Image description
র‌্যাব-১ এর ‘আয়নাঘর’

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারপতিদের ‘আয়নাঘর’ পরিদর্শনের মাধ্যমে বেরিয়ে এলো রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের এক ভয়ঙ্কর সাক্ষ্য। সংকীর্ণ কক্ষ, বাতাসহীন দেয়াল, আলোহীন অন্ধকার আর নিঃশব্দে চাপা পড়ে থাকা অসংখ্য পরিত্যক্ত 
আসবাবপত্র-ইসলামিক বই, টর্চারের উদ্দেশ্যে বানানো সাউন্ডপ্রুফ রুম বিগত সরকারের ফ্যাসিবাদী শাসনের নির্মম বাস্তবতার সাক্ষ্য বহন করে। শনিবার ট্রাইব্যুনালের তিন বিচারপতি, প্রসিকিউশন টিম, তদন্ত সংস্থার সদস্য, আসামিপক্ষের আইনজীবী, ভুক্তভোগী পরিবারের প্রতিনিধি, মানবাধিকারকর্মী এবং গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতিতে এই বিচারিক পরিদর্শন অনুষ্ঠিত হয়। পরিদর্শন শেষে চিফ প্রসিকিউটর জানান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিধিমালা ও রোম স্ট্যাটিউটের আলোকে পরিচালিত এই পরিদর্শনের উদ্দেশ্য ছিল বিশ্ব জুড়ে আলোচিত ‘আয়নাঘর’র বাস্তব চিত্র বিচারিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা।

দেয়ালের আড়ালে লুকানো ছিল গোপন কক্ষ: প্রসিকিউশন জানায়, তদন্তের শুরুতেই বিভ্রান্তির মুখে পড়েন আয়নাঘর উদ্‌ঘাটনে যাওয়া তদন্তকারীরা। ভবনের ভেতরে ভুক্তভোগীদের বর্ণনার সঙ্গে বাস্তব কাঠামোর মিল পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে সন্দেহের ভিত্তিতে নতুন করে নির্মিত কয়েকটি দেয়াল ভাঙতেই বেরিয়ে আসে একের পর এক গোপন সেল। যেন ইট-সিমেন্টের দেয়ালের আড়ালে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল নির্যাতনের ইতিহাস। চিফ প্রসিকিউটর জানান, ভবনটিতে ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ২৯টি সেল রয়েছে। অনেক কক্ষ এতটাই ছোট যে, সেখানে একজন মানুষ সোজা হয়ে শুয়েও থাকতে পারতেন না।

‘ডেথ সেল’ মাত্র ২ ফুট বাই ৪ ফুট: সরজমিন দেখা যায়, দুই তলার এই আয়নাঘরে দ্বিতীয় তলার সিঁড়ির মুখে ছিল ৭টি অতিসংকীর্ণ সেল। এটি আয়নাঘরে প্রবেশ মুখের ডানপাশের গোপন কক্ষ। গড় আয়তন মাত্র ২ ফুট বাই ৪ ফুট। এতটুকু স্থানের মধ্যেই টয়লেট সংযুক্ত করা ছিল। এই কক্ষগুলো পরিচিত ছিল ‘ডেথ সেল’ বা ‘যম সেল’ নামে। এটি ছিল মূল আয়নাঘর থেকে বিচ্ছিন্ন একটি স্থান। যাদের গুম করে হত্যা করার পরিকল্পনা করা হতো কেবলমাত্র তাদেরকেই এখানে রাখা হতো। এ ছাড়া, নিচতলায় ছিল ১০টি ছোট সেল, দ্বিতীয় তলায় আরও ১০টি। এখানে ছিল দু’টি তথাকথিত ‘ভিআইপি সেল’। বন্দির সংখ্যা বেড়ে গেলে করিডোরেও কাপড়ের পার্টিশন দিয়ে অস্থায়ী সেল তৈরি করা হতো।

সাউন্ডপ্রুফ কক্ষে চলত নির্যাতন: স্থাপনাটিতে ছিল ৩টি সাউন্ডপ্রুফ জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ। তদন্তে উঠে এসেছে, সেখানে রাখা ছিল ঘূর্ণায়মান স্টিলের চেয়ার, বৈদ্যুতিক শক দেয়ার যন্ত্র, ছাদ থেকে ঝুলিয়ে রাখার ব্যবস্থা এবং বিশেষ লোহার বেড। অভিযোগ অনুযায়ী, বন্দিদের এসব যন্ত্রে বেঁধে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হতো। দেয়ালে টাঙানো থাকতো কাটা হাত, উপড়ে ফেলা চোখ এবং নির্যাতনের বিভৎস ছবি।

‘হাসপাতাল’ ছিল গোপন নাম: র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার অধীনে পরিচালিত এই টিএফআই সেলের কোডনেম ছিল ‘হাসপাতাল’। বাইরে থেকে এটি ছিল একটি সাধারণ সরকারি স্থাপনা, কিন্তু ভেতরে চলতো বলপূর্বক গুম, অবৈধ আটক ও নির্যাতনের ভয়াবহ অধ্যায়। প্রসিকিউশন জানায়, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এই স্থাপনাটি বলপূর্বক গুমের অন্যতম প্রধান বন্দিশালা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এখান থেকে অনেক ভুক্তভোগীকে আবার দেশের অন্য গোপন বন্দিশালায়ও স্থানান্তর করা হতো।

২৫০ জনেরও বেশি মানুষ এখনো নিখোঁজ: চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম জানান, প্রাথমিক তদন্তে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং ব্যারিস্টার আরমানকে এই সেলে আটকে রাখার তথ্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়া, এখন পর্যন্ত বলপূর্বক গুম হওয়া ২৫০ জনেরও বেশি ব্যক্তির কোনো সন্ধান মেলেনি। তিনি বলেন, কাউকে গ্রেপ্তারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে হাজির করার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা এখানে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়েছে। এসব কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। আমিনুল ইসলাম বলেন, শুধু মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নয়, ‘সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটি’র আওতায় থাকা ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিদেরও বিচারের আওতায় আনা হবে।

যারা এই ব্যবস্থাকে পরিচালনা, অনুমোদন বা সহায়তা করেছেন, তাদের বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি জানান, শনিবার সেনানিবাসের ভেতরে ডিজিএফআইয়ের জিআইসি পরিদর্শনের পরিকল্পনা রয়েছে। এ পরিদর্শনের ভিত্তিতে একটি বিচারিক স্মারক প্রস্তুত করা হবে, যা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারিক নথির অংশ হবে। প্রসিকিউশনের দাবি- ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের পর বলপূর্বক গুমসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্যপ্রমাণ নষ্ট করার চেষ্টা করা হয়েছে। ভবনটির দেয়াল, দরজা, জানালা এবং বিভিন্ন কাঠামো পরিবর্তন বা ধ্বংস করা হয়েছে। আয়নাঘর কোনো নির্দিষ্ট স্থান নয়, এটি একটি ধারণা: আসামিপক্ষের আইনজীবী: টিএফআই সেল পরিদর্শন শেষে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা দাবি করেছেন, ‘আয়নাঘর’ কোনো নির্দিষ্ট স্থান নয়, বরং একটি ধারণা।

তারা বলছেন, ‘আয়নাঘর’ বলতে কোনো সুনির্দিষ্ট স্থানের অস্তিত্ব নেই এবং এই সংক্রান্ত আইনি ব্যত্যয় ঘটলে তা বড়জোর বিভাগীয় ব্যবস্থা হতে পারে, কিন্তু ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ নয়। গতকাল ট্রাইব্যুনালের বিচারক ও প্রসিকিউশন দলের সঙ্গে পরিদর্শনে অংশ নিয়ে আইনজীবী মো. তবারক হোসেন ভূঁইয়া বলেন, তারা ‘আয়নাঘর’ নয়, তথাকথিত টিএফআই সেল দেখতে গেছেন এবং টিএফআই একটি কনসেপ্ট, নির্দিষ্ট কোনো কক্ষ নয়। তিনি আরও বলেন, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তাদের অপরাধী বলা যায় না। অপর আইনজীবী এ বি এম হামিদুর মেজবা বলেন, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে হাজির করতে ব্যর্থ হলেও তা সর্বোচ্চ বিভাগীয় অপরাধ হতে পারে, মানবতাবিরোধী অপরাধ নয়। তিনি আরও দাবি করেন, প্রসিকিউশন এখনো আসামিদের সঙ্গে ওই কক্ষগুলোর কোনো সরাসরি যোগসূত্র দেখাতে পারেনি।