বছরের পর বছর উৎপাদন বন্ধ। কোথাও মরচে ধরা যন্ত্রপাতি, কোথাও অব্যবহৃত বিশাল শিল্পভূমি। একসময় দেশের শিল্পায়নের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে গড়ে ওঠা রাষ্ট্রায়ত্ত বহু শিল্পপ্রতিষ্ঠান লোকসান, অব্যবস্থাপনা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং নীতিগত ব্যর্থতার কারণে অচল হয়ে পড়ে। এর মধ্যে অনেক কারখানা পুরোপুরি বন্ধ, কিছু কেবল নামমাত্র চালু, আবার কিছু বিশাল সরকারি জমি নিয়ে বছরের পর বছর পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। আওয়ামী লীগ (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সরকারের আমলে পুনরায় চালুর নামে বিভিন্ন সরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জমি ও সম্পদ রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালীদের দীর্ঘমেয়াদি লিজ দেওয়া হলেও অভিযোগ রয়েছে সেগুলোর বড় অংশে শিল্প চালু না করে মূল্যবান জমি অলস ফেলে রাখা হয়েছিল।
এবার সেই সম্পদগুলোকে নতুন করে উৎপাদনে ফিরিয়ে আনতে দেশিবিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) পাঁচটি রাষ্ট্রায়ত্ত করপোরেশনের অধীন ৪৪টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও শিল্পসম্পদ নিয়ে একটি বিনিয়োগ পোর্টফোলিও তৈরি করেছে। এসব প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগে ইতোমধ্যে দেশিবিদেশি একাধিক শিল্পগোষ্ঠী আগ্রহ প্রকাশ করেছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অলাভজনক ও বন্ধ রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরুজ্জীবনের অগ্রগতি পর্যালোচনা সভায় দ্রুত, স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় বিনিয়োগ কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, কেবল বন্ধ কারখানা চালুই নয়, বিদ্যমান শিল্প অবকাঠামো ব্যবহার করে নতুন শিল্প স্থাপন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রপ্তানি বৃদ্ধি এবং সরকারের আর্থিক দায় কমানোই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
বিডার তথ্য অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত ৪৪টি শিল্পসম্পদের আওতায় রয়েছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা ১০ হাজার একরেরও বেশি শিল্পভূমি। অধিকাংশ স্থানে বিদ্যুৎ, গ্যাস, সড়ক যোগাযোগ, কারখানা ভবন, গুদাম ও অন্যান্য শিল্প অবকাঠামো আগে থেকেই রয়েছে। ফলে নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য ‘প্লাগ অ্যান্ড প্লে’ ভিত্তিতে দ্রুত বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে।
৪৪টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান কোথায়, কী অবস্থায় : বিডার বিনিয়োগ তালিকায় বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি), বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশন (বিটিএমসি), বাংলাদেশ সুগার অ্যান্ড ফুড ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিএসএফআইসি), বাংলাদেশ স্টিল অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন (বিএসইসি) এবং বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের (বিজেএমসি) অধীন মোট ৪৪টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও শিল্পসম্পদ রয়েছে। বিসিআইসির তালিকায় রয়েছে খুলনার খালিশপুরে অবস্থিত খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলস লিমিটেড ও খুলনা হার্ডবোর্ড মিলস লিমিটেড, চট্টগ্রামের বারবকুণ্ডে চিটাগাং কেমিক্যাল কমপ্লেক্স, সাভারের নয়ারহাটে ঢাকা লেদার কোম্পানি লিমিটেড এবং চট্টগ্রামের কালুরঘাটে উসমানিয়া গ্লাস শিট ফ্যাক্টরি- যেগুলো দীর্ঘদিন ধরে সম্পূর্ণ বন্ধ।
এ ছাড়া রাঙামাটির চন্দ্রঘোনায় কর্ণফুলী পেপার মিলস এবং ঢাকার মিরপুরে বাংলাদেশ ইনসুলেটর অ্যান্ড স্যানিটারিওয়্যার ফ্যাক্টরি অসুস্থ শিল্পপ্রতিষ্ঠান হিসেবে তালিকাভুক্ত। অন্যদিকে চট্টগ্রামের নর্থ পতেঙ্গায় নিউ টিএসপি সার কারখানা, নরসিংদীর পলাশে ইউএফ-৮৫ প্ল্যান্ট, ঘোড়াশাল-পলাশ সার কারখানা এলাকায় ডব্লিউপিপি ব্যাগ ফ্যাক্টরি উইথ ইনার লাইনার বিদ্যমান স্থানে নতুন প্রকল্প হিসেবে এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে প্রিমিয়াম ফ্লোট গ্লাস, সোলার গ্লাস অ্যান্ড সোলার প্যানেল প্ল্যান্ট অব্যবহৃত জমিতে নতুন প্রকল্প হিসেবে প্রস্তাবিত হয়েছে।
বিটিএমসির আওতায় থাকা দিনাজপুরের দিনাজপুর টেক্সটাইল মিলস, মির্জাপুরের টাঙ্গাইল কটন মিলস, চট্টগ্রামের ষোলশহরের আমিন টেক্সটাইল মিলস ও এশিয়াটিক কটন মিলস, রাঙামাটির ঘাগড়ার রাঙামাটি টেক্সটাইল মিলস, যশোরের নওয়াপাড়ার বেঙ্গল টেক্সটাইল মিলস, সাতক্ষীরার সুন্দরবন টেক্সটাইল মিলস, সাভারের আফসার কটন মিলস, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কোকিল টেক্সটাইল মিলস, খুলনার বয়রার খুলনা টেক্সটাইল মিলস, কুড়িগ্রাম টেক্সটাইল মিলস এবং নারায়ণগঞ্জের গোদনাইলের চিত্তরঞ্জন কটন মিলস বর্তমানে পিপিপি, আন্তর্জাতিক দরপত্র, ইজারা অথবা সম্পদ ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে। এর মধ্যে চিত্তরঞ্জন কটন মিলসের একটি অংশ ইতোমধ্যে বিক্রি হয়েছে এবং অবশিষ্ট জমি বিক্রির প্রক্রিয়া চলছে।
বিএসএফআইসির অধীন পঞ্চগড়, সেতাবগঞ্জ, শ্যামপুর, পাবনা ও কুষ্টিয়া চিনিকলে আখ মাড়াই বহুদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। তবে ঠাকুরগাঁও, জয়পুরহাট, নাটোর, রাজশাহী, ফরিদপুর, মোবারকগঞ্জ ও জিল বাংলা সুগার মিলস এখনো চালু আছে। একই সঙ্গে কুষ্টিয়ার রেনউইক যজ্ঞেশ্বর অ্যান্ড কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেড উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
বিএসইসির তালিকায় রয়েছে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের বারবকুণ্ডে প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, নর্থ পতেঙ্গার জেনারেল ইলেকট্রিক ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি (জেমকো) এবং গাজীপুরের টঙ্গীর অ্যাটলাস বাংলাদেশ লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানগুলো চালু থাকলেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ শিল্পভূমি অব্যবহৃত রয়েছে। এ ছাড়া বগুড়ার ছয়পুকুরিয়ায় পরিবেশবান্ধব আধুনিক স্টিল মিল স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
বিজেএমসির তালিকায় রয়েছে ঢাকার ডেমরার লতিফ বাওয়ানী জুট মিলস ও করিম জুট মিলস, চট্টগ্রামের ষোলশহরের আমিন জুট মিলস, চট্টগ্রামের নো-ভিউ গেস্ট হাউস এবং খুলনার চরেরহাটে বিজেএমসির জোন অফিস। এগুলো বর্তমানে বিনিয়োগযোগ্য সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ডেমরার দুটি জুট মিলের জমি বেজার অর্থনৈতিক অঞ্চলে রূপান্তরের কাজ চলছে।
আওয়ামী লীগ আমলে লিজে থমকে ছিল শিল্প : বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে বন্ধ ও লোকসানি রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরায় চালুর নামে বিভিন্ন রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তি, সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের দীর্ঘমেয়াদি লিজ দেওয়া হয়। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কারখানা আধুনিকায়ন বা উৎপাদন চালুর পরিবর্তে শত শত একর সরকারি জমি অলস ফেলে রাখা হয় কিংবা ব্যক্তিগত ও বাণিজ্যিক স্বার্থে ব্যবহার করা হয়।
এর মধ্যে কাপ্তাইয়ের কর্ণফুলী পেপার মিলসের কেমিক্যাল ইউনিট ও খালি জমি পর্যটনের নামে লিজ নেয় সাবেক এমপি দীপংকর তালুকদার-সমর্থিত একটি ঠিকাদার গোষ্ঠী। কিন্তু চুক্তির শর্ত অনুযায়ী কোনো উন্নয়নই করা হয়নি। চট্টগ্রামের আমিন জুট মিল বিভিন্ন অংশ দখল করে হাজারের বেশি দখলদার সেমিপাকা বাড়ি নির্মাণ করে ভাড়া দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পশ্চিম ষোলশহর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আওয়ামী লীগ নেতা মো. মোবারক আলী, স্থানীয় বিভিন্ন ইউনিট আওয়ামী লীগ নেতা ইলিয়াস সরকার, কামাল হোসেন রিজভি, মুসলেহ উদ্দিন লিটন, মামুনুর রশিদ মামুন। তাদের অনুসারীরা পুরো শিল্পাঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ করতেন। তাদের অনুসারী আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতারা এসব দখলকৃত ভূমি ও স্থাপনা নিয়ন্ত্রণ করতেন।
একইভাবে রাজশাহী টেক্সটাইল মিলস চালুর নামে সাবেক মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটনের ঘনিষ্ঠ একটি রাজনৈতিক সিন্ডিকেট বিশাল শিল্পভূমি দখলে রেখেছিল। সাবেক বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার করে বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের অধীনস্থ বগুড়ার আদমদীঘির ২.৩৮ একর সরকারি জমি কোনো প্রকার দরপত্র ছাড়াই নামমাত্র মূল্যে (মাত্র ২৩ লাখ টাকায়) এক নারীর কাছে বিক্রি করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া সাবেক বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজীর বিরুদ্ধে সরকারি ও ব্যক্তিগত শিল্পকারখানার জমি জবরদখল, জালিয়াতি এবং অর্থ পাচারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে সিআইডি এবং দুদক একাধিক মামলা দায়ের করেছে। দিনাজপুরের সেতাবগঞ্জ সুগার মিলস ও এর বিশাল জমি সাবেক প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরীর অনুসারীদের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও সেখানে উৎপাদন শুরু হয়নি। বরং জমির মাটি কেটে বিক্রির অভিযোগ ওঠে। উৎপাদন চালুর প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবে শিল্পগুলো সচল করা হয়নি।
কারা আগ্রহ দেখিয়েছে : সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ৪৪টি শিল্পসম্পদে বিনিয়োগ করতে ইতোমধ্যে দেশিবিদেশি একাধিক শিল্পগোষ্ঠী আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে ট্রান্সকম গ্রুপ, এসিআই পিএলসি, নাবিল গ্রুপ, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ, আকিজ গ্রুপ, পিএইচপি, জার্মানির সাইন প্লাস, এমএসএম এবং চীনের জিরো জিয়ামসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কয়েকটি দেশীয় প্রতিষ্ঠান আনুষ্ঠানিকভাবে আগ্রহপত্রও জমা দিয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিষ্ঠানকে চূড়ান্তভাবে লিজ বা বিনিয়োগ অনুমোদন দেওয়া হয়নি। বাংলাদেশ স্টিল অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী সাব্বির আওয়াল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। চিঠিও দিয়েছে। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো বৈঠক হয়নি।
অর্থনীতিবিদরা যা বলছেন : সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বন্ধ ও দীর্ঘদিনের অলাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো পুনরুজ্জীবনের উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও বাস্তবায়নের পথে বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণের বোঝা, অব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে। ফলে শুধু বিনিয়োগের আহ্বান জানালেই হবে না, আগে স্পষ্ট করতে হবে কীভাবে এগুলোকে দেশিবিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য আকর্ষণীয় ও গ্রহণযোগ্য করে তোলা হবে।
তিনি বলেন, অতীতে রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ ও সম্পদ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া এবং সুস্পষ্ট কৌশলের ঘাটতি ছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার বিনিয়োগ প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও নীতিনির্ভর করতে হবে। অন্যথায় এ উদ্যোগও কাক্সিক্ষত সাফল্য পাবে না।
ড. মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, কারখানাগুলোকে টেকসইভাবে সচল রাখতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের ধরন ও সম্ভাবনা বিবেচনায় শেয়ার অফলোড, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি), কৌশলগত বিনিয়োগকারী যুক্ত করা কিংবা ধাপে ধাপে ব্যক্তিমালিকানায় হস্তান্তরের মতো বিভিন্ন বিকল্প মডেল বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে।
সরেজমিন পাঁচ কারখানায় যা দেখা গেল : চট্টগ্রামের রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সরেজমিন বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রতিবেদক দেখতে পান, একসময় কর্মচাঞ্চল্যে মুখর থাকা কারখানাগুলো এখন অনেকটাই নীরব। আতুরার ডিপো এলাকার আমিন জুট মিলসের ভবনগুলোর গেট তালাবদ্ধ। কোনোটির গায়ে পলেস্তারা খসে আছে। কোনোটির বিভিন্ন অংশ ভেঙে গেছে। একসময় দিনরাত কর্মমুখর কারখানাগুলোতে যেন ভর করেছে রাজ্যের নীরবতা। ভিতরে পড়ে আছে অসাড় (বিকল) যন্ত্রপাতি। কোনোটিতে জং ধরেছে। কোনোটি পড়ে আছে নিভৃতে। জাল বুনে বাসা বেঁধেছে মাকড়সা। ঘর পেয়েছে ইঁদুর-তেলাপোকাও। বিশাল কারখানা ভবন ও শেডগুলো তালাবদ্ধ, যন্ত্রপাতিতে মরিচা ধরেছে, অধিকাংশ আবাসিক কোয়ার্টার জরাজীর্ণ। সবচেয়ে বড় সংকট ৮০ একর শিল্পভূমি। সীমানাপ্রাচীর না থাকায় প্রায় ২২ একর জমি বেদখলের শিকার হয়েছে এবং এ নিয়ে ৬১টি মামলা চলছে। প্রকল্প পরিচালক আলী আশরাফ মুঠোফোনে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, নতুন করে জমি দখল ঠেকাতে ল্যান্ড প্রটেকশন কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং দখল হওয়া জমি উদ্ধারের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
কালুরঘাটের উসমানিয়া গ্লাস শিট ফ্যাক্টরি ঘুরে দেখা যায়, ২০২৩ সালে উৎপাদন বন্ধ হওয়ার পর কারখানার শেডে নেমে এসেছে নিস্তব্ধতা। পুরোনো প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি অচল অবস্থায় পড়ে আছে, অবিক্রীত কিছু কাচের শিট ছাড়া উৎপাদনের আর কোনো চিহ্ন নেই। ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে এম আনিসুজ্জামান বলেন, প্রতিষ্ঠানটি পুনরায় চালু বা পিপিপির আওতায় দেওয়ার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বিসিআইসি ও মন্ত্রণালয় নেবে।
অন্যদিকে নগরীর চট্টেশ্বরী পাহাড়ের ওপর অবস্থিত নোভিউ গেস্ট হাউস এখনো সীমিত পরিসরে ব্যবহৃত হলেও আধুনিকায়নের অভাবে জৌলুস হারিয়েছে। সরকারি কর্মকর্তাদের আবাসন হিসেবে ব্যবহৃত এ ঐতিহাসিক স্থাপনাটি পুনর্গঠনের পরিকল্পনা দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে।
দিনাজপুরের সেতাবগঞ্জ চিনিকলে বাংলাদেশ প্রতিদিনের স্থানীয় প্রতিনিধি সরেজমিন দেখতে পান, একসময় আখভর্তি ট্রাক-ট্রাক্টর, শ্রমিক-কর্মচারীদের পদচারণ ও মিলের সাইরেনে মুখর থাকা কারখানাটি এখন প্রায় জনশূন্য। মিলরোডের ব্যস্ততাও হারিয়ে গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ২০২০ সালে মিল বন্ধ হওয়ার পর শ্রমিক, আখ চাষি ও ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, দীর্ঘদিন অচল থাকায় যন্ত্রপাতিও নষ্ট হচ্ছে।
সেতাবগঞ্জ চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আখ মাড়াই কার্যক্রম স্থগিত থাকলেও মিলের জমি লিজ দিয়ে সরকারের রাজস্ব আয় হচ্ছে। পাশাপাশি বেদখল হওয়া ৩৫.৫৭ একর জমি উদ্ধারে মামলা চলছে। সরকারের সিদ্ধান্ত হলে মিলটি পুনরায় চালুর সম্ভাবনা রয়েছে বলেও জানান তিনি।
সেতাবগঞ্জ চিনিকল শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি প্রশান্ত কুমার চৌহান বলেন, মিলটি বন্ধ হওয়ায় পরোক্ষভাবে অনেকেই ক্ষতিগ্রস্ত। এলাকাবাসীর দাবি, দ্রুত মিলটি চালু করা হোক।
পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার দাশুড়িয়ায় অবস্থিত পাবনা সুগার মিলে গিয়ে দেখা যায়, একসময় শ্রমিক-কর্মচারীদের পদচারণ মুখর মিল এলাকা এখন সুনসান। পরিত্যক্ত কারখানাজুড়ে লতাপাতার দখল, বিভিন্ন ভবনে সাপ-পোকামাকড়ের বসবাস। উৎপাদন বন্ধ থাকলেও মিলটি পাহারা ও রক্ষণাবেক্ষণে কর্মী নিয়োজিত রয়েছেন। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কয়েকজন কর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, মিলের ভিতরে প্রায়ই বড় বড় সাপ দেখা যায়, ফলে রাতে দায়িত্ব পালন করতে ভয় লাগে। পাবনা সুগার মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আখতারুজ্জামান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আধুনিক প্রযুক্তি সংযোজন, দক্ষ জনবল নিয়োগ এবং শুধু চিনি নয়, স্পিরিট, জৈবসার ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের মতো বহুমুখী প্রকল্প চালু করা গেলে মিলটিকে আবারও লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা সম্ভব।