ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোয়ন প্রত্যাহারের শেষ সময়ের দুই দিন আগে অনেকটা হঠাৎ করেই জামায়াতের নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক ঐক্যে যুক্ত হয় জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। নির্বাচনে অপ্রত্যাশিত ফলও অর্জন করে দলটি। জোটগতভাবে ২৯টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ছয়টি আসনে জয়লাভ করে। নির্বাচনের পর নিজেদের একটি ও জামায়াতের ছেড়ে দেওয়া একটি মিলে সংসদে তাদের মোট আসন হয় আটটি। বেশিরভাগ আসনেই পরাজিত হলেও হাড্ডাহাডি লড়াই করেছে তরুণদের গঠিত দলটির প্রার্থীরা।
আবার দলীয় প্রধান নাহিদ ইসলামও হয়েছেন সংসদের বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষদের মতে, নতুন দল হিসেবে এখন পর্যন্ত এনসিপি অপ্রত্যাশিত ফলাফল অর্জন করেছে। এক্ষেত্রে অনেকে বলছেন, জামায়াতের গণজোয়ারের কারণেই এনসিপির প্রার্থীরা ভালো ফল অর্জ করেছেন। জামায়াত সমর্থিত বুদ্ধিজীবী এবং অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টরাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে বারবার প্রচারণা চালাচ্ছেন। যেন দলটিকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া। অন্যদিকে বসে নেই এনসিপির নেতাকর্মীরাও। তাদের দাবি, তারা যুক্ত হওয়ার পরই বরং ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রতি জনসমর্থন শক্তিশালী হয়েছে।
নির্বাচনের পর টেলিভিশন টকশোতে এমন মন্তব্য করে দলটির যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক ও নোয়াখালী-৬ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল হান্নান মাসউদ বলেন, ‘জামায়াতের সঙ্গে ঐক্য না করলে এনসিপির জন্য আরও ভালো হতো’। আর সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্থা শারমিন বলেন, ‘এনসিপির কারণেই জামায়াত এতগুলো আসনে জয়লাভ করেছে’। এ নিয়ে প্রায় সময়ই অনলাইনে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন দুই দলের নেতাকর্মীরা।
তবে এ বিষয়টি নিয়ে আগুনে ঘি ঢেলে দিয়েছেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি জাহিদুল ইসলাম। সম্প্রতি নিজের ভেরিফায়েড ফেসুবক আইডিতে তিনি হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে এনসিপির কর্মসূচিতে হামলা সুপরিকল্পিত বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, ‘এসব ঘটনার মূল উদ্দেশ্য হতে পারে জুলাই মাসে জামায়াতকে আলোচনার বাইরে রাখা এবং এনসিপির প্রতি জনসমর্থন সৃষ্টি করা। গুড প্ল্যান, গুড মুভ (ডিপ পাওয়ার)’। যদিও তিনি সেই পোস্টটি কয়েক মিনিট পর ডিলিট করে দেন। তবে তার আগেই তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
অন্যদিকে তার এই পোস্টের প্রতিক্রিয়ায় তীর্যক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন। তিনি জামায়াতের বহিষ্কৃত নেতা ও সাতক্ষীরা-৪ আসনের এমপি গাজী নজরুলের নারী ইস্যু টেনে আনেন। তিনি লিখেন, জামায়াতের ৬০ বছর বয়সী সংসদ সদস্য যে কেলেঙ্কারির জন্ম দিয়েছেন, সেটা জুলাই মাসই ছিল।
নেতাকর্মীদের বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়ার মধ্যেই দল দুটির রাজনৈতিক বোঝাপড়ার বিষয়টি সামনে আসছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনসিপির এক যুগ্ম সদস্য সচিব বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সাম্প্রতিক কঠিন মুহূর্তে প্রধান শরিক জামায়াতকে পাশে পায়নি এনসিপি। বরং তাদের অনেক নেতা আমাদের নিয়ে উপহাস করেছেন। তাই আমাদের মাঠ পর্যায়ে এক ধরনের অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।’
তাছাড়া আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও জামায়াত একা পথ চলতে চায়। সে বিষয়টি নিয়ে এক ধরনের টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। এনসিপির এই নেতা বলেন, ‘বিশেষ করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে এনসিপির শীর্ষ নেতা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে ছাড় দেওয়া প্রশ্নে দলটির অনমীয় অবস্থানও আগামী দিনে রাজনৈতিক মিত্রতা থাকবে কিনা, সেই প্রশ্ন উঠেছে। তাই বিকল্প হিসেবে কওমি মাদরাসাভিত্তিক ৭ দলীয় সম্ভাব্য জোটের প্রতিও নজর রাখা হচ্ছে।’
যদিও দুই দলের শীর্ষ নেতারা বিষয়টিকে সাধারণভাবে দেখছেন। এ ধরনের বিরোধ মানে জোটে ভাঙনের আভাস হিসেবে দেখতে নারাজ তারা।
টানাপোড়েনের নেপথ্যে ‘আদর্শ’ নাকি ‘দেনা-পাওনা’
সম্প্রতি জামায়াত ও এনসিপির মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে এক ধরনের মনস্ত্বাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগেমাধ্যমে এ নিয়ে পরস্পর কাদা ছোড়াছুড়ি অব্যাহত আছে। বিশেষ করে হবিগঞ্জ ও সিলেটে এনসিপির নেতাকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনায় প্রধান মিত্র দল হিসেবে জামায়াতের স্থানীয় নেতাকর্মীদের তেমন সহযোগিতা না পাওয়া। কেন্দ্রীয়ভাবে জামায়াতের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া বা প্রতিবাদ না জানানো এসব কারণে এনসিপির নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। দল দুটির শীর্ষ কয়েকজন নেতাও এ ধরনের বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছেন। রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে, সামান্য ইস্যুতে নেতাকর্মীদের মধ্যে এমন বিতর্কে জড়ানোর মূল কারণ কী? সেটি কি আদর্শিক নাকি নানা সুবিধা আদায়ের রাজনীতি?
এ বিষয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, জামায়াত ধর্মীয় আদর্শে বিশ্বাস করে। আর এনসিপি মধ্যপন্থি আদর্শের কথা বলছে। তবে দুই দলের মধ্যেই কিছু দ্বিমত আছে। আমি মনে করি, তাদের সাম্প্রতিক মতবিরোধ আদর্শিক নয়। আর এনসিপির অনেক নেতা তো এক সময় শিবিরের রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন। মূলত ধরনের বিরোধের পেছনে সুবিধা আদায়ের বিষয়টি জড়িত থাকতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত তারা মান-অভিমানের পর্যায়ে রয়েছেন। ঐক্য ভাঙার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।
স্থানীয় নির্বাচনে কোন দিকে ঝুঁকছে এনসিপি?
জাতীয় নির্বাচনে জোটগত অংশগ্রহণ করে সাফল্য পায় বর্তমান প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও তাদের অন্যতম মিত্র জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। নির্বাচনী ঐক্য বলা হলেও নির্বাচনের পরও ১১ দলীয় ঐক্য চলমান আছে। বিভাগীয় পর্যায়ে একাধিক সমাবেশও করেছে দলগুলো। যদিও সম্প্রতি তাদের কাছ থেকে আলাদা হয়ে গেছে খেলাফত মজলিস। এরই মধ্যে প্রধান শরিক জামায়াতের পক্ষ থেকে মিত্রদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে এককভাবে। এতে কোনও ঐক্য বা জোট থাকবে না। যে যার সক্ষমতা অনুযায়ী নির্বাচন করবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে জোটের একটি দলের মহাসচিব বলেন, ‘এনসিপি চেয়েছিল, তারা জোটগতভাবে জামায়াতের সমর্থন নিয়ে স্থানীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। কারণ এককভাবে নির্বাচন করার সক্ষমতা তাদের এখনও হয়নি। বিশেষ করে ঢাকা দক্ষিণে দলটির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনে দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক ও জাতীয় যুবশক্তির আহ্বায়ক তারিকুল ইসলামসহ কমপক্ষে তিনটি আসনে জামায়াতের সমর্থন চেয়েছিল। কিন্তু এক্ষেত্রে জামায়াত সাফ জানিয়ে দিয়েছে, তারা স্থানীয় নির্বাচন জোটগত করতে চায় না। বিশেষ করে ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে তারা ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম প্রশ্নে অনড়। সে কারণে হয়তো ঐক্য ছেড়ে বা থেকেও হেফাজত সমর্থিত কওমি মাদরাসা কেন্দ্রিক সম্ভাব্য ৭ দলীয় জোটে যোগ দিতে পারে।’
জানতে চাইলে চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রচার সম্পাদক শেখ ফজলুল করীম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘স্থানীয় নির্বাচন সামনে রেখে এনসিপির শীর্ষ পর্যায়ের কেউ এখনও তাদের সঙ্গে আলোচনা করেননি। তবে বিচ্ছিন্নভাকে কয়েকজন নেতা যোগাযোগ করেছেন। আমরা বলেছি, এ বিষয়ে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব আসতে হবে। এক্ষেত্রে আমাদের সঙ্গে আসতে হলে ১১ দল থেকে বের হয়ে আসতে হবে এবং নাহিদ ইসলামকে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপের পদও ছাড়তে হবে। গাছেরটা খেয়ে তলারটাও কুঁড়ানোর সুযোগ নেই।’
অবশ্য বিষয়টি উড়িয়ে দিয়েছেন এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘এ ধরনের ধারণার কোনও ভিত্তি নেই। জোটগতভাবেই সিদ্ধান্ত হয়েছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে যে যার মতো অংশগ্রহণ করবে। এতে কারও কোনও দ্বিমত নেই। আর অনলাইনে যারা পক্ষে-বিপক্ষে মতামত দিচ্ছেন, সেগুলোও ব্যক্তিগত। এখানে দলগত কোনও নির্দেশেনাও নেই। অনেকে নানা বিভ্রান্তি ছড়ালেও আমাদের ঐক্য ঠিকই আছে।’ আর কওমি মাদরাসা-কেন্দ্রিক কোনও জোটে এনসিপির আপাতত কোনও সম্ভাবনা নেই বলেও তিনি জানান।
কী বলছে জামায়াত?
এনসিপির সঙ্গে জামায়াতের কোনও দ্বন্দ্ব নেই বলে দাবি দলটির নেতাদের। জামায়াতের কমপক্ষে দুই জন কেন্দ্রীয় নেতা জানান, আসলে তাদের সম্পর্ক আগের মতোই আছে। কারও ব্যক্তিগত মতামতকে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে কিছু গণমাধ্যম।
এ বিষয়ে দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে যে সিদ্ধান্ত হয়েছে, তা জোটের সব দলই মেনে নিয়েছে। অতীতেও আমরা যখন বিএনপির সঙ্গে চার দলীয় জোটে ছিলাম, তখনও স্থানীয় নির্বাচন এককভাবে করেছি। তাই এবার আমাদের রাজনৈতিক ঐক্য হলেও শরিকরা আলাদাভাবেই নির্বাচন করবেন। আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে ধরনের প্রচারণা চলছে, তাও ব্যক্তিগত। আমরা মনে করি মতপ্রকাশের অধিকার সবারই আছে।’ এর কারণে ঐক্যে ফাটল ধরবে না বলে তিনি জানান।
নি অভিযোগ করেন, কিছু গণমাধ্যম ও এজেন্সির পক্ষ থেকেও ঐক্যে ভাঙন দেখানোর এক ধরনের অপতৎপরতা আছে। তবে এই চেষ্টা সফল হবে না বলেও মনে করেন তিনি।