জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিজয়ের দিন ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ঢাকার আশুলিয়ায় পুলিশ ভ্যানে ছয়টি লাশের সঙ্গে একজনকে জীবিত পোড়ানো হয়। জ্যান্ত দেখেও তার চিকিৎসা না করে জ্বলন্ত আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করে পুলিশ। গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে থাকা আন্দোলনকারীদের হাত ও পা ধরে ভ্যানে নিক্ষেপ করছিলেন দুজন পুলিশ সদস্য। সর্বশেষ লাশটি তুলে একটি ব্যানার দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। জীবিত দেহটি ছিল সাজ্জাদ হোসেন সজলের। এ সংক্রান্ত ভিডিওর কথা উল্লেখ করে মামলার তদন্ত প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।
এ মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা জানতে পারেন, ছয়জনের লাশ যখন পোড়ানো হচ্ছিল, তখনো একজন আন্দোলনকারী জীবিত ছিলেন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা যুগান্তরকে জানান, পোড়ানোর সময় একজন নড়াচড়া করছিলেন। চাইলে সেই জীবিত যুবককে পুলিশ চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারত। কিন্তু কতটা নিষ্ঠুর হলে তারা জীবন্ত একজনকে পুড়িয়ে হত্যা করেছিল।
ওই দিন যে সাতজনকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয় তারা হলেন-সাজ্জাদ হোসেন সজল, আস-সবুর, তানজীল মাহমুদ সুজয়, বায়েজিদ বোস্তামী, আবুল হোসেন, ওমর ফারুক ও মোহাম্মদ শাহাবুল ইসলাম। ওই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দুটি অভিযোগ করা হয়। দুটি অভিযোগই অভিন্ন হওয়ায় একটি মামলা হয়।
লাশ পোড়ানোর ভিডিওতে ১ মিনিট ৬ সেকেন্ডে একটি পোস্টার দেখা যায়, যা ছিল স্থানীয় ধামসোনা ইউনিয়ন সভাপতি প্রার্থী ও ৭নং ওয়ার্ডের মেম্বার প্রার্থী আবুল হোসেনের। সেই পোস্টারটি দেখে নিশ্চিত হওয়া গিয়েছিল ভিডিওটির ঘটনাস্থল আশুলিয়া থানার আশপাশে। পুলিশ লাশগুলো থানার সামনে নিয়ে যায়। সেখানে একটি পুলিশ ভ্যানে লাশগুলো রেখে আগুনে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। শহীদদের স্বজন ও মায়েরা এই অমানবিক হত্যাকাণ্ডের বিচার ও ভয়াবহতার লোমহর্ষক বর্ণনা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তুলে ধরেন।
লাশ পোড়ানোর ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায়ে ১৬ আসামির মধ্যে ছয়জনকে মৃত্যুদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। সাতজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। দুজনকে সাত বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয় এবং একজনকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে গ্রেফতার হয়ে কারাগারে আছেন আটজন। অন্যরা এখনো পলাতক।
কারাগারে থাকা আট আসামি হলেন-আবদুল্লাহিল কাফী (যাবজ্জীবন), শহিদুল ইসলাম (যাবজ্জীবন), আরাফাত হোসেন (যাবজ্জীবন), আবদুল মালেক (মৃত্যুদণ্ড), আরাফাত উদ্দীন (৭ বছরের কারাদণ্ড), কামরুল হাসান (৭ বছরের কারাদণ্ড), শেখ আবজালুল হক (ক্ষমা) ও মুকুল চোকদার (মৃত্যুদণ্ড)। পলাতক আট আসামি হলেন-সাইফুল ইসলাম (মৃত্যুদণ্ড), সৈয়দ নুরুল ইসলাম (যাবজ্জীবন), আসাদুজ্জামান রিপন (যাবজ্জীবন), এএফএম সায়েদ (মৃত্যুদণ্ড), মাসুদুর রহমান (যাবজ্জীবন), নির্মল কুমার দাস (যাবজ্জীবন), বিশ্বজিৎ সাহা (মৃত্যুদণ্ড) ও যুবলীগ ক্যাডার রনি ভূঁইয়া (মৃত্যুদণ্ড)।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ৫ আগস্ট সকাল ৯টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত পুলিশ, স্থানীয় এমপি সাইফুল ইসলাম ও তার ক্যাডার বাহিনী ছাত্রলীগ-যুবলীগের গুলিতে আশুলিয়ায় নিহত হন অন্তত ৩১ জন। পরদিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আরও ১৫ জন মারা যান। এছাড়া গুলিবিদ্ধ হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল দেড় হাজারের বেশি মানুষ। যাদের অনেকেই পঙ্গু হয়ে গেছেন। সাভার ও আশুলিয়ায় ১৮ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে মারা যান অন্তত ৭৫ জন। এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে লাশ পোড়ানোর একটি ভিডিও। মর্মান্তিক, হৃদয়বিদারক ও লোমহর্ষক ওই ঘটনায় ভাইরাল হওয়া ভিডিওটি ছিল ১ মিনিট ১৪ সেকেন্ডের।
শহীদ সাজ্জাদ হোসেন সজলের মা শাহিনা বেগম যুগান্তরকে বলেন, ‘৫ আগস্ট পুলিশের পিকআপ ভ্যানে কয়েকটি পোড়া লাশ দেখতে পাই। তখন উপস্থিত লোকজন লাশের ছবি ও ভিডিও করছিলেন। একটি লাশ এমনভাবে পুড়েছিল, পায়ের মোটা হাড়টা বের হয়ে গিয়েছিল। সেই হাড়ের সঙ্গে একটি জুতা পোড়া অবস্থায় ঝুলছিল। দেখেই আমি বুঝতে পারি, এটা আমার ছেলে সাজ্জাদের জুতা। সজলের লাশ যখন নামানো হয় তখন তার সঙ্গে ছিল তার কর্মস্থলের আইডি কার্ড (আংশিক পোড়া)। মানিব্যাগের ভেতরে তার বিশ্ববিদ্যালয়ের আইডি কার্ড দেখে ছেলের লাশ শনাক্ত করি।’ তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘পোড়ানোর আগে আমার ছেলে জীবিত ছিল। আসামিদের দণ্ড যেন দ্রুত কার্যকর হয়।’
এ মামলায় রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, প্রত্যেক আসামি সচেতনভাবে অপরাধ কাজে অংশ নিয়েছেন এবং অভিন্ন অপরাধমূলক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে অবদান রেখেছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যেসব সদস্য এ মামলার আসামি, তারা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ছিলেন। তাদের কাছে কমান্ড অথরিটি ও অভিযান পরিচালনার নিয়ন্ত্রণ ছিল। ফলে নিজেদের কর্মকাণ্ডের সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে তারা পুরোপুরি সচেতন ছিলেন। অন্যদিকে রাজনৈতিক ব্যক্তিরা প্রভাব বিস্তার, সমন্বয় ও জনসমাবেশ সংগঠনের মাধ্যমে এমন ভূমিকা পালন করেছেন, যা অপরাধ সংঘটনে বাস্তবিকভাবে সহায়ক হয়েছে। সরাসরি অংশগ্রহণ, সহায়তা, সুবিধা প্রদান কিংবা অবহেলার মাধ্যমে আসামিরা সংঘবদ্ধভাবে (জয়েন্ট ক্রিমিনাল এন্টারপ্রাইজ) অপরাধ করেছে বলেও রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।
রায়ে বলা হয়েছে, কোনো কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তিগতভাবে প্রতিটি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সম্পাদন না করলেও তারা সংঘবদ্ধ অপরাধের দায় থেকে অব্যাহতি পান না। এসব কারণে ট্রাইব্যুনাল মনে করেন, আসামিরা মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনে সংঘবদ্ধভাবে অপরাধমূলক কার্যক্রমে অংশ নিয়েছিলেন। যা প্রসিকিউশন সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে।
আসামিপক্ষে পক্ষে ট্রাইব্যুনালে ছিলেন আইনজীবী আবুল হাসান। তিনি সোমবার যুগান্তরকে বলেন, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এসআই আবদুল মালেক ও কনস্টেবল মুকুল চোকদার খালাস চেয়ে আপিল করেছেন। এখনো আপিল শুনানি হয়নি।