Image description

মেঘালয়ের কোলে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব সীমান্ত। দিগন্তজোড়া সবুজ পাহাড়, মাঝে মাঝে বয়ে চলা চঞ্চলা নদী আর বালুচরের সৌন্দর্য দেখতে দূর থেকে স্বর্গের মতো মনে হলেও স্থানীয় মানুষের জন্য এ সীমান্ত এলাকা যেন এক অন্তহীন দুর্ভোগের নাম। বছরের পর বছর ধরে পাহাড়ি ঢল, আকস্মিক বন্যা আর ভাঙা সেতু ও খেয়াঘাটের অনিশ্চয়তায় স্থবির হয়ে আছে এ অঞ্চলের বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। অবহেলিত এ উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অর্থনৈতিক ভাগ্য এবার আমূল বদলে যেতে চলেছে। নেত্রকোনা ও ময়মনসিংহের বুক চিড়ে যাওয়া কৌশলগত মহাসড়কের বিচ্ছিন্ন চারটি সংযোগ বিন্দুকে জোড়া দিতে এবং জরাজীর্ণ সোমেশ্বরী সেতুকে পুনর্নির্মাণ করতে অবশেষে বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে একটি মেগা প্রকল্প।

প্রায় ৩ হাজার ৬৭৭ কোটি টাকার এ প্রকল্পের মাধ্যমে নির্মাণ করা হবে পাঁচটি জলবায়ু সহনশীল সেতু। সূত্র জানায়, দেশের সীমান্ত এলাকায় যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে এবং অর্থনৈতিক করিডর সচল করতে ‘কনস্ট্রাকশন অব ফাইভ ক্লাইমেট রেজিলেন্ট ব্রিজেস ইন ময়মনসিংহ ডিভিশন অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকারের সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ। সম্প্রতি পরিকল্পনা বিভাগের একনেক সভায় এ প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। প্রকল্প ঋণ হিসেবে প্রায় ২ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকা দেবে ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক (আইডিবি)। বাংলাদেশ সরকার নিজস্ব তহবিল থেকে জোগান দেবে প্রায় ৯১২ কোটি টাকা। প্রকল্পটির বাস্তবায়নের মেয়াদকাল নির্ধারণ করা হয়েছে চলতি বছরের ১ মে থেকে ২০৩১ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত।

বিচ্ছিন্নতার ১৭২ কিলোমিটার : নালিতাবাড়ী-হালুয়াঘাট সীমান্ত ধরে ছুটে চলা পাকা সড়কটি নিতাই নদীর পাড়ে গিয়ে শেষ হয়েছে কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই। ওপারে হাতছানি দিয়ে ডাকছে দুর্গাপুর আর চিনামাটির পাহাড়ের মায়াবী রূপ; মাঝখানে প্রবাহিত নদীটি তৈরি করে রেখেছে কয়েক কিলোমিটারের দুঃসহ দূরত্ব। শুধু নিতাই নদী নয়, গণেশ্বরী, সোমেশ্বরীর মতো নদীগুলো এভাবে পুরো সীমান্ত সড়ককে খণ্ডবিখণ্ড করে রেখেছে। কাগজে কলমে একে ‘মিসিং লিংক’ বলা হলেও বাস্তবে এটি পুরো উত্তর-পূর্ব সীমান্ত অঞ্চলের অর্থনীতি ও পর্যটনের পায়ে শিকল পরিয়ে রাখার শামিল।

 প্রতিদিন এ পথেই চরম ঝুঁকি নিয়ে চলতে হয় বয়োবৃদ্ধ থেকে শুরু করে নারী-শিশুদের। নদী পারাপারের জন্য নেই কোনো স্থায়ী ঘাট বা জেটি। নড়বড়ে কাঠের তক্তা বা প্লাস্টিকের চেয়ারে ভর করে চলন্ত নৌকায় মোটরসাইকেল আর যাত্রী তোলা-এখানে নিত্যদিনের চিত্র। নদীর ধারে কথা হয় স্থানীয় তরুণ মাসুমের সঙ্গে। সে জানায়, ‘সেতু অইবো হুনি। ভিডিও-ছিডিও লইয়া যায়। সেতু তো অয় না। আমরার দুর্ভোগও কাটে না।’ সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, চারটি নদী-মহাদেব, গণেশ্বরী, সোমেশ্বরী এবং নিতাই। পাহাড়ি এ নদীগুলোর ওপর সেতু না থাকায় নেত্রকোনার দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা, ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়া উপজেলার সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে।

