের টাকা কতদিকে চলে যায়। টাকার বিনিময়ে কত কিছু হয়ে যায়। কিন্তু ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন হয় না। এর চেয়ে লজ্জার আর কিছু হতে পারে না।
তবে আশার কথা বলেন বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল। তিনি বলেন, জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাঁচ মাসের বেতন-ভাতা বকেয়া থাকার বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে আলোচনা হয়েছে। আশা করি দ্রুত সমাধান হয়ে যাবে। তিনি বলেন, প্রশাসনের কিছু স্তরে আগের সরকারের প্রভাব এখনো রয়ে গেছে। জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশনের আর্থিক সংকটের বিষয়টি হয়তো যথাযথভাবে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পৌঁছায়নি। বর্তমান সরকার দেশীয় ও আন্তর্জাতিক নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে দায়িত্ব পালন করছে। দীর্ঘ সময়ের দুর্নীতি, লুটপাট ও আইনশৃঙ্খলার অবনতির প্রভাব কাটিয়ে উঠতে সময় লাগছে। এ অবস্থায় প্রশাসনিক কিছু ত্রুটি বা বিলম্ব হতে পারে।
জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বকেয়া থাকাকে ‘দুঃখজনক ও অনাকাঙ্ক্ষিত’ বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক। তিনি বলেন, শহীদ ও আহতদের কল্যাণে গঠিত একটি প্রতিষ্ঠানে এমন পরিস্থিতি উদ্বেগের সৃষ্টি করে। এটি শহীদদের প্রতি রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার সঙ্গে সম্পর্কিত।
২০২৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর যাত্রা শুরু করে এই ফাউন্ডেশন। তখন ফাউন্ডেশনের সভাপতি ছিলেন তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস।