Image description

বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জের ১১৯ বছরের বৃদ্ধ আবুল হোসেন হাওলাদার। মুঠোফোনে আসা তাঁর বয়স্ক ভাতার ২০ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছে প্রতারক চক্র। বেশি টাকা পাইয়ে দেওয়ার টোপ দিয়ে পিন নম্বর নিয়ে বৃদ্ধের অ্যাকাউন্টটি খালি করে দেয় তারা। এমন প্রতারণার শিকার শুধু এই শতবর্ষী বৃদ্ধই নন; দেশজুড়ে আরও হাজারো অসহায়, বয়স্ক ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষ ডিজিটাল প্রতারণার ফাঁদে পড়ে ভাতার টাকা হারিয়েছেন।

দেশের বয়স্ক জনগোষ্ঠী, বিধবা নারী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্নদের জন্য প্রতি বছর বাজেটে সামাজিক সুরক্ষা খাতের অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়। কিন্তু অসহায় এসব মানুষের ভাতার টাকা কৌশলে হাতিয়ে নিচ্ছে একটি চক্র। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বেশি টাকা পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে তারা ওটিপি বা পিন নম্বর নিয়ে নিচ্ছে। এরপর খালি করে দিচ্ছে ভাতাভোগীদের অ্যাকাউন্ট। অন্যদিকে, ভাতা পাওয়ার জন্য আবেদন করেও অনেকে টাকা পাচ্ছেন না। এমন ভুক্তভোগীরা সরকারি ভাতার আশায় জনপ্রতিনিধিদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। আবার কেউ কেউ নিজের নামে মোবাইল সিম পরিবর্তন করার পর ভাতা তুলতে গিয়ে নতুন ভোগান্তিতে পড়ছেন। মাঠপর্যায়ে ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে এবং অনুসন্ধানের মাধ্যমে সম্প্রতি এসব তথ্য জানতে পেরেছে বাংলাদেশ প্রতিদিন।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের ৬১ লাখ মানুষ প্রতি মাসে ৬৫০ টাকা করে বয়স্ক ভাতা পাচ্ছেন। এ খাতে সরকারের মোট বরাদ্দ ৪ হাজার ৭৯১ কোটি ৩১ লাখ টাকা। একই অর্থবছরে ২৯ লাখ বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা নারী মাসে ৬৫০ টাকা করে ভাতা পাচ্ছেন, যার জন্য বরাদ্দ রয়েছে ২ হাজার ২৭৭ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। এ ছাড়া সাড়ে ৩৪ লাখ বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তি প্রতি মাসে পাচ্ছেন ৯০০ টাকা করে। প্রতিবন্ধী ভাতা খাতে চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ ৩ হাজার ৭৫২ কোটি ৮ লাখ টাকা।

তবে বর্তমান দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও মূল্যস্ফীতির চাপ বিবেচনা করে সরকার আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সামাজিক সুরক্ষার এ পরিধি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, ৯০ বছরের কম বয়সি, বয়স্ক এবং বিধবাদের মাসিক ভাতা ৫০ টাকা বাড়িয়ে ৭০০ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে যাদের বয়স ৯০ বছর বা তার বেশি, তারা প্রতি মাসে ১ হাজার টাকা করে ভাতা পাবেন। একইভাবে বিশেষ চাহিদাসম্পন্নদের ক্ষেত্রেও বিশেষ বিবেচনায় এ ভাতার পরিমাণ বাড়ানোর প্রস্তাব এসেছে।

সমাজসেবা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, অনেক বৃদ্ধ ভাতাভোগী নিজের নামে মোবাইল সিম না থাকায় ছেলে, পুত্রবধূ বা নাতি-নাতনিসহ অন্য আত্মীয়দের মোবাইল নম্বর ব্যবহার করতেন। ক্ষেত্রবিশেষে আত্মীয়রাই অসচ্ছল বৃদ্ধদের ভাতার টাকা আত্মসাৎ করতেন। স্বজনদের এই প্রতারণা এবং মাঠপর্যায়ের ভোগান্তি ঠেকাতে কঠোর নিয়ম করে সরকার। নতুন নিয়মে যার নামে ভাতা, টাকা শুধু তার নিজের নামের মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টেই পাঠানো হবে। এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, গত অর্থবছরের শেষ দিকে ভাতাভোগীদের নিজ নামে মোবাইল সিম বা অ্যাকাউন্ট চালুর বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়।

তবে নতুন নিয়মে মোবাইল নম্বর পরিবর্তন বা আপডেট করতে গিয়ে বর্তমানে অনেক অসহায় মানুষের কাছে সরকারি ভাতা আসা বন্ধ রয়েছে। মাঠপর্যায়ের তথ্যে জানা যায়, প্রতারক চক্র ভাতাভোগীদের মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করে। তাদের আরও বেশি অর্থ দেওয়া হবে-এ প্রলোভন দেখিয়ে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের পিন ও কোড নম্বর নিয়ে টাকা হাতিয়ে নেয়। এ বিষয়ে জেলা এবং উপজেলা সমাজসেবা অফিসে গেলে ভুক্তভোগীদের সিম পরিবর্তন করতে বলা হয়।  সমাজসেবা অধিদপ্তরের সামাজিক নিরাপত্তা অধিশাখার অতিরিক্ত পরিচালক শিলা রানী দাস বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সম্প্রতি ৫০টির মতো অভিযোগ পেয়েছি।

যারা ভাতা নেন তারাই প্রতারকদের পিন ও ওটিপি দিয়ে বিপদ ডেকে আনেন। আমরা স্থানীয় বৈঠকে ভাতাভোগীদের সচেতন করেছি। প্রচারণাও চালিয়েছি। তার পরও তারা প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। বাগেরহাটের রামপালের চাওয়াখালীর ১১৪ বছর বয়সি শারীরিক বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সাজিদ মোল্লা প্রতিবন্ধী ভাতা পান। ১০০ বছরের বেশি বয়স হওয়ায় তার নামে ২ লাখ টাকা বরাদ্দ হয়েছে- বলে প্রতারক চক্র পিন ও কোড নম্বর হাতিয়ে নেয়। এরপর এই অসহায়ের অ্যাকাউন্ট থেকে ২ মাসের ভাতা বাবদ প্রায় ২ হাজার টাকা উঠিয়ে নেওয়া হয়। ২০২৫ সালের নভেম্বরে এই ঘটনা ঘটে। পরে সাজিদ মোল্লা সিম পরিবর্তন করেন।

বগুড়ার সোনাতলা উপজেলার হুয়া কুয়া গ্রামের বাসিন্দা মৃত মোস্তা আকন্দের মেয়ে সালমা দেওয়া (৮০) জানান, আমার বাবা মারা গেছে। স্বামীও নাই। বয়স্ক ভাতা পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আমাকে দেওয়া হয়নি। মেম্বার-চেয়ারম্যানের কাছে ঘোরাঘুরি করেও পাইনি। তার অভিযোগ, যারা পেয়েছে সবাই টাকার বিনিময়ে পেয়েছে।

বগুড়া জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক বেগম মুস্তারী আকতার জাহান বলেন, সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে স্বচ্ছ ও দ্রুততার সঙ্গে ভাতার অর্থ পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। ডিজিটাল পদ্ধতিতে অর্থ বিতরণ হওয়ায় ভোগান্তি কমেছে এবং মধ্যস্বত্বভোগীর সুযোগও নেই।

গাইবান্ধা সদর উপজেলার পশ্চিমপাড়া এলাকার বৃদ্ধা জোহরা খাতুন (৭৫)। তিনি গত ৯ মাস ধরে বয়স্ক ভাতা পাচ্ছেন না। স্থানীয় সমাজ সেবা অফিসে যোগাযোগ করেও কাজ হচ্ছে না। জোহরা তার ছোট ছেলের মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বয়স্ক ভাতা পেয়ে আসছিলেন। পরে তিনি নিজের মোবাইল ফোন নম্বর পরিবর্তন করে উপজেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরকে জানান। এরপর ৯ মাস ধরে ভাতা পাচ্ছেন না জোহরা।