Image description
রক্তে লেখা যে বিজয়

আজ ৫ আগস্ট। জুলাই বিপ্লবীদের ভাষায় ‘৩৬ জুলাই’। দুই বছর আগে এই দিনে দেড় দশকের স্বৈরশাসনের অবসান ঘটিয়েছিল ছাত্র-জনতার রক্তস্নাত অভ্যুত্থান। শিক্ষার্থী-শিক্ষক, সাংবাদিকসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত সেই বিজয় আজ স্মরণ করছে গোটা দেশ। রাষ্ট্রীয় ছুটি, পুষ্পস্তবক অর্পণ, স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধন আর শহীদপরিবারকে সংবর্ধনায় পালিত হচ্ছে দিবসটি। অনেকে অনেক বিশেষণে এই বিপ্লবকে অভিহিত করেন। কেউ বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান, কেউ বলেন চব্বিশের ‘বর্ষা বিপ্লব’, আবার কেউ কেউ বলেন ‘দুনিয়া কাঁপানো জুলাই বিপ্লব’। চিত্র-চরিত্র, সময় ও বাস্তবতা ভিন্ন হলেও জুলাই আন্দোলন রাশিয়ার ‘অক্টোবর বিপ্লবের’ কথাই মনে করিয়ে দেয়। তবে স্মরণের সঙ্গে সামনে আসছে একটি প্রশ্নও-জুলাইয়ের স্বপ্নের বাংলাদেশ কি পাচ্ছে মানুষ?

বিশিষ্টজনরা মনে করেন, মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর বাংলাদেশে এমন আন্দোলন এবং আন্দোলনের পরিণতি বিরল। মুক্তির দৃপ্ত শপথে শত শত প্রাণের রক্তে ঢেলে দেওয়ার ঘটনা শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বে খুব বেশি নেই। তাদের ভাষ্য, আন্দোলনকারীদের এই দৃঢ়তা শুধু প্রশাসনকে রুখে দেয়নি; দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ তথা ১৪ দলীয় সরকারকে উৎখাত করে একেবারে ‘নির্বাসনে’ পাঠিয়ে দিয়েছে; যা বিশ্ব মিডিয়া, জাতিসংঘ তথা বিশ্ববিবেককে বিস্মিত করেছে। দিবসটি উপলক্ষ্যে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৃথক বাণী দিয়েছেন।

ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বাণীতে মহান জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের আত্মত্যাগ ও প্রত্যাশার বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক, জবাবদিহিমূলক ও ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আসুন, মহান জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে একটি গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক, বৈষম্যহীন ও সুখী-সমৃদ্ধ নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলি। একই সঙ্গে মহান স্বাধীনতাযুদ্ধ ও গণ-অভ্যুত্থানে আত্মোৎসর্গকারী শহীদদের স্বপ্ন, আদর্শ ও আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে একযোগে কাজ করি।

বাণীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান ছিল দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি চলা ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান এবং জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার এক ঐতিহাসিক বিজয়। তিনি বলেন, এ বিজয় বীর ছাত্র-জনতার। এত ত্যাগের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা জাতীয় ঐক্য যে কোনো মূল্যে রক্ষা করতে হবে এবং বাংলাদেশে আর কখনো স্বৈরাচার, ফ্যাসিবাদ, চরমপন্থা কিংবা উগ্রবাদের উত্থান হতে দেওয়া যাবে না।

১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে আন্দোলন-সংগ্রামে অবদান রাখা সবাইকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে তিনি বলেন, প্রতিটি শহীদপরিবারের কাছে বাংলাদেশ ঋণী। এখন শহীদদের প্রতি আমাদের ঋণ পরিশোধের পালা। তিনি বলেন, ১৯৭১ সাল ছিল স্বাধীনতা অর্জনের যুদ্ধ, আর ২০২৪ সাল ছিল দেশ এবং জনগণের স্বাধীনতা রক্ষার যুদ্ধ। ১৯৭১ সালের শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের বাংলাদেশ কখনো ভোলেনি, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদেরও বাংলাদেশ কখনো ভুলবে না।

এদিকে ২০২৪ সালের এই বিপ্লবে কতজনের প্রিয়-প্রাণ চলে গেছে চিরতরে। কত মা-বাবা বুকের ধন হারিয়ে আজ পাগলপ্রায়। প্রশ্ন উঠেছে, যে অবুঝ শিশু কিংবা কিশোর-তরুণ সুন্দর বাংলাদেশের জন্য প্রাণ উৎসর্গ করেছে, তার প্রতিদান কি দিচ্ছে বাংলাদেশ।

এ বিষয়ে মঙ্গলবার এক অনুষ্ঠানে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, চারদিকে জুলাই যোদ্ধাদের ওপর হামলা হচ্ছে, যা এই চেতনাপরিপন্থি কাজ। এমন অন্যায় আল্লাহ সহ্য করবেন না। তিনি সবাইকে জুলাইয়ের চেতনা বাস্তবায়নের জন্য যার যার নৈতিক অবস্থান থেকে সাহসী ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন বলেন, সহস্র শহীদের আত্মত্যাগ ও কোটি জনতার লড়াইকে সার্থক করতে দেশকে সাম্প্রদায়িকতা, সাম্রাজ্যবাদের হিংস্র থাবা, শোষণ ও বৈষম্যমুক্ত করতে হবে। একটি গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত জুলাই গণ-আন্দোলন অসমাপ্ত। তাই দেশপ্রেমিক সাধারণ মানুষের সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে।

এদিকে দিবসটি উপলক্ষ্যে আজ সরকারি ছুটির পাশাপাশি জাতীয় নানা কর্মসূচিও রয়েছে। বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকেও নানা কর্মসূচি পালিত হবে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবসের কর্মসূচি : আজ দেশের ৬৪ জেলায় জুলাই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হবে। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় জানানো হয়, সকাল ৯টায় জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বেলা ১১টায় বাংলাদেশ চীন-মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে শহীদপরিবার এবং জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা ও দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে আলোচনা অনুষ্ঠান হবে। এতে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। দেশের সব জেলায়ও শহীদপরিবার এবং জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা ও দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে আলোচনা সভার আয়োজন করা হবে।

ঢাকাসহ সব সিটি করপোরেশনের মিনিপোলগুলোয় জুলাই আন্দোলনের ওপর বস্তুনিষ্ঠ ও নৈর্ব্যত্তিক দুর্লভ আলোকচিত্র ও প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনের ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়া দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেতারসহ বিভিন্ন বেসরকারি সম্প্রচারমাধ্যমে গণ-অভ্যুত্থান সম্পর্কিত বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার করা হবে। দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আলোচনা সভা এবং রচনা, আবৃত্তি ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন থাকবে। বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোয় থাকবে নানা আয়োজন। এছাড়া ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোয় একই দিনে সুবিধাজনক সময়ে বিশেষ মোনাজাত/প্রার্থনা হবে। ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন শহরের প্রধান প্রধান সড়ক ও সড়কদ্বীপ জাতীয় পতাকাসহ বিভিন্ন ব্যানার, ফেস্টুন ও রঙিন নিশানে সজ্জিত করার নির্দেশনা রয়েছে। দিবসটি উপলক্ষ্যে স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করার কথা রয়েছে।

এদিন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার স্বায়ত্তশাসিত জাদুঘরগুলো সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বিনা টিকিটে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত রাখার নির্দেশনা আছে। দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি বিনোদনমূলক স্থান শিশুদের জন্য সকাল-সন্ধ্যা উন্মুক্ত রাখা এবং বিনা টিকিটে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হবে বলেও জানানো হয়েছে।

দিবসটি উপলক্ষ্যে দেশের সব সরকারি হাসপাতাল, কারাগার, সরকারি শিশু পরিবার, শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্র, প্রতিবন্ধী কল্যাণ কেন্দ্র, ডে-কেয়ার ও শিশু বিকাশ কেন্দ্র এবং ভবঘুরে প্রতিষ্ঠানগুলোয় থাকবে প্রীতিভোজের আয়োজন।

এনসিপির কনসার্ট : রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে আজ অনুষ্ঠিত হবে ‘বর্ষা বিপ্লবের গান’ শীর্ষক কনসার্ট। বিকাল সাড়ে ৩টা থেকে এ আয়োজনের উদ্যোগ নিয়েছে মুনসুন কালচারাল অ্যালায়েন্স। আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কনসার্টে সংগীত পরিবেশন করবেন ব্যান্ড পারসা, কুঁড়েঘর, আর্বোভাইরাস, এভয়েড রাফা, শিরোনামহীন, আর্ক (হাসান) ও আর্টসেল। এছাড়া একক সংগীত পরিবেশন করবেন সেজান ও আসিফ আকবর। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। বিশেষ অতিথি থাকবেন হুইপ নূর-ই-আলম এবং বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মো. নাহিদ ইসলাম।

জামায়াতের কর্মসূচি : বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সকালে রাজধানীর পল্টনে জুলাই অভ্যুত্থান উপলক্ষ্যে সমাবেশ করবে। এছাড়াও কেন্দ্রীয় আয়োজনের সঙ্গে সংগতি রেখে সারা দেশে সমাবেশ ও মিছিল অনুষ্ঠিত হবে। দলটির মহিলা বিভাগ, ছাত্র সংগঠন ও জুলাই যোদ্ধাদের বিভিন্ন ফোরামের উদ্যোগেও বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হবে বলে জানানো হয়।

যুক্তফ্রন্টের আলোচনা সভা : বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি নেতৃত্বাধীন গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের উদ্যোগে ৫ আগস্ট বিকাল ৪টায় তোপখানা সড়কের শিশু কল্যাণ পরিষদ মিলনায়তনে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। এ উপলক্ষ্যে ৭ আগস্ট বিকাল ৫টায় মুক্তি ভবনের মৈত্রী মিলনায়তনে (৭ম তলা) বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) উদ্যোগে আলোচনা সভা হবে।