Image description

অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, সমন্বয়হীনতা ও দীর্ঘসূত্রতায় প্রতিনিয়ত ব্যাহত হচ্ছে রোগীদের চিকিৎসাসেবা। পদে পদে রয়েছে বিড়ম্বনা আর দুর্ভোগ।

তবু দেশের ৬৪ জেলার ক্যান্সার রোগীদের ভরসা এখনো রাজধানীর মহাখালীর জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল। অথচ এই সংকট অনেকটাই কমে যেতে পারত, যদি ২০১৯ সালে শুরু হওয়া আট বিভাগীয় শহরের বিশেষায়িত ক্যান্সার, হৃদরোগ ও কিডনি হাসপাতালগুলো নির্ধারিত সময়ে চালু হতো। এর মধ্যে পেরিয়ে গেছে সাত বছর।

৫০০ শয্যার জাতীয় ক্যান্সার হাসপাতালের প্রবেশপথে বড় অক্ষরে লেখা— ‘সূচনায় পড়লে ধরা, ক্যান্সার রোগ যায় যে সারা’; কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।

এখানে ক্যান্সার ধরা পড়ার পরও দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা যায় না। একটি শয্যার জন্য রোগীদের অপেক্ষা করতে হয় এক থেকে দেড় মাস। টিকিট সংগ্রহ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, রিপোর্ট হাতে পাওয়া, চিকিৎসক দেখানো এবং ভর্তি—প্রতিটি ধাপেই দীর্ঘসূত্রতা। এই দীর্ঘ অপেক্ষায় অনেক রোগীর ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়ছে পুরো শরীরে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বাস্তবায়নাধীন ‘৮টি বিভাগীয় শহরে পূর্ণাঙ্গ ক্যান্সার, হৃদরোগ ও কিডনি চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন’ প্রকল্পটি ২০২২ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা ছিল। শুরুতে ব্যয় ধরা হয়েছিল দুই হাজার ৩৮৮ কোটি টাকা। পরে প্রথম সংশোধনীতে তা বেড়ে দাঁড়ায় তিন হাজার ৪৩৩ কোটি টাকায়। অর্থাৎ ব্যয় বেড়েছে প্রায় এক হাজার ৪৪ কোটি টাকা বা প্রায় ৫০ শতাংশ। একাধিকবার প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়েও কাজ শেষ করা যায়নি।

এখন আবার ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত সময় বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জমি নির্বাচন, নকশা পরিবর্তন, ঠিকাদারের দুর্বলতা, প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়হীনতা, অর্থ ছাড়ে ধীরগতি এবং চিকিৎসা যন্ত্রপাতি সংগ্রহে বিলম্বের কারণে প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়ে শেষ হয়নি।

এই বিলম্বের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে রোগীদের। গত সোমবার সরেজমিনে জাতীয় ক্যান্সার হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, বহির্বিভাগ থেকে ভর্তি বিভাগ, করিডর, বারান্দা—সবখানেই রোগী ও স্বজনের উপচে পড়া ভিড়। কেউ টিকিটের জন্য অপেক্ষা করছে, কেউ রিপোর্ট হাতে চিকিৎসকের কক্ষের সামনে, আবার কেউ একটি শয্যার আশায় দিনের পর দিন হাসপাতাল চত্বরে অবস্থান করছে।

গাজীপুরের শ্রীপুর থেকে আসা সুমনা বেগম ক্যান্সারে আক্রান্ত স্বামীকে নিয়ে এক সপ্তাহ ধরে হাসপাতালে ঘুরছেন। চিকিৎসক ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দিলেও এখনো শয্যা পাননি। তিনি বলেন, ‘বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করানোর সামর্থ্য নেই। এক সপ্তাহ ধরে শুধু ঘুরছি। সিট নেই বলে ভর্তি নিচ্ছে না।’

ক্যান্সারে আক্রান্ত ফিরোজ মিয়া অভিযোগ করেন, ‘দালালদের টাকা না দিলে এখানে ভর্তি হওয়া কঠিন। আমার পরে যারা এসেছে, তাদের অনেকে ভর্তি হয়ে গেছে।’

বরিশালের গৌরনদীর বাসিন্দা লতিফা বেগম জানান, গত ছয় মাসে এটি তাঁদের তৃতীয়বার ঢাকায় আসা। প্রতিবার চিকিৎসক ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দিলেও শয্যা না পেয়ে ফিরে যেতে হয়েছে। লঞ্চে ঢাকায় আসা, থাকার খরচ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা সব মিলিয়ে পরিবারের সঞ্চয় প্রায় শেষ। তিনি বলেন, ‘আমাদের বিভাগেই যদি বিশেষায়িত ক্যান্সার হাসপাতাল চালু থাকