Image description

সকালের নাশতায় এক কাপ চায়ের সঙ্গে একটি পাউরুটি। সবার কাছে যা খুবই স্বাভাবিক একটি খাবার। কিন্তু সেই পাউরুটিই যদি তৈরি হয় ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান দিয়ে? তাহলে তা হয়ে উঠতে পারে মৃত্যুসহ নানা রোগের কারণ। শুধু পাউরুটি নয়, দেশের বাজারে শিশুদের খাবার থেকে শুরু করে তেল, মসলা, দুধ, ফল, শাক-সবজি- প্রায় সব ধরনের খাদ্যেই মিলছে ভেজাল ও ক্ষতিকর রাসায়নিকের উপস্থিতি। একের পর এক অভিযানও পরিচালিত হচ্ছে। তবে পরিস্থিতির উন্নতি নেই। ফলে জনস্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। খাদ্যে ভেজাল বর্তমানে দেশের অন্যতম ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। মুনাফার লোভে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী খাদ্যপণ্যে শিল্পজাত রাসায়নিক উপাদান, ক্ষতিকর রং, নিম্নমানের কাঁচামাল ও বিভিন্ন কৃত্রিম উপাদান ব্যবহার করছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৫ লাখ ৭২ হাজারের বেশি মানুষ হৃদরোগ, কিডনি রোগ, স্ট্রোক ও ক্যান্সারের মতো অসংক্রামক রোগে মারা যান। বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত চিনি, লবণ, চর্বি এবং ভেজালযুক্ত খাদ্য গ্রহণ এসব মৃত্যুর অন্যতম কারণ।

২০২৫ সালের জুলাই থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত গত ১০ মাসে ১ হাজার ৭৫৬টি খাদ্যনমুনা পরীক্ষা করে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) ও বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউট (বিএসটিআই)। প্রতিষ্ঠান দু’টির তথ্যমতে, বিভিন্ন পণ্যে পটাশিয়াম অ্যালুমিনিয়াম সালফেট, সোডিয়াম হাইড্রোসালফাইট ও সারফেস অ্যাকটিভের মতো রাসায়নিক ও ভারী ধাতুর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। যার অনেকটিই খাদ্যে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং ভেজাল হিসেবে গণ্য। আচার, সস, চিপস, মুড়ি, ফলের রস, বাচ্চাদের জুস, চানাচুর, মরিচ-হলুদের গুঁড়া, ঘি, পাউডার দুধ, সরিষার তেল, মাখন, সয়াবিন তেল, ডালডা, মধুসহ নানান পণ্যে এসব অনিয়ম ধরা পড়ে। পরীক্ষিত চিপসের ৬৫ শতাংশে অ্যাক্রিলামাইড পাওয়া গেছে। যা ভাজা বা পোড়ানোর ফলে তৈরি হওয়া একটি ক্ষতিকর রাসায়নিক। ১ হাজার ৭৫৬টি নমুনার ৫৮৬টির (৩৩.৪ শতাংশ) খাবারে ভেজাল বা দূষণ পাওয়া গেছে।

১১২টি নমুনায় সরাসরি ভেজাল উপাদান শনাক্ত হয়েছে, যা খাদ্যনিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। ৮২টি খাদ্যপণ্য পরীক্ষায় গড়ে ৪০ শতাংশ খাদ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহনীয় মাত্রার চেয়ে ৩ থেকে ২০ গুণ বেশি নিষিদ্ধ ডিডিটি ও অন্যান্য বিষাক্ত উপাদান রয়েছে। ৩৫ শতাংশ ফলে ও ৫০ শতাংশ শাকসবজিতে কীটনাশকের উপস্থিতি ধরা পড়েছে। চালের ১৩টি নমুনায় অতিমাত্রায় আর্সেনিক এবং পাঁচটিতে ক্রোমিয়াম পাওয়া গেছে। হলুদের গুঁড়ার ৩০টি নমুনায় সিসাসহ ভারী ধাতু এবং লবণে সহনীয় মাত্রার চেয়ে ২০-৫০ গুণ বেশি সিসা পাওয়া গেছে। এমনকি মুরগি ও মাছেও মিলেছে ক্ষতিকর অ্যান্টিবায়োটিক।

দেশ জুড়ে ভেজাল ও নিম্নমানের খাদ্যপণ্যের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযান পরিচালনা করছে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ), জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, বিএসটিআই ও জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত। কিন্তু অভিযানের পরও বাজারে মিলছে ভেজাল খাদ্য। আর অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি হচ্ছে শিশুদের জন্য নানা ধরনের খাদ্যপণ্য। সম্প্রতি মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর ও মাত্রাতিরিক্ত প্রিজারভেটিভ (সংরক্ষণকারী রাসায়নিক) ব্যবহারের দায়ে তিনটি প্রতিষ্ঠানের কাস্টার্ড কেক ও ব্রেড (পাউরুটি) বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ)। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- ইস্ট কেক ইন্টারন্যাশনাল ফুড লিমিটেডের ‘ইস্ট কেক পুর পিঠা জ্যাম’, ইস্ট জিবাই ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের ‘ইস্ট বেকার স্লাইস ব্রেড মিল্ক জ্যাম’ এবং আরবোটিং ফুড কোম্পানি লিমিটেডের ‘আরবোটিং ফুড স্লাইস ব্রেড মিক্স জ্যাম’। ২০২৫ ও ২০২৬ সালে পরিচালিত একাধিক অভিযানে দেখা গেছে, অনেক কারখানায় স্বাস্থ্যবিধি না মেনে শিশু খাদ্য, বেকারি পণ্য ও বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত খাবার উৎপাদন করা হচ্ছে। কোথাও ব্যবহার হচ্ছে মেয়াদোত্তীর্ণ কাঁচামাল, কোথাও আবার অনুমোদনহীন রং, রাসায়নিক ও নিম্নমানের উপাদান।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিএসটিআই অভিযান পরিচালনা করলেও খাবারে ভেজাল কমছে না। কারণ তারা অভিযান পরিচালনা করছে ছোট ছোট কারখানার বিরুদ্ধে। তারা যে পরিমাণ জরিমানা করছে তা অপরাধের তুলনায় নগন্য। শাস্তি কম হওয়ায় অপরাধীরা বারবার একই অপরাধ করে যাচ্ছে। এ ছাড়া বিএসটিআই সিলযুক্ত খাবারেও ভেজাল রয়েছে। যেগুলোকে বিএসটিআই অনুমোদন দেয় সেখানেও বিএসটিআই ঠিক মতো তদারকি করছে না। ফলে এত বছরেও দেশের বাজার থেকে ভেজাল খাদ্য সরবরাহ বন্ধ করা যাচ্ছে না।

সম্প্রতি বাজারে শিশুদের জন্য নকল ও ভেজাল ওটস বিক্রির একটি চক্রও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযানে দেখা গেছে, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড কোয়েকার (ছঁধশবৎ), হেলথ প্যারাডাইস ও কাউহেড (ঈড়যিবধফ)-এর মোড়কে নকল করে ভেতরে ভুসি, চালের কুড়া ও গমের ভাঙা অংশ দিয়ে তৈরি নিম্নমানের পণ্য বাজারজাত করা হচ্ছে। বিষয়টি শিশুদের স্বাস্থ্য নিয়ে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানীর রায়েরবাগ, চকবাজার, মৌলভীবাজার, কেরানীগঞ্জ, ডেমরা এবং গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে ভেজাল খাদ্য উৎপাদনের অসংখ্য কারখানা। এসব কারখানায় উৎপাদিত পণ্য পাইকারি ও খুচরা বাজারের মাধ্যমে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। অধিক মুনাফার আশায় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী জেনেশুনেই এসব পণ্য বিক্রি করছেন। সাম্প্রতিক কয়েকটি অভিযানে ভেজাল খাদ্য উৎপাদনের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে।

গত ২৩শে জুলাই রাজধানীর সবুজবাগ এলাকায় নিবন্ধন সনদবিহীন এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে আইসক্রিম, আইস ললি পণ্য বিক্রি করার অপরাধে ‘সোনার মদিনা’ নামক প্রতিষ্ঠানকে দুই লাখ টাকা জরিমানা করে বিএসটিআই। এর আগে গত ৯ই জুলাই রাজধানীর বসুন্ধরা সিটি শপিংমলে আলমাস সুপার শপে বিএসটিআইয়ের পরীক্ষণ ও ছাড়পত্রবিহীন নিম্নমানের শিশু খাদ্য: চকলেট, ফ্লেভার ড্রিংকস, গুঁড়া দুধসহ বিভিন্ন পণ্য এবং কসমেটিক বিক্রির প্রমাণ পাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটিকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। একই অভিযানে অনলাইন-ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান সোফিয়াস বিউটি হাউজের বিরুদ্ধে নিম্নমানের কসমেটিক বিক্রির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটিকে ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করা হয়।

 গত ২৩শে জানুয়ারি ঢাকার সাভার ও কেরানীগঞ্জে নকল বৈদ্যুতিক তার, ভেজাল শিশু খাদ্য ও কসমেটিকস উৎপাদন, মজুত ও বিক্রি করার দায়ে ১২টি প্রতিষ্ঠানকে ২৩ লাখ ২০ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। গত ৯ই জুন ঢাকার কেরানীগঞ্জে ভেজাল খাদ্যপণ্য উৎপাদনের অভিযোগে দু’টি কারখানায় অভিযান চালিয়ে ৪ লাখ টাকা জরিমানা করে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। এ সময় বিপুল পরিমাণ নকল ও নিম্নমানের খাদ্যসামগ্রী জব্দ করে ধ্বংস করা হয়। কারখানাগুলোতে বিএসটিআইয়ের অনুমোদন ছাড়াই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বিভিন্ন নামি ব্র্যান্ডের মোড়কে নকল ও ভেজাল খাদ্যপণ্য উৎপাদন করা হতো। এরও আগে ১৯শে মে রাজধানীর কেরানীগঞ্জের কোনাখোলা এলাকায় নকল ও অস্বাস্থ্যকর ভেজাল খাদ্যপণ্য উদ্ধারসহ এক লাখ টাকা জরিমানা আদায় করে র‌্যাব-১০। অভিযানে বিএসটিআই অনুমোদনবিহীন এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে নকল ও ভেজাল খাদ্যপণ্য সেমাই উৎপাদনের প্রমাণ পাওয়া যায়।

এ প্রসঙ্গে বারডেম জেনারেল হাসপাতালের প্রধান নিউট্রোলোজিস্ট শামসুন নাহার মহুয়া মানবজমিনকে বলেন, দেশে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, স্ট্রোক এবং ক্যান্সারের রোগী দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এগুলোর প্রধান কারণ স্বাস্থ্যকর খাবার না খাওয়া। কেনা খাবারে বিভিন্ন অস্বাস্থ্যকর উপাদান মেশানো হয়। শরীরের জন্য ক্ষতিকর রং, প্রিজারভেটিভ, ফরমালিন ব্যবহার করা হয়। মুখরোচক করার জন্য অতিরিক্ত তেল, লবণ ও চিনি ব্যবহার করা হয়। এসব উপাদান মানুষকে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ফেলে। তিনি বলেন, সুস্থ থাকতে চাইলে এসব খাবার থেকে দূরে থাকতে হবে। বাড়িতে স্বাস্থ্যকর উপায়ে বানানো খাবার খাওয়ার অভ্যাস গড়তে হবে। বিশেষ করে শিশুদের প্রথম থেকেই ঘরোয়া খাবার খাওয়ানোর অভ্যাস করতে হবে।

কনজ্যুমার এসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি এস এম নাজের আহমেদ মানবজমিনকে বলেন, বিএসটিআই এবং জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ বারবার অভিযান পরিচালনা করার পরও বাজারে ভেজাল খাদ্য ঠেকানো যাচ্ছে না। এর কারণ হচ্ছে- তারা যে পরিমাণ জরিমানা করছে তা অপরাধের বিপরীতে নগন্য। যে পরিমাণ অভিযান পরিচালনা করা প্রয়োজন সে পরিমাণ অভিযান পরিচালনা করতে পারে না। এখন পর্যন্ত বড় ধরনের অপরাধে জেল হওয়ার নজিরও খুব কম। ফলে অসাধু ব্যবসায়ীরা অভিযানকে তেমন গুরুত্ব দিচ্ছে না।

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সাবেক চেয়ারম্যান (ভারপ্রাপ্ত) মাহবুব কবির মিলন মানবজমিনকে বলেন, উন্নত দেশগুলোতে শক্তিশালী, স্বাধীন ও ক্ষমতাসম্পন্ন ফুড সেফটি অথরিটি রয়েছে। যারা সরকারের উচ্চপর্যায় থেকেও স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে এবং সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে জবাবদিহির আওতায় রাখে। কিন্তু বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (ইঋঝঅ) খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন হওয়ায় স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না। এ ছাড়া সংস্থাটির নিজস্ব জরিমানা করার ক্ষমতা নেই। মোবাইল কোর্টের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় কার্যকর অভিযান পরিচালনাও সীমিত। এ ছাড়া সব দপ্তরের ডিজি-চেয়ারম্যানের পদ একজন সচিব পদমর্যাদার। কিন্তু ফুড সেফটি অথরিটির চেয়ারম্যানের পদ একজন অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার। তাহলে তার কথা কে শুনবে? কেন শুনবে? তিনি বলেন, আবার সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুর্নীতির কারণে আমরা সমস্যাটি কোনোভাবেই সমাধান করতে পারছি না। ফুড সেফটি নিশ্চিত হলে অনেকের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে। অনেক ব্যবসায়ীর অসৎ লাভ বন্ধ হয়ে যাবে।

বিএসটিআইয়ের পরিচালক (প্রশাসন) মো. সাইফুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, আমাদের দেশের মানুষের আইনের প্রতি শ্রদ্ধা কম। আমরা বারবার অভিযান পরিচালনা করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করি। কিন্তু তারা বারবার একই অপরাধমূলক কাজ করে যাচ্ছে। বর্তমানে বড় বড় প্রতিষ্ঠর পণ্য নকল করে ভেজাল পণ্য উৎপাদন করা মহামারি আকারে ধারণ করছে। আমাদের লোকবল সংকটের কারণে প্রয়োজন অনুযায়ী অভিযান পরিচালনা করতে পারছি না। বিএসটি আই থেকে অনুমোদন দেয়া পণ্যের তদারকি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা প্রতিনিয়ত বাজার থেকে সেম্পল কালেক্ট করে তা টেস্ট করছি।