Image description

ইউরোপে উন্নত জীবনের স্বপ্ন। বিদেশে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়া মিথ্যা সফলতার গল্প। এতে আকৃষ্ট হয়ে দালালদের ভয়ঙ্কর পাতা ফাঁদে দেন বাংলাদেশের শ’ শ’ তরুণ। নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও ছোট বোটে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেয়ার চেষ্টা করেন তারা। ভাগ্য সহায় হলে কেউ কেউ তীরে উঠতে পারলেও বেশির ভাগেরই সলিল সমাধি হয় সাগরে। গত কয়েক বছর ধরে এই পথ পাড়ি দেয়ার চেষ্টায় বিশ্বের শীর্ষে অবস্থান করছে বাংলাদেশ। যা নতুন উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। শুধু ইউরোপমুখী সাগরযাত্রাই নয়, প্রযুক্তিনির্ভর সাইবার স্ক্যাম, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার, নারী পাচার এবং রোহিঙ্গাদের সাগরপথে পাচার। এসব এখন মানব পাচারের বহুমাত্রিক ধরন হয়ে উঠেছে। পাচারকারীরা এখন ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম, ভুয়া ওয়েবসাইট ও অনলাইন নিয়োগ বিজ্ঞাপন ব্যবহার করে নতুন কৌশলে মানুষকে ফাঁদে ফেলছে।

এ বছরের মার্চে লিবিয়া থেকে গ্রিসে যাওয়ার পথে অন্তত ১৮ জন বাংলাদেশির মৃত্যু হয় ভূমধ্যসাগরে। তাদের মধ্যে ১২ জনই সুনামগঞ্জের বাসিন্দা ছিলেন। ২১শে মার্চ লিবিয়ার তোবরুক থেকে রওনা হওয়া নৌকাটি দিক হারিয়ে ছয়দিন খাদ্য ও পানিশূন্য অবস্থায় ভেসে ছিল। পরে পাচারকারীদের নির্দেশে মৃতদের মরদেহ সাগরে ফেলে দেয়া হয়।
লিবিয়ার বিভিন্ন ক্যাম্পে বন্দি রেখে অসংখ্য বাংলাদেশির ওপর শারীরিক নির্যাতন চালানো হচ্ছে। পরিবারের কাছ থেকে ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। এত ভয়াবহ বাস্তবতার পরও ইউরোপে যাওয়ার প্রবণতা কমছে না।

ইউরোপীয় সীমান্তরক্ষী সংস্থা ফ্রন্টেক্সের তথ্যের বরাত দিয়ে ব্র্যাক জানিয়েছে, ২০২৫ সালে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ২০ হাজার ২৫৯ জন বাংলাদেশি ইউরোপে প্রবেশ করেন। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই ইতালিতে পৌঁছেছেন ৪ হাজার ২৪৯ জন এবং একই সময়ে লিবিয়া থেকে গ্রিসে গেছেন আরও ৩ হাজার ৬০৮ জন বাংলাদেশি।

ব্র্যাক’র মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, এভাবে যাওয়া ব্যক্তিদের বেশির ভাগের বয়স ২৫ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। মাদারীপুর, শরীয়তপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জসহ অন্তত ১০ থেকে ১২ জেলার মানুষ সবচেয়ে বেশি এই ঝুঁকিপূর্ণ পথে পাড়ি জমাচ্ছেন। বর্তমানে ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপে ইতালিতে পৌঁছানো নৌকার ছবি ও দালালদের যোগাযোগ নম্বর প্রকাশ করে নতুন যাত্রী সংগ্রহ করা হচ্ছে। দেশে ফিরে অনেকেই মামলা করলেও মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছেন।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মানব পাচার আইনে ১ হাজার ১২৬টি নতুন মামলা হয়েছে। পুরনো মামলাসহ ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত মোট ৫ হাজার ২৮৪টি মামলা বিচার ও তদন্তাধীন রয়েছে। এর মধ্যে ৩ হাজার ৩০৬টি বিচারাধীন এবং ১ হাজার ৯৭৮টি মামলার তদন্ত শেষ হয়নি।

প্রযুক্তির ফাঁদে মানব পাচার: অনিয়মিত অভিবাসনের পাশাপাশি নতুন আতঙ্ক হয়ে উঠেছে সাইবার স্ক্যাম। বিদেশে কম্পিউটার অপারেটর, কল সেন্টার, কাস্টমার সার্ভিস বা আইটি প্রতিষ্ঠানে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে তরুণ-তরুণীদের কম্বোডিয়া, মিয়ানমার, লাওস, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সেখানে পৌঁছানোর পর তাদের পাসপোর্ট কেড়ে নিয়ে জোরপূর্বক অনলাইন প্রতারণায় যুক্ত করা হচ্ছে।

বিএমইটি’র তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় বছরে ১৫ হাজার ৯২১ জন বাংলাদেশি কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে কম্বোডিয়ায় গেছেন। কিন্তু ব্র্যাক’র গবেষণায় দেখা গেছে, ফিরে আসাদের ৯৮ শতাংশ কোনো চাকরি পাননি। ৯০ শতাংশকে জোর করে স্ক্যাম সেন্টারে প্রতারণামূলক কাজে যুক্ত করা হয়েছে। ৮৮ শতাংশের চলাচল সীমিত ছিল, ৮৬ শতাংশের পাসপোর্ট জব্দ করা হয়। ২৭ শতাংশ শারীরিক এবং ৩৮ শতাংশ মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
চলতি বছরের জুনে কম্বোডিয়ায় অভিযান চালিয়ে ৫৮৩ জন বাংলাদেশিকে উদ্ধার করা হয়। এর আগে জানুয়ারিতে মিয়ানমার থেকে ৮ জন এবং ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে আরও ১৮ জন বাংলাদেশি দেশে ফেরেন। তাদেরও ভালো চাকরির প্রলোভনে নিয়ে গিয়ে সাইবার প্রতারণায় বাধ্য করা হয়েছিল।

এমন পরিস্থিতিতে গতকাল পালিত হয়েছে ‘আন্তর্জাতিক মানব পাচারবিরোধী দিবস’। ২০১৩ সালের ১৮ই ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ৩০শে জুলাইকে এই দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এবারের প্রতিপাদ্য ছিল- ‘প্রতারণার ফাঁদে বন্দি’।
ব্র্যাক’র সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান মানবজমিনকে বলেন, সাইবার স্ক্যাম এখন মানব পাচারের সবচেয়ে ভয়াবহ রূপে পরিণত হয়েছে। তাই বিদেশে যাওয়ার আগে চাকরি, নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান এবং ভিসার সত্যতা সরকারি মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি।

লিবিয়ায় নির্যাতন, রাশিয়ার যুদ্ধ, নারী ও রোহিঙ্গা পাচার: ২০০৯ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সেন্ট্রাল মেডিটেরেনিয়ান রুট ব্যবহার করে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার বাংলাদেশি ইউরোপে প্রবেশ করেছেন। গত ছয় বছরে প্রায় ১৫ হাজার বাংলাদেশিকে লিবিয়া থেকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
ব্র্যাক’র গবেষণা অনুযায়ী, ৯৩ শতাংশ ক্যাম্পে বন্দি ছিলেন, ৭৯ শতাংশ শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং ৬৯ শতাংশ চলাফেরার স্বাধীনতা হারিয়েছেন।

অন্যদিকে কাজের প্রলোভনে রাশিয়ায় নিয়ে গিয়ে ইউক্রেন যুদ্ধে মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করার অভিযোগও উঠেছে। নিরাপত্তারক্ষী, ওয়েল্ডার বা নির্মাণশ্রমিকের চাকরির কথা বলে ৮ থেকে ১২ লাখ টাকা নিয়ে অনেক বাংলাদেশিকে রাশিয়ায় পাঠানো হচ্ছে। সেখানে রুশ ভাষার নথিতে স্বাক্ষর করিয়ে সামরিক প্রশিক্ষণের পর যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার তদন্তেও এমন তথ্য উঠে এসেছে।

এদিকে দুবাই, মালয়েশিয়া, সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে নারী পাচারের ঘটনাও উদ্বেগজনক। গৃহকর্মী, বিউটি পার্লার বা পরিচ্ছন্নতাকর্মীর চাকরির কথা বলে অনেক নারীকে নাইটক্লাব ও যৌন শোষণের চক্রে ঠেলে দেয়া হচ্ছে।
ছোটবেলায় বাবা-মা’কে হারান পটুয়াখালীর লিজা আক্তার। বিয়ের পর স্বামী তাকে ছেড়ে চলে যান। দুই সন্তানের ভবিষ্যতের আশায় প্রায় দুই বছর আগে তিনি সৌদি আরবে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে চারবার হাতবদল ও অমানবিক নির্যাতনের শিকার হন। ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় এ বছরের ৯ই ফেব্রুয়ারি দেশে ফিরে আসেন তিনি। এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন তাকে ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামে পাঠায়। সমপ্রতি তিনি একটি সন্তানের জন্ম দিয়েছেন। সেই সন্তানের ভবিষ্যৎ ও নিজের জীবন নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে লিজার।

দিলরুবা আক্তার নামে এক ভুক্তভোগী জানান, গৃহকর্মীর কাজের প্রলোভনে সংযুক্ত আরব আমিরাতে গিয়ে তিনি মানব পাচারের শিকার হন। সেখানে তাকে একটি ক্লাবে আটকে রেখে জোরপূর্বক যৌনপেশায় যুক্ত করা হয়। আট মাস ধরে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হলেও তিনি কোনো বেতন পাননি। পরে কৌশলে সেখান থেকে বের হতে পারলেও মিথ্যা অভিযোগে তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেয়া হয়।

নারায়ণগঞ্জের বিধবা সাহারা বেগম তার ১৭ বছর বয়সী মেয়ে জান্নাতকে দুবাইয়ে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজের প্রলোভনে বিদেশে পাঠান। সেখানে গিয়ে জান্নাত নির্যাতন ও জোরপূর্বক শোষণের শিকার হয়। মেয়ের ফোন পেয়ে সাহারা বেগম থানায় অভিযোগ করেন এবং পরে ব্র্যাক মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারের সহায়তা নেন। র‌্যাব অভিযুক্ত দালালদের গ্রেপ্তার করলেও নানা চাপের কারণে মামলাটি জটিল হয়ে পড়ে। বর্তমানে আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে এবং জান্নাত ন্যায়ের প্রত্যাশায় লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।

নোয়াখালীর পহেলী আক্তার পরিবারের আর্থিক সংকট দূর করার আশায় বিদেশে কাজ করতে যান। তাকে দুবাইয়ের একটি বিউটি পার্লারে চাকরির প্রলোভন দেখানো হয়েছিল। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর তার পাসপোর্ট ও মোবাইল ফোন কেড়ে নেয়া হয় এবং তাকে নাইটক্লাবে কাজ করতে বাধ্য করা হয়। অমানবিক নির্যাতনের মধ্যে প্রায় নয় মাস বন্দিদশায় থাকার পর পরিবারের উদ্যোগে ব্র্যাকের সহায়তায় তিনি দেশে ফিরতে সক্ষম হন। দেশে ফিরে পাচারকারীদের বিরুদ্ধে মানব পাচার আইনে মামলা করলে পুলিশ দুইজনকে গ্রেপ্তার করে। মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে।

মামলা বাড়ছে, বিচার মিলছে না: ২০০৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সাড়ে ১০ লাখের বেশি বাংলাদেশি বিভিন্ন দেশ থেকে ডিপোর্টি হিসেবে দেশে ফিরেছেন। কিন্তু মানব পাচারের সঠিক পরিসংখ্যান এখনো নেই।
২০২৬ সালের মে পর্যন্ত মানব পাচার সংক্রান্ত ৫ হাজার ২৮৪টি মামলা ঝুলে আছে। চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে ৫০০টির বেশি নতুন মামলা হলেও নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ১৭টি। অধিকাংশ মামলায় বিচার শেষ হচ্ছে না, অনেক আসামি খালাস পেয়ে যাচ্ছেন।
এ পরিস্থিতিতে সরকার ‘মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইন-২০২৬’ প্রণয়ন করেছে। নতুন আইনে অভিবাসী চোরাচালানকেও আইনের আওতায় আনা হয়েছে এবং মানব পাচারের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়েছে।

ব্র্যাক’র সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান মানবজমিনকে বলেন, শুধু আইন করলেই হবে না। প্রযুক্তিনির্ভর মানব পাচার মোকাবিলায় কার্যকর বাস্তবায়ন, মূল হোতাদের বিচার, সম্পদ বাজেয়াপ্ত, মানব পাচারপ্রবণ জেলাগুলোতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং সর্বোপরি সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছাই পারে এই ভয়াবহ অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনতে।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক বলেন, অবৈধভাবে প্রতারণার চক্র হিসেবে যারা কাজ করছেন তারা ভালো হয়ে যান। প্রত্যেককে ডিবি পুলিশ বিভিন্ন এজেন্সি নজরদারি করছে। রেহাই পাওয়ার সুযোগ নাই। সুতরাং আপনারা যদি এখনও এগুলো বন্ধ না করেন তাহলে আপনাদের কপালে শনির দশা আছে।