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মঈনুল হাসান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘দীর্ঘ সীমান্ত সড়কের চারটি বিচ্ছিন্ন নদীর ওপর নতুন সেতু নির্মাণ এবং এর সঙ্গে নেত্রকোনার দুর্গাপুরে জরাজীর্ণ ও কাঠামোগতভাবে অনুপযোগী সোমেশ্বরী-২ সেতুটিকে সম্পূর্ণ আধুনিক ও জলবায়ু সহনশীল হিসেবে প্রতিস্থাপন করাই এ প্রকল্পের  লক্ষ্য। সেতুগুলো হলে বদলে যাবে সীমান্ত জনপদ।’

সাদা সোনা, স্থলবন্দর ও সিলেট কানেক্টিভিটি : প্রস্তাবিত পাঁচটি সেতু নির্মিত হলে উন্নয়ন প্রকল্পের সুবিধা ভোগ করবে সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ, শেরপুর ও জামালপুর-এ ছয়টি জেলার প্রায় ৩৫ লাখ মানুষ। এ জেলাগুলোর সীমান্ত এলাকা পুরোপুরি সড়ক নেটওয়ার্কের আওতায় চলে আসবে। নেত্রকোনার দুর্গাপুরের বিজয়পুরে সঞ্চিত প্রায় ২৪.৭ লাখ মেট্রিক টন উচ্চমানের চীনামাটি বা হোয়াইট ক্লে খনিজের দুয়ার খুলে যাবে।

 দেশের সিরামিক ও টাইলস শিল্পের সিংহভাগ কাঁচামালের পরিবহন খরচ হ্রাস পাবে। সবচেয়ে বড় বিষয়, এ সড়ক ও সেতুগুলো সরাসরি সংযুক্ত করবে দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থলবন্দর-হালুয়াঘাটের গোবরাকুড়া-কড়ইতলী এবং নালিতাবাড়ীর নাকুগাঁওকে। এর ফলে ভারতের সঙ্গে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে গতি আসবে। এ সেতুগুলোর কারণে শেরপুরের গজনী অবকাশ, নালিতাবাড়ীর মধুটিলা ইকোপার্ক, হালুয়াঘাটের গাবরাখালী গারো পাহাড় পর্যটন এলাকা, নেত্রকোনার বিরিশিরি ও সুসং দুর্গাপুরের বিখ্যাত সাদা মাটির (চিনামাটি) পাহাড়, এমনকি সুনামগঞ্জের যাদুকাটা নদী ও ঐতিহ্যবাহী শিমুল বাগান-এ পুরো বেল্টটি একটি একক ‘ট্যুরিজম নেটওয়ার্ক’-এ চলে আসবে।

ময়মনসিংহ, শেরপুর, নেত্রকোনা ও সুনামগঞ্জের সীমান্ত এলাকার এ পর্যটন হাব যদি পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়, তবে অভ্যন্তরীণ পর্যটনের ক্ষেত্রে এটি দেশের অন্যতম বড় অর্থনৈতিক রাজস্ব আয়ের উৎসে পরিণত হবে। বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব, ময়মনসিংহ জেলা পরিষদের প্রশাসক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সীমান্ত এলাকার নদনদী এ জনপদে বিচ্ছিন্নতা তৈরি করেছে। সেতু না থাকায় এক জেলার মানুষ আরেক জেলায় সরাসরি যেতে পারে না। যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে সীমান্ত এলাকায় উৎপাদিত কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য পাওয়া যায় না।

এ ছাড়া যোগাযোগব্যবস্থার নাজেহাল অবস্থার কারণে এসব স্থানে পর্যটকরা দিনে এসে দিনেই ফিরে যান। এ পরিস্থিতিতে বর্তমান সরকারের গৃহীত প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে এটি এ এলাকার কৃষি, পর্যটন ব্যবসাবাণিজ্য ও অর্থনীতি বদলে দেবে, যা স্থানীয় দারিদ্র?্য বিমোচনে সরাসরি ভূমিকা রাখবে।