Image description

থাইল্যান্ডের জঙ্গলে বাংলাদেশিদের গণকবর আবিষ্কার হয়। লিবিয়ার মরুভূমিতে পাওয়া যায় বন্দিদশা। মালয়েশিয়ার সীমান্তে অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হন পাচার হয়ে যাওয়া মানুষ। বিদেশে ভালো চাকরির স্বপ্ন দেখিয়ে বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অসংখ্য মানুষের নির্মম পরিণতির এসব ঘটনা দেশকে নাড়া দেয়। এসব ঘটনায় মামলাও হয়েছে। গ্রেপ্তার হয়েছে দালাল চক্রের সদস্যরাও।

কিন্তু আদালতের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর পর একের পর এক মামলা থমকে গেছে। ভুক্তভোগী ও সাক্ষীরা হারিয়ে যাচ্ছেন, অনেক ক্ষেত্রে অর্থের বিনিময়ে আপস হচ্ছে। আবার কোথাও বছরের পর বছর বিচার ঝুলে থাকায় মামলার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার। ফলে মানব পাচারের মতো সংঘবদ্ধ অপরাধের বিচার নিশ্চিত হওয়ার বদলে দায়মুক্তির সংস্কৃতিই যেন শক্তিশালী হচ্ছে। সরকারি পরিসংখ্যান ও আদালতের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রায় ৯ হাজার মামলার মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ২৫০টি। 

জানা গেছে, থাইল্যান্ডের গহিন অরণ্যে গণকবর পাওয়া গিয়েছিল ২০১৫ সালের ১ মে। একই বছর মালয়েশিয়াতেও পাওয়া যায়। এরপর খোঁজ মেলে নির্যাতন শিবির। এ ছাড়াও ইন্দোনেশিয়া থেকে মানব পাচারকারীদের নির্যাতনের শিকার ১৭৫ জনকে সরকার দেশে ফিরিয়ে আনে। ওইসব পাচারকারীদের বিচার এখনো ঝুলে আছে বলে জানা গেছে।

কয়েক বছর ধরে পাচারকারীরা ইউরোপে যাওয়ার লোভ দেখিয়ে মানুষকে লিবিয়ায় নিয়েছে। সেখানে তারা অপহরণ ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। ইউরোপে যেতে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে অনেকে মারাও যান। এসব ঘটনায় মামলা হয়, তদন্ত হয়, কিন্তু বিচার আর এগোয় না।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যানুযায়ী, ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বরে ১৪টি মামলার বিচার হয়েছে। এতে সাজা হয়েছে মাত্র ২৫ জনের। খালাস পেয়েছেন ৩৪৫ জন। এই এক বছরে ১ হাজার ১৯৬ জনকে পাচারের অভিযোগে মামলা হয় ৬৯৭টি। উদ্ধার করা হয় ৮৯৯ জন ভুক্তভোগীকে। পাচারে জড়িত থাকায় অভিযুক্ত করা হয় ২ হাজার ৯৭৫ জনকে। এদের মধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন ১ হাজার ৬১৯ জন।

আরেকটি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০০৪ সালের ১৫ জুন থেকে গত বছর পর্যন্ত মানব পাচারের ঘটনায় মামলা হয়েছে প্রায় ৯ হাজার। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ২৫০টি মামলা। গ্রেপ্তার হয়েছেন ১৪ হাজার ৫৩৮ জন। বিচারে মৃত্যুদ  হয়েছে ৮ জনের, যাবজ্জীবন সাজা হয়েছে ২৯৯ জনের এবং বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়েছে ১২৭ জনের। মামলা নিষ্পত্তির হারই খুব কম।

জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম ও অপারেশনস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম এ প্রতিবেদককে বলেন, মানব পাচারের শিকার ব্যক্তিরা ফিরে আসার পর মামলা করে। পরে আসামিরা তাকে নানা প্রলোভন দেখিয়ে আপস করে। তদন্ত পর্যায়ে আপস করতে চায় কিন্তু আমরা তা আমলে নিই না। উল্টো চার্জশিট দিয়ে দিই। পরে তারা আদালতে গিয়ে ঠিক আপস করে ফেলে। সেই পরিসংখ্যানটি আমাদের কাছে থাকে না। তবে নানাভাবে ১ হাজারের বেশি মামলা এভাবে থমকে যাওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। 

মানব পাচার মামলা থেমে থাকার কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা যায়, কক্সবাজারের রামু উপজেলার ১৫ বছর বয়সি এক কিশোরীকে নেপালে ভালো চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দিয়েছিল মানব পাচারকারীরা। মানব পাচার প্রতিরোধ নিয়ে কাজ করা জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ারের তথ্য বলছে, গত বছর মানব পাচারসংক্রান্ত ৭৩৯টি মামলার তদন্ত শেষে আদালতে প্রতিবেদন দিয়েছে পুলিশ। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, গত জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তিন মাসে আদালতে ১০৭টি মামলার বিচার নিষ্পত্তি হয়। এর মধ্যে ছয়টি মামলায় ১১ জনের সাজা হয়। বাকি ১০১ মামলার আসামিরা খালাস পেয়ে যান।