ইতালিতে বৈধভাবে পাঠিয়ে উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখানো হয়। সেই স্বপ্নের পেছনে ছুটতে গিয়ে কেউ বিক্রি করেন কৃষিজমি। কেউ বন্ধক রাখেন বসতভিটা। কেউ সুদে টাকা ধার করে তুলে দেন দালালের হাতে। কিন্তু ইতালির বদলে তাদের নিয়ে যাওয়া হয় লিবিয়ায়। সেখানে মানব পাচারকারী চক্রের কাছে জিম্মি করে চালানো হয় অমানবিক নির্যাতন। সেই ভিডিও পরিবারের কাছে পাঠিয়ে আদায় করা হয় আরও লাখ লাখ টাকা। টাকা পরিশোধের পরও অনেকের দেশে ফেরা হয় না।
সরেজমিন দেখা গেছে, মাদারীপুর সদর উপজেলার ঝাউদী ইউনিয়নের পূর্ব টুবিয়া গ্রামের অন্তত অর্ধশতাধিক পরিবার একই ধরনের প্রতারণার শিকার হয়েছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, ইতালিতে পাঠানোর কথা বলে টাকা নেওয়ার পর তাদের স্বজনদের লিবিয়ায় পাচার করা হয়।
২০২৫ সালের মার্চে ২২ লাখ টাকা খরচ করে দেশ ছাড়েন রাহাত তালুকদার। কয়েক দিন পর পরিবারের কাছে আসে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় নির্যাতনের ভিডিও। পরে মুক্তির জন্য দাবি করা হয় আরও ২৫ লাখ টাকা।
রাহাতের মা মায়া বেগম বলেন, ছেলেকে বাঁচানোর জন্য যা ছিল সব বিক্রি করেছি। এখনো জানি না সে বেঁচে আছে, নাকি মারা গেছে।
একই গ্রামের মস্তফা হাওলাদারের মা বিলকিস আরা বেগম বলেন, ছেলেকে ফেরানোর আশায় প্রায় ৫০ লাখ টাকা দিয়েছি। কিন্তু আজও সে নিখোঁজ। আরাফাত কাজীর বড় ভাই মাহাবুব কাজীর দাবি, ইতালিতে পাঠানোর কথা বলে তাদের কাছ থেকে ৫৩ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। এরপরও তার ভাইয়ের কোনো খোঁজ নেই। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, দালালদের বিরুদ্ধে মামলা করেও স্বস্তি মিলছে না। বরং অনেক ক্ষেত্রে অভিযুক্তরা উল্টো ভুক্তভোগীদের বিরুদ্ধেই মামলা দিয়ে হয়রানি করছেন। জেলা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ২০১৩ সালে ‘মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন’ কার্যকর হওয়ার পর থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত জেলায় মোট ৭৬৯টি মানব পাচারসংক্রান্ত মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ১৭৫টি মামলা বিচারাধীন।
বছরভিত্তিক হিসাবে ২০২২ সালে ৪৪টি, ২০২৩ সালে ১১৬টি, ২০২৪ সালে ১০৩টি, ২০২৫ সালে ২১৪টি এবং ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ১৮৩টি মামলা হয়েছে।
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি মামলা মাদারীপুর সদর উপজেলায়, এরপর রাজৈর এবং তৃতীয় অবস্থানে শিবচর। সংশ্লিষ্টদের মতে, সামাজিক ভয়, দালালদের প্রভাব এবং পাল্টা মামলার আশঙ্কায় অনেক পরিবার এখনো অভিযোগই করেন না। ফলে প্রকৃত ভুক্তভোগীর সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে।