রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরাপত্তার প্রধান দায়িত্ব পুলিশের হাতে। আর পুলিশ বাহিনীর অন্যতম গুরুত্বপূণ পদ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি)। তিনি একটি থানার প্রধান কর্তাব্যক্তি। ওই থানা এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের প্রধান দায়িত্ব তার হাতে ন্যস্ত থাকে। সেই থানার ওসি যদি নিজেই চুরির সঙ্গে জড়িত থাকেন, তাহলে সমাজ থেকে অপরাধ দূর হবে কেমনে—সে প্রশ্ন উঠেছে।
এমন এক ঘটনা ঘটেছে সিলেট মহানগর পুলিশের (এসএমপি) মোগলাবাজার থানার ওসি মো. মনির হোসেনের ক্ষেত্রে। এই ‘গুণধর’ ওসির বিরুদ্ধে জব্দকৃত চোরাচালানের কম্বল সংখ্যায় কম দেখিয়ে আত্মসাৎ করার অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া তিনি কম্বলের গুণগত মান গোপন এবং আসামিদের সুবিধার্থে তদন্ত কর্মকর্তাকে প্রভাবিত করে আদালতে মিথ্যা তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছেন। একাধিক মামলার নথিপত্র বিশ্লেষণ, এসএমপি কমিশনারের চিঠি এবং সংশ্লিষ্ট বেশ কয়েকটি সূত্র থেকে বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে কালবেলা।
কম্বল আত্মসাতের ঘটনায় এসএমপি কমিশনার মোগলাবাজার থানার সাবেক পরিদর্শক (তদন্ত) কাজী তোবারক হোসেনকে কৈফিয়ত তলব (শোকজ) করে একটি চিঠি দিয়েছেন। সেই চিঠিতে ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। চিঠিটি এসেছে কালবেলার হাতে। এ ছাড়া থানার কয়েকজন পুলিশ সদস্যের বক্তব্য, চুরির সময়ের ছবি এবং নানা বিশ্লেষণেও বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে
কমিশনারের চিঠি সূত্রে জানা গেছে, ঘটনাটি শুরু হয় মোগলাবাজার থানার একটি চোরাচালানবিরোধী অভিযানকে কেন্দ্র করে (মামলা নং: জিআর-০৫/২৬)। ওই অভিযানে একটি কাভার্ডভ্যান থেকে ৫৬০ পিস দ্বিস্তরবিশিষ্ট (ডাবল পার্ট) দামি ভারতীয় কম্বল জব্দ করা হয়। তবে মোগলাবাজার থানার ওসি মনির হোসেনের নির্দেশে মামলার মূল এজাহারকারী একজন উপপরিদর্শক (এসআই) প্রকৃত সংখ্যা ও গুণগত মান গোপন করেন। তিনি ৫৬০ পিসের বদলে এজাহারে মাত্র ৪৩০ পিস কম্বল জব্দ তালিকায় দেখান। এ ছাড়া কম্বলগুলো সিঙ্গেল পার্ট, নাকি ডাবল পার্ট— তার কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা জব্দ তালিকায় উল্লেখ করা হয়নি।
তদন্তে দেখা যায়, এর আগে সিলেট শাহপরান থানার অপর একটি মামলায় (জিআর-২৬৫/২৫) মো. কামরুল হাসান নামে এক ব্যক্তি আদালত থেকে নিলামে ৬৫৮ পিস এক স্তরবিশিষ্ট (সিঙ্গেল পার্ট) পাতলা কম্বল ক্রয় করেন। পরে কামরুল হাসানের কাছ থেকে আরমান হুদা নামে এক ব্যবসায়ী ২২৮ পিস এবং মো. সেলিম আহমদ নামে এক ব্যক্তি ৪৩০ পিস কম্বল কিনে নেন। পরবর্তী সময়ে আসামি ও চোরাকারবারিদের সুবিধা পাইয়ে দিতে মোগলাবাজার থানার পুলিশ কর্মকর্তারা জিম্মানামার নতুন নাটক সাজান। মো. সেলিম আহমদ আদালতে আবেদন করেন, মোগলাবাজার থানায় আটক ৪৩০ পিস কম্বল আসলে শাহপরান থানার মামলা থেকে তার কেনা নিলামের কম্বল। ওসির পরিকল্পনা ছিল—আদালতের মাধ্যমে কম্বলগুলো সেলিম আহমদের জিম্মায় দিয়ে দামি ডাবল পার্টের কম্বলগুলো নামমাত্র মূল্যে বের করে নেওয়া এবং এজাহারে গোপন রাখা অতিরিক্ত ১৩০ পিস কম্বল নিজেরা আত্মসাৎ করা।
দ্বিতীয় তদন্ত কর্মকর্তা ও আদালতে মিথ্যা প্রতিবেদন: মামলাটির প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তনের পর পরিদর্শক (তদন্ত) কাজী তোবারক হোসেন দ্বিতীয় তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পান। তবে তিনি নিরপেক্ষ তদন্ত না করে পূর্ববর্তী কর্মকর্তাদের দুর্নীতির ধারা বজায় রাখেন। আদালত আলামতের প্রকৃত মালিকানা যাচাইয়ের নির্দেশ দিলে কাজী তোবারক হোসেন সরেজমিন থানায় রক্ষিত কাভার্ডভ্যানের কম্বল গণনা বা পরীক্ষা না করেই চলতি বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি আদালতে একটি মনগড়া প্রতিবেদন দাখিল করেন। প্রতিবেদনে তিনি নিলামগ্রহীতা ও ক্রেতাদের ভুয়া কাগজপত্রের বর্ণনা দিয়ে আলামতগুলোকে শাহপরান থানার নিলামকৃত কম্বল হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন।
তদন্ত কর্মকর্তার দাখিল করা প্রতিবেদনের সঙ্গে মামলার এজাহারের বক্তব্য পরস্পরবিরোধী ও সন্দেহজনক প্রতীয়মান হয়। প্রতিবেদনে বড় ধরনের জালিয়াতি ধরা পড়ায় আদালত নতুন করে কম্বল গণনা ও গুণগত মান যাচাইয়ের উদ্যোগ নেন এবং ২৩ ফেব্রুয়ারি একটি বিশেষ তদন্ত কমিটি গঠন করে দেন।
আদালতের নাজির আজাদ মিয়ার নেতৃত্বে বেঞ্চ সহকারী মিজানুর রহমান, অফিস সহকারী কামরুল ইসলাম ও জিআরএ শাখার উপপরিদর্শকসহ তদন্ত দল মোগলাবাজার থানা কম্পাউন্ডে প্রবেশ করেন। সেখানে তালাবদ্ধ সিলগালা করা নীল ও হলুদ রঙের কাভার্ডভ্যানে (রেজি. নং: ঢাকা-মেট্রো-টি-১৮২৬২৯) তল্লাশি চালিয়ে ৫৬০ পিস দ্বিস্তর বিশিষ্ট দামি কম্বল গণনা করে পান। উদ্ধারকৃত কম্বলগুলো ‘নিউ জান্নাত, এনরোস চেরি, জিন্দাল ব্ল্যাংকেটস কিং, রয়েল গোল্ড ও গোল্ড’ ব্র্যান্ডের প্যাকেটে রক্ষিত ছিল।
ওই ঘটনার পর ৯ মার্চ তোবারক হোসেনকে সশরীরে আদালতে হাজির হয়ে কৈফিয়ত দিতে বলা হয়। শুনানি চলাকালে বিচারক তদন্ত কর্মকর্তা তোবারক হোসেনকে জিজ্ঞাসা করেন—তিনি নিজে আলামত সরেজমিন যাচাই করেছেন কি না। জবাবে তোবারক হোসেন স্বীকার করেন, তিনি নিজে আলামত দেখেননি; জনৈক ব্যক্তির কথায় বিশ্বাস করে প্রতিবেদন দিয়েছেন। পরে তিনি নিজের অপরাধ স্বীকার করে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করেন। কিন্তু আদালত তার অপেশাদার ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য ক্ষমা নামঞ্জুর করে তার বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়ে এসএমপি কমিশনার বরাবর চিঠি পাঠান।
পরে এসএমপি কমিশনার তোবারকের বিরুদ্ধে একটি কৈফিয়ত তলবনামা পাঠান। সেখানে উল্লেখ করা হয়, ‘একজন প্রথম শ্রেণির দায়িত্বশীল কর্মকর্তা হয়েও তোবারক হোসেনের এই বেআইনি কার্যক্রম ও চোরাকারবারিদের সহায়তা করার প্রবণতা বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তি জনসমক্ষে ও আদালতের সামনে চরমভাবে ক্ষুণ্ন করেছে। তার এই কর্মকাণ্ড শৃঙ্খলা পরিপন্থি, অপেশাদারিত্ব, অদক্ষতা, নৈতিক স্খলন, গাফিলতি ও চরম অসদাচরণের শামিল।’
এই তলবনামার জবাব পর্যালোচনা শেষে অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত প্রশাসনিক বা আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে দপ্তর সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে। কিন্তু ঘটনার যিনি প্রকৃত নায়ক, সেই ওসি মনির হোসেনের বিরুদ্ধে এখনো কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
কালবেলার হাতে আসা কয়েকটি ছবিতে দেখা যায়, ওসি মনিরের সাবেক গাড়িচালক কনস্টেবল মো. শাখাওয়াত হোসেন জব্দ করা গাড়ি থেকে কম্বল বের করে সরিয়ে নিচ্ছেন। জব্দ করা কাভার্ডভ্যান থেকে বিভিন্ন রঙের বেশ কিছু কম্বল নামিয়ে নিচে রেখেছেন। জানতে চাইলে শাখাওয়াত কালবেলাকে বলেন, ‘ভাই, আমি ওই ঘটনার পর চাকরি ছেড়ে দিয়েছি। আমি এখন ওই বিষয়ে কথা বলতে অপারগ।’
জানা গেছে, ওসি মনির ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে সিলেটের সিলেট শাহপরান থানার ওসি ছিলেন। ওই সময় তার বিরুদ্ধে জব্দ করা মাল চুরির অভিযোগ ওঠে। এই অভিযোগে তাকে শাহপরান থানা থেকে ক্লোজ করা হয়।
সব অভিযোগ অস্বীকার করে মোগলাবাজার থানার ওসি মনির হোসেন কালবেলাকে বলেন, ‘কোনো কম্বল চুরি হয়নি। তদন্ত কর্মকর্তা গণনায় ভুল করেছিল। সব কম্বল থানা হেফাজতে ছিল। পরে তা আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে।’
এসএমপি কমিশনারের একটি চিঠিতে বেশ কয়েকবার লেখা হয়েছে ওসির মদদে ও নির্দেশে কম্বল চুরি হয়েছে, কমিশনার কেন এটা লিখবেন—এমন প্রশ্নে ওসি মনির বলেন, ‘কেউ কারও বিরুদ্ধে লিখলে তো আর কম লিখে না। তাই তিনি লিখেছেন।’
এসএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. এনামুল হক কালবেলাকে বলেন, ‘আমি ওর (ওসি মনির) সঙ্গে কথা বলব। বিষয়টি খতিয়ে দেখব। পুলিশের কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ এলে পুঙ্খানাপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখা হয়। তদন্তে প্রমাণ পাওয়া গেলে তার (ওসি) বিরুদ্ধে প্রথমে বিভাগীয় ব্যবস্থা, পরে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী নাদিম মাহমুদ কালবেলাকে বলেন, ‘ওসির কম্বল চুরির অভিযোগ যদি সত্য হয়, তবে তা নিছক একটি অনিয়ম নয়; এটি ক্ষমতার অপব্যবহার, নৈতিক দেউলিয়াপনা এবং রাষ্ট্রীয় পদের চরম অবমাননার শামিল। জনগণের নিরাপত্তা ও আস্থার প্রতীক হওয়ার কথা যার, তার বিরুদ্ধেই এ ধরনের অভিযোগ ওঠা পুরো পুলিশ প্রশাসনের ভাবমূর্তিকে কলঙ্কিত করে এবং স্পষ্ট করে যে, কিছু কর্মকর্তা দায়িত্ব পালনের বদলে সুবিধাভোগে বেশি আগ্রহী। এ ধরনের কাজের বিরুদ্ধে কেবল তীব্র নিন্দাই যথেষ্ট নয়, দৃষ্টান্তমূলক বিভাগীয় শাস্তি ও আইনগত ব্যবস্থা জরুরি, যাতে ভবিষ্যতে কেউ সরকারি ক্ষমতাকে ব্যক্তিগত লোভের হাতিয়ার বানাতে না পারে।’ টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান কালবেলাকে বলেন, ‘বাংলাদেশে পুলিশ সাধারণত ক্ষমতার অপব্যবহার করে। তবে এখানে জ্বালিয়াতির মাধ্যমে কম্বল আত্মসাতের যে বিষয়টি ঘটেছে, সেটি অত্যন্ত নিম্নমানের দুর্নীতি। তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থার পাশাপাশি জালিয়াতি, আত্মসাৎ, দুর্নীতির মামলা করে যথোপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।’