নরসিংদীর রায়পুরায় একই নাম ও একই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শনাক্তকরণ নম্বর (ইআইআইএন) ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে পরিচালিত হচ্ছে দুটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়। একই পরিচয়ে দুটি প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হওয়ায় শিক্ষা কার্যক্রম, বোর্ডের তথ্য, সরকারি কার্যক্রম, শিক্ষার্থীদের নিবন্ধন ও বিভিন্ন নথিপত্রে বারবার জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে। এতে বিপাকে পড়েছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা।
সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার মুছাপুর ইউনিয়নের গৌরীপুরে কোহিনুর জুট মিলস হাইস্কুলটি অবস্থিত। একটি চারতলা ভবন এবং আরেকটি টিনশেডের ভবনে শতাধিক শিক্ষার্থী নিয়ে বিদ্যালয়টিতে নিয়মিত পাঠদান চলছে। অন্যদিকে মহেশপুর ইউনিয়নের ঘাগটিয়া এলাকাতেও কোহিনুর জুট মিলস হাইস্কুল নামে আরেকটি স্কুল পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটিতে দোচালা টিনের তিনটি কক্ষে পাঠদান চলে।
অভিযোগ রয়েছে, ঘাগটিয়ায় অবস্থিত বিদ্যালয়টিতে কাগজে-কলমে শিক্ষার্থী থাকলেও বাস্তবে নিয়মিত পাঠদান হয় না। ১৪ জুলাই ক্লাস চলাকালে বিদ্যালয়টিতে গিয়ে একটি শ্রেণিকক্ষে মাত্র দুই শিক্ষার্থীকে পাওয়া যায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দুই বিদ্যালয়ের জন্য মোট আটজন এমপিওভুক্ত শিক্ষকের তথ্য থাকলেও তাঁদের মধ্যে সাতজনই ঘাগটিয়ার বিদ্যালয়টিতে কর্মরত। সেখানে নিয়মিত শ্রেণি কার্যক্রম না চালিয়েই তাঁরা সরকারি বেতন-ভাতা গ্রহণ করছেন। অন্যদিকে গৌরীপুরের কোহিনুর জুট মিলস হাইস্কুলে রয়েছেন মাত্র একজন এমপিওভুক্ত শিক্ষক। তিনি প্রায় দেড় বছর ধরে বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না। একই সঙ্গে বিদ্যালয়ের শতাধিক শিক্ষার্থী উপবৃত্তি থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।
জানা গেছে, ১৯৮১ সালে গৌরীপুর গ্রামে প্রতিষ্ঠিত হয় কোহিনুর জুট মিলস হাইস্কুল। ২০০৫ সালে অভ্যন্তরীণ বিরোধের জেরে দুই শিক্ষক মো. আতিকুর রহমান ও আহসান হাবিবকে বহিষ্কার করা হয়। পরে আদালতের মাধ্যমে তাঁরা বিদ্যালয়ে স্বপদে পুনর্বহাল হন। এরপর ২০০৬ সালে ঘাগটিয়া এলাকায় একই নাম ও একই ইআইআইএন নম্বর ব্যবহার করে কোহিনুর জুট মিলস হাইস্কুল (ঘাগটিয়া) নামে আরেকটি বিদ্যালয় চালু করেন তাঁরা। তখন থেকেই একই পরিচয়ে দুটি বিদ্যালয়ের কার্যক্রম চলতে থাকে। এ নিয়ে স্থানীয়রা একাধিকবার মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচিও পালন করেছেন।
ঘাগটিয়া শাখার প্রধান শিক্ষক মো. আতিকুর রহমানের দাবি, আদালতের নির্দেশনা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন অনুযায়ীই তাঁর বিদ্যালয় পরিচালিত হচ্ছে। তিনি বলেন, ২০০৬ সালের শেষ দিকে তৎকালীন প্রধান শিক্ষক আবু মোহাম্মদের উদ্যোগে বিদ্যালয়টি ঘাগটিয়ায় স্থানান্তর করা হয়। ২০০৭ সাল থেকে তিনি ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করে আসছেন এবং পরে আদালতের রায়ের ভিত্তিতে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
গৌরীপুর কোহিনূর জুটমিল হাইস্কুলের শিক্ষক মো. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘গৌরীপুরের বিদ্যালয়টি মূল ক্যাম্পাস, আর ঘাগটিয়া শাখাটি অস্থায়ী ক্যাম্পাস। বর্তমানে মূল ক্যাম্পাসে আমি এমপিওভুক্ত শিক্ষক রয়েছি। দীর্ঘদিন ধরে বেতন পাচ্ছি না। সর্বশেষ আরও দুজন শিক্ষক ঘাগটিয়া শাখায় চলে গেছেন। সেখানে বসেই তাঁরা সরকারি বেতন-ভাতা নিচ্ছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘মূল ক্যাম্পাসে বর্তমানে প্রায় ৩৫০ শিক্ষার্থী রয়েছে। মাত্র পাঁচজন খণ্ডকালীন শিক্ষক দিয়ে অত্যন্ত কষ্টের মধ্যে নিয়মিত পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছি। দীর্ঘদিন ধরে মূল ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীরা উপবৃত্তিসহ বিভিন্ন সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকেও বঞ্চিত রয়েছে।’
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. সামালগীর আলম বলেন, গৌরীপুরের কোহিনুর জুট মিলস হাইস্কুলই মূল প্রতিষ্ঠান। তবে আদালতের আদেশের ভিত্তিতে ঘাগটিয়ায়ও একই নামে বিদ্যালয় পরিচালিত হচ্ছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাসুদ রানা বলেন, বিষয়টি তদন্তে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর তা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়।
নরসিংদী-৫ আসনের সংসদ সদস্য প্রকৌশলী আশরাফ উদ্দিন বকুল বলেন, এটি একটি গুরুতর অনিয়ম। দুই ভাই মিলে যে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছেন, সেটির কোনো বৈধতা নেই। প্রতিষ্ঠানটিকে মূল অবস্থানে ফিরে যেতে হবে। আদালতের রায় থাকলেও সেখানে বাস্তবে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম পরিচালিত হয় না।