দেশের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় আস্থা হারাচ্ছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। ফলে প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থায় দিন দিন কমছে শিক্ষার্থীর সংখ্যা। মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ২০ লাখ ৭১ হাজার। এসএসসিতে পরীক্ষার্থী কমেছে ১ লাখ ৮১ হাজার। এইচএসসিসহ কারিগরি বোর্ডের এসএসসি ও এইচএসসিতে (ভোকেশনাল) একই অবস্থা। অন্যদিকে দাখিল ও আলিম মাদ্রাসাগুলোয় বেড়েছে শিক্ষার্থী সংখ্যা। তবে সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী বাড়ছে কওমি মাদ্রাসাগুলোয়।
দেশের কওমি মাদ্রাসা ও শিক্ষা বোর্ডগুলো নানা কারণে তাদের শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রকাশ্যে আনতে চায় না। তারপরও কওমির সবচেয়ে বড় শিক্ষা বোর্ড বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের তথ্যমতে, তাদের কেন্দ্রীয় পরীক্ষাতেই পাঁচ বছরে পরীক্ষার্থী বেড়েছে প্রায় ১ লাখ ৬৪ হাজার। এ বোর্ডেই মাদ্রাসার সংখ্যা বেড়েছে ১৫ হাজার। শিক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, শিক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি, প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার নানা সংকট এবং ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার প্রতি আগ্রহের কারণে অভিভাবকদের একটি অংশ সন্তানদের মাদ্রাসায় পাঠাচ্ছেন। তবে বিষয়টি উদ্বেগজনক দাবি করে, প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় সংকট দূর করার পাশাপাশি এ বিষয়ে পরিকল্পনামাফিক কাজ করার তাগিদ তাদের।
এসএসসি-এইচএসসিতে কমছে শিক্ষার্থী, বাড়ছে দাখিল-আলিমে বিগত পাঁচ বছরের এসএসসি ও এইচএসসি সমমান পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, সাধারণ স্কুল-কলেজ ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধারাবাহিকভাবে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমলেও বেড়েছে মাদ্রাসায়। এর মধ্যে ৯টি সাধারণ বোর্ডে পাঁচ বছরে এসএসসি পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ১ লাখ ৮১ হাজার ৩১৩ জন, কারিগরিতে কমেছে ১৯ হাজার দুজন শিক্ষার্থী। বিপরীতে দাখিলে পরীক্ষার্থী বেড়েছে ৩৫ হাজার ৭৯১ জন। অন্যদিকে গত পাঁচ বছরের ব্যবধানে সাধারণ ৯ বোর্ডের অধীনে এইচএসসি ও আলিমে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কিছুটা বাড়লেও কমেছে কারিগরিতে। এ বাড়ার কারণ হলো করোনার সময় ২০২২ সালে পরীক্ষার্থী কম ছিল। তবে পরের বছর ২০২৩ থেকে ধারাবাহিকভাবে শিক্ষার্থী বাড়ার সঙ্গে কমেছে ঝরে পড়াও।
বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের তথ্যমতে, এসএসসি ২০২২ সালে ১৫ লাখ ৯৯ হাজার ৭১১ জন, ২০২৩ সালে ১৬ লাখ ৪৯ হাজার ২৭৫ জন, ২০২৪ সালে ১৬ লাখ ৬ হাজার ৮৭৯ জন, ২০২৫ সালে ১৪ লাখ ৭৯ হাজার ৩১০ জন এবং ২০২৬ সালে ১৪ লাখ ১৮ হাজার ৩৯৮ শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়। আর কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এসএসসিতে ২০২২ সালে ১ লাখ ৫৩ হাজার ৬৬২ জন, ২০২৩ সালে ১ লাখ ২৭ হাজার ৭৬৭ জন, ২০২৪ সালে ১ লাখ ২৬ হাজার ৩৭৩ জন, ২০২৫ সালে ১ লাখ ৩৮ হাজার ২০৪ জন, আর ২০২৬ সালে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৬৬০ পরীক্ষার্থী অংশ নেয়। অন্যদিকে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে দাখিল পরীক্ষায় ২০২২ সালে ২ লাখ ৬৮ হাজার ৪৯৫ জন, ২০২৩ সালে ২ লাখ ৯৫ হাজার ১২১ জন, ২০২৪ সালে ২ লাখ ৪২ হাজার ৩১৪ জন, ২০২৫ সালে ১ লাখ ৯৫ হাজার ১১৫ জন এবং ২০২৬ সালে ৩ লাখ ৪ হাজার ২৮৬ শিক্ষার্থী অংশ নেয়।
অন্যদিকে ২০২২ সালে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল ৯ লাখ ৮৫ হাজার ৭১৩ জন শিক্ষার্থী। ওইসময় করোনা মহামারি থাকায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা কম ছিল। যদিও পরের বছর ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১১ লাখ ৮ হাজার ৫৯৪ জনে। এরপর ২০২৪ সালে ১১ লাখ ২৮ হাজার ২৮১ জন, ২০২৫ সালে ১০ লাখ ৫৫ হাজার ৩৯৮ জন ও ২০২৬ সালে ১০ লাখ ৬৯ হাজার ৭১৪ শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়। পাঁচ বছরের ব্যবধানে এইচএসসিতে ৮৩ হাজার একজন পরীক্ষার্থী বেড়েছে। তবে ২০২৩ সালের সঙ্গে তুলনা করলে চার বছরে পরীক্ষার্থী কমেছে ৩৮ হাজার ৮৮০ জন।
এ ছাড়া ২০২২ সালে ৯৪ হাজার ৭৬৩ জন, ২০২৩ সালে ৯৮ হাজার ৩১ জন, ২০২৪ সালে ৮৮ হাজার ৭৬ জন, ২০২৫ সালে ৮৬ হাজার ১০২ জন ও ২০২৬ সালে ৯২ হাজার ৯০৫ পরীক্ষার্থী আলিম পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল। পাঁচ বছরে এ স্তরে পরীক্ষার্থী কমেছে ১ হাজার ৮৫৮ জন।
আর কারিগরি বোর্ডের অধীনে এইচএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষায় ২০২২ সালে ১ লাখ ২২ হাজার ৯৩১ জন, ২০২৩ সালে ১ লাখ ৫২ হাজার ৭১৭ জন, ২০২৪ সালে ২ লাখ ৩৪ হাজার ৪৩৩ জন, ২০২৫ সালে ১ লাখ ৯ হাজার ৬১১ এবং ২০২৬ সালে ১ লাখ ৭ হাজার ৯৬৪ পরীক্ষার্থী অংশ নেয়। এ স্তরেও ১৪ হাজার ৯৬৭ পরীক্ষার্থী পাঁচ বছরে কমেছে।
এ প্রসঙ্গে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা বোর্ডের চেয়ারম্যান সৈয়দ আক্তারুজ্জামান কালবেলাকে বলেন, শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া নিয়ে আমরা কাজ শুরু করেছি। কেন শিক্ষার্থী কমছে, তার প্রকৃত তথ্য দেওয়ার জন্য সব বোর্ডকে চিঠি দিয়েছি। তাদের জবাব পাওয়ার পর প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করার পাশাপাশি সংকট সমাধানে কাজ করব।
৫ বছরে সরকারি প্রাথমিকে শিক্ষার্থী কমেছে ২০ লাখ ৭১ হাজার প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ১ কোটি ১৯ লাখ ৯৫ হাজার ২২২ জনে। ২০২৩ সালে এ সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে ১ কোটি ৯ লাখ ৮৫ হাজার ৮১৫ জনে নেমে আসে। ২০২৪ সালে তা আরও কমে দাঁড়ায় ১ কোটি ৬ লাখ ১৭ হাজার ৯৬২ জনে। ২০২৫ সালে ১ কোটি ৬ লাখ ৯ হাজার ৫২ জন এবং সর্বশেষ ২০২৬ সালে তা কমে ৯৯ লাখ ২৩ হাজার ৮২২ জনে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ, পাঁচ বছরের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ২০ লাখ ৭১ হাজার ৪০০ জন।
যদিও কিন্ডার গার্টেন স্কুলে শিক্ষার্থী সংখ্যা কিছুটা বাড়ছে। ২০২২ সালে কেজিতে শিক্ষার্থী ছিল ৩৪ লাখ ৭৩ হাজার ৬১৯ জন, যা ২০২৩ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৩৬ লাখ ৭৫ হাজার ৯৫৫ জনে। ২০২৪ সালে তা আরও বৃদ্ধি পেয়ে ৩৭ লাখ ৬০ হাজার ৬৯৩ জন এবং ২০২৫ সালে বড় লাফ দিয়ে দাঁড়ায় ৫৮ লাখ ১৮ হাজার ১৮৩ জনে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট ৬৫ হাজার ৫৬৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৩ লাখ ৮০ হাজার ৪৩৫ জন শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কমে যাওয়া প্রসঙ্গে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহীনা ফেরদৌসী কালবেলাকে বলেন, কেন শিক্ষার্থী কমছে, তা যাচাই করার জন্য বিভিন্ন গবেষণা ও মনিটরিং করা হচ্ছে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাড়ানোর জন্য কারিকুলাম সংশোধন করার পাশাপাশি মিড ডে মিল চালু হয়েছে, শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে ড্রেস দেওয়াসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হচ্ছে। নিয়মিত সমাবেশসহ নানা সভা-সমাবেশ করে অভিভাবকদের সন্তানদের স্কুলে পাঠানোর জন্য উৎসাহিত করা হচ্ছে। শিক্ষার মান বাড়ানোর জন্যও নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আশা করছি আগামী বছর থেকে শিক্ষার্থী বাড়বে। ৫ বছরে কওমির এক বোর্ডে শিক্ষার্থী বেড়েছে ১ লাখ ৬৪ হাজার, মাদ্রাসা ১৫ হাজার বাংলাদেশে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক শিক্ষা বোর্ডের সংখ্যা ছয়টি। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় বোর্ড বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ (বেফাক)। দেশের ৮০ ভাগ মাদ্রাসার কেন্দ্রীয় পরীক্ষাই নেওয়া হয় এ বোর্ডের অধীনে। এর বাইরে পাঁচটি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে অঞ্চলভিত্তিক পরীক্ষা হলেও কৌশলগত কারণে মোট কতগুলো মাদ্রাসা এবং শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়, তা প্রকাশ করা হয় না। ফলে বেফাক ও সিলেটের জাতীয় দ্বীনি মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড বাংলাদেশ ছাড়া বাকি বোর্ডগুলোর ফল সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। কালবেলার পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলেও বোর্ড সংশ্লিষ্টরা শিক্ষার্থী ও মাদ্রাসা সংখ্যা বাড়ার কথা জানালেও তথ্য দিতে রাজি হননি।
বেফাক ছাড়া বাকি বোর্ডগুলো হলো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বেফাকুল মাদারিসিল কওমিয়া গওহরডাঙ্গা বাংলাদেশ, চট্টগ্রামভিত্তিক আঞ্জুমানে ইত্তেহাদুল মাদারিস বাংলাদেশ, সিলেটের আযাদ দ্বীনী এদারায়ে তালীম বাংলাদেশ, উত্তরবঙ্গের তানযিমুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ এবং ঢাকার জাতীয় দ্বীনি মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড বাংলাদেশ। কওমি মাদ্রাসার একাধিক নীতিনির্ধারক বলেন, কওমি মাদ্রাসার প্রতি বিদেশি সংস্থা ও দেশের অনেকের অ্যালার্জি রয়েছে। তারা কওমি মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী বাড়াকে ইতিবাচকভাবে নেন না। তাই কৌশলগত কারণে তা প্রকাশ করা হয় না।
বেফাক সূত্র জানায়, এই বোর্ডের অধীনে ফযিলত (স্নাতক), সানাবিয়া’উলয়া (উচ্চ মাধ্যমিক), মুতাওয়াসসিতাহ (নিম্ন মাধ্যমিক), ইবতিদাইয়্যাহ (প্রাইমারি) ও হিফযুল কোরআনের কেন্দ্রীয় পরীক্ষা নেওয়া হয়। ২০২২ সালে এ বোর্ডের কেন্দ্রীয় পরীক্ষায় ১৭ হাজার ৭১৪টি মাদ্রাসার ২ লাখ ৬১ হাজার ৫৯৩ পরীক্ষার্থী অংশ নেয়। এরপর ২০২৩ সালে ৩ লাখ ২৪ হাজার ৭৮০ জন, ২০২৪ সালে ৩ লাখ ৬৮হাজার ৩৭৪ জন, ২০২৫ সালে ৩ লাখ ৮৯ হাজার ৯৫২ জন এবং ২০২৬ সালে ৪ লাখ ২৫ হাজার ৪১৭ শিক্ষার্থী অংশ নেয়। শিক্ষার্থী বাড়ার পাশাপাশি ২০২৬ সালে মাদ্রাসার সংখ্যাও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২ হাজার ৪৮০টিতে। অর্থাৎ, পাঁচ বছরের ব্যবধানে বেফাকের কেন্দ্রীয় পরীক্ষায় অংশ নেওয়া মাদ্রাসা বেড়েছে ১৪ হাজার ৭৬৬টি, আর শিক্ষার্থী বেড়েছে ১ লাখ ৬৩ হাজার ৮২৪ জন। এসব প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর সংখ্যা আনুমানিক ৭০ লাখ।
একইভাবে সিলেট বিভাগের আযাদ দ্বীনী এদারায়ে তা’লীম বাংলাদেশের অধীনে পাঁচ বছরে মাদ্রাসা বেড়েছে ২৭২টি, আর কেন্দ্রীয় পরীক্ষার্থী বেড়েছে প্রায় ১০ হাজার। এই বোর্ডের অধীনে হিফয, ফযিলত, সানা. উলয়া/ সানা. (বানাত), সানা. আম্মাহ, মুতা., ইবতেদায়ি এবং নুরানি স্তরের কেন্দ্রীয় পরীক্ষা হয়। তথ্যমতে, ২০২৬ সালে কেন্দ্রীয় পরীক্ষায় অংশ নেন ১ হাজার ১৫০টি মাদ্রাসার ২৬ হাজার ৯৮৪ শিক্ষার্থী। ২০২৫ সালে অংশ নেন ২৪ হাজার ৪৬৫ জন, ২০২৩ সালে ৮৫৫টি মাদ্রাসার ২০ হাজার ৩৭৩ জন এবং ২০২২ সালে ৮৭৮টি মাদ্রাসার ১৬ হাজার ৯৫৭ শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়।
মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী বাড়া প্রসঙ্গে বেফাকের মহাপরিচালক মাওলানা উবায়দুর রহমান খান নদভী বলেন, ‘সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থায় ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধির কারণে অভিভাবকরা সন্তানদের কওমি মাদ্রাসায় পাঠাচ্ছেন। কওমি মাদ্রাসাগুলোয় বিনামূল্যে পড়াশোনার পাশাপাশি থাকা-খাওয়ায় পয়সা লাগে না। কোচিং ও বই-খাতা কেনার চাপ নেই। আবার নিম্ন আয় ও শ্রমজীবী মানুষদের কাজে যাওয়ার সময় সন্তানকে ডে কেয়ারে রাখার সামর্থ্য নেই। ফলে আবাসিক মাদ্রাসাগুলো ডে কেয়ারের ভূমিকা পালন করে।
শিক্ষা বিশ্লেষকরা যা বলছেন বেফাকের সহসভাপতি মাওলানা মোসলেহ উদ্দীন রাজু বলেন, আমাদের সুসংগঠিত শিক্ষাব্যবস্থার কারণে অভিভাবকদের আস্থা রয়েছে। একই সঙ্গে সিলেবাস আধুনিক করে ধর্মের পাশাপাশি বাংলা, ইংরেজি, গণিতসহ আধুনিক বিষয়গুলো যোগ করা হচ্ছে। এসব নানাবিধ কারণে মূলত শিক্ষার্থী বাড়ছে। শিক্ষার এই মান ধরে রাখার চেষ্টা আগামীতেও অব্যাহত থাকবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এভাবে এলেবেলে হওয়ার কথা ছিল না। নির্দিষ্ট মূল্যবোধের দিকে ধাবিত হওয়ার কথা ছিল। আমরা দেখি যখন যে সরকার ক্ষমতায় আসে, তারা তাদের মতো করে শিক্ষা নিয়ে কাজ করে। কিন্তু শিক্ষার রূপকল্প কেউ তৈরি করে না। যার কারণে শিক্ষায় কোনো কন্ট্রোল নেই। এই হচপচ অবস্থা থেকে উত্তরণে জন্য সবার আগে দরকার একটা শিক্ষা কমিশন। এর ওপর ভিত্তি করে একটা নীতি তৈরি করতে হবে। এই নীতিই বলবে আমাদের কত ধরনের স্কুল, মাদ্রাসা থাকবে। যেহেতু কিছুই নেই, তাই যে যার মতো চলছে।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদ কালবেলাকে বলেন, সধারাণ শিক্ষার প্রধান ধারা থেকে শিক্ষার্থী কমে গিয়ে কওমি মাদ্রাসা কিংবা অন্যান্য মাদ্রাসামুখী হওয়া খুবই উদ্বেগজনক বিষয়। কওমি মাদ্রাসায় লেখাপড়া করে শিক্ষার্থীরা আধুনিক অর্থনীতি কিংবা সমাজে ভূমিকা রাখতে পারবে কি না, সেটা একটা বড় প্রশ্ন। তবে রাজনৈতিক কারণে কেউ এটা নিয়ে বেশি আলোচনা করতে চায় না, তাহলে অনেক তর্ক-বিতর্কের সৃষ্টি হবে। আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের কথা চিন্তা করে একটা পর্যালোচনা করা দরকার।
তিনি বলেন, অর্থনৈতিক কারণেই মূলত কওমি মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী বাড়ছে। যদিও আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা অবৈতনিক বলা হয়; কিন্তু কোচিং প্রবণতাসহ শিক্ষা ব্যয় বাড়ায় প্রচুর টাকা খরচ করতে হয়। তাই অভিভাবকরা তার সন্তানকে মাদ্রাসায় পাঠাচ্ছেন। আমাদের শিক্ষার দিকে পরিকল্পিত নজর দেওয়া দরকার। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ কালবেলাকে বলেন, প্রাথমিক শিক্ষার মান বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের স্কুলমুখী করার জন্য নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে অভিভাবকরা তার সন্তানকে কোথায় পাঠাবেন, সেটা তার স্বাধীনতা। আগামীতে সব ধরনের মাদ্রাসাসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সরকারের নিয়ন্ত্রণে আনা হবে।