জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে দেশব্যাপী মানবতাবিরোধী অপরাধের দুই বছরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এখন পর্যন্ত ছয়টি মামলার রায় হয়েছে। এসব মামলার রায়ে ৬১ আসামিকে সাজা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৪০ জনই পলাতক। ঘোষিত ছয় মামলার মধ্যে এক মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৫ জনের মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এই ১৫ আসামির মধ্যে শেখ হাসিনাসহ ১১ জনই পলাতক, কারাগারে বন্দি আছেন ৪ জন। দুই বছরে মাত্র ছয়টি মামলার রায় হওয়া এবং তা উচ্চ আদালতে বাস্তবায়ন না হওয়ায় জুলাই শহীদ পরিবারসহ সংশ্লিষ্টরা অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তারা জুলাই হত্যাকাণ্ডের সব বিচারাধীন মামলার রায় দ্রুত বাস্তবায়ন চান। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারের মূল দাবি, খুনিদের দৃশ্যমান বিচার ও দ্রুত রায় বাস্তবায়ন।
স্বজনরা কোনো আর্থিক সাহায্য বা পুনর্বাসনের চেয়ে আন্দোলনকারীদের হত্যার সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও ফাঁসি কার্যকর দেখতে চান। বিচারহীনতা ও দীর্ঘসূত্রতার কারণে শহীদ পরিবারগুলো দীর্ঘদিন ধরে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে আসছে। এ বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, আগামী এক বছরের মধ্যে জুলাইসংক্রান্ত সব মামলার বিচার শেষ হবে বলে আশাবাদী। শেখ হাসিনাসহ দণ্ডিত পলাতক আসামিরা ফিরলে আইন অনুযায়ী রায় (মৃত্যুদণ্ড) কার্যকর হবে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ ফারহান ফাইয়াজের বাবা শহীদুল ইসলাম ভূঁইয়া গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আজ যারা ক্ষমতায় আছেন, তারা জুলাইয়ের কারণেই ক্ষমতায়। তাই অন্তত জুলাই গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করুন।’ তিনি বলেন, আন্দোলনে আহত অনেকেই স্থায়ী পঙ্গুত্ব ও অন্ধত্ব নিয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন।
শহীদ ইমাম হাসান তাইমের ভাই রবিউল আউয়াল ভুঁইয়া বলেন. আমাদের এতগুলো ভাই জীবন দিয়েছে। এর বিনিময় কি জুলাইয়ের সঙ্গে প্রতারণা? তিনি প্রশ্ন তোলেন পলাতক আসামিদের কেন এখনো ফিরিয়ে আনা হচ্ছে না।
শহীদ গোলাম নাফিজের বাবা গোলাম রহমান বলেন, আমরা সরকারের সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে আছি। কবে জুলাই গণহত্যায় দণ্ডিতদের সাজা কার্যকর হবে তা দেখতে চাই। এর জন্য কত বছর অপেক্ষা করতে হবে জানি না।
এদিকে ট্রাইব্যুনাল সূত্রে জানা যায়, বিচারাধীন ২৫টি মামলার কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এর মধ্যে তিনটি মামলার বিচার শেষ পর্যায়ে রয়েছে। প্রসিকিউশনের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চারশর বেশি অভিযোগ দায়ের হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে পালিয়ে ভারতে অবস্থান করেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করা হয়। ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনা এবং তার সহযোগীদের বিচারের উদ্যোগ নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালে গণ-অভ্যুত্থানের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে প্রথম মামলাটি (মিস কেস বা বিবিধ মামলা) হয় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে। যে মামলায় গত বছরের ১৭ নভেম্বর শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। বিচার কার্যক্রমকে গতিশীল করতে গত বছরের ৮ মে আরেকটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। এর মধ্যে প্রথম রায় দেওয়া হয়েছিল গত বছরের ১৭ নভেম্বর। সর্বশেষ রায় হয়েছে গত ৩০ জুন।
ট্রাইব্যুনালে বিচার কার্যক্রমে প্রসিকিউশন আন্তরিকভাবে কাজ করছে বলে মনে করেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। তিনি যুগান্তরকে বলেন, ভারতে পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত। আমরা মনে করি আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে নিরপেক্ষভাবে বিচার সম্পন্ন হয়েছে। আগামী এক বছরের মধ্যে জুলাইসংক্রান্ত সব মামলার বিচার কার্যক্রম শেষ করা যাবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশে ফেরামাত্রই শেখ হাসিনাকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হবে।
ট্রাইব্যুনালে বিচার কার্যক্রম নিয়ে সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে প্রথমে চ্যালেঞ্জ ছিল, তারপরও একটা ধাপ আমরা অতিক্রম করেছি। শেখ হাসিনার বিচার করা সম্ভব হয়েছে, বাকি মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার চলছে। যেসব প্রমাণ আছে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আরও শাস্তি হবে। তিনি বলেন, এই বিচার বাংলাদেশের ইতিহাসে একটা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বিচার নিশ্চিত করার মাধ্যমে ভবিষ্যতে বাংলাদেশে আর কোনো শাসকগোষ্ঠী কখনো যেন এ ধরনের নিপীড়ক, গণহত্যাকারী শাসক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হতে সাহস না পান। একটা শাসককে বিতাড়িত করাই স্বপ্ন ছিল না, পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থাকে বদলে দেওয়া এবং সংস্কার করা জরুরি।
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ৬ মামলা : শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের মামলা ছাড়াও ট্রাইব্যুনালে এক মামলার রায় হলেও আরও পাঁচটি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ শাসনামলের সাড়ে ১৫ বছরে গুম-খুনের ঘটনায় দুটি মামলায় তাকে আসামি করা হয়েছে। রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে হত্যাকাণ্ডের মামলায় প্রধান আসামি তিনি। গাজীপুরে জঙ্গি নাটক সাজিয়ে ৭ জনকে এবং কল্যাণপুরে জাহাজবাড়িতে ৯ তরুণকে হত্যার দুটি মামলা রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে ১১ জনই পলাতক : জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ছয়টি মামলার রায়ে ৬১ আসামিকে সাজা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৫ জনকে। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে ১১ জনই পলাতক, কারাগারে বন্দি আছেন ৪ জন। এছাড়া যাবজ্জীবনসহ বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে ৪৬ আসামিকে। এর মধ্যে ঢাকা রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি সৈয়দ নুরুল ইসলামসহ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে ১১ জনকে। ছয়টি মামলার রায় বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, দণ্ডপ্রাপ্ত ৬১ আসামির মধ্যে ৪০ জনই পলাতক, কারাগারে আছেন ২১ জন।
শেখ হাসিনার নির্দেশে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত : বিভিন্ন তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরাসরি শেখ হাসিনার নির্দেশে জুলাই আন্দোলনে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছিল। শেখ হাসিনার এ রকম অনেক টেলিফোন কনভারসেশন জব্দ করেছে তদন্ত সংস্থা। তিনি (শেখ হাসিনা) রাষ্ট্রীয় সব বাহিনীকে হেলিকপ্টার, ড্রোন, এপিসিসহ মারণাস্ত্র ব্যবহার করে নিরস্ত্র, নিরীহ আন্দোলনকারী সিভিলিয়ান পপুলেশন, তাদের সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন বা নির্মূল করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
এক্ষেত্রে হত্যার নির্দেশ, গুলি করে আহত করার নির্দেশ এবং সহযোগিতা করার অভিযোগ আনা হয়েছে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে। জুলাইয়ের আন্দোলন দমাতে প্রায় দেড় হাজার লোককে হত্যা করা হয়েছে। ২৫ হাজারের বেশি মানুষকে গুলি করে আহত করা হয়েছে। নারীদের ওপর সহিংসতা, ‘টার্গেট’ করে শিশুদের হত্যা করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের পর লাশ ও জীবিত মানুষকে একত্রিত করে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
আহতদের হাসপাতালে নিতে, চিকিৎসা দিতে, এমনকি পোস্টমর্টেমেও বাধা দেওয়া হয়েছে। এসব বিষয় তদন্ত প্রতিবেদনে এসেছে। আন্দোলনকারীদের ওপর দায় চাপানোর জন্য বিভিন্ন সরকারি স্থাপনায় নিজেদের লোক দিয়ে আগুন দেওয়া হয়। এসবের দায় চাপানোর জন্য নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছিল, তার টেলিফোনিক নির্দেশ তদন্ত সংস্থার হস্তগত হয়েছে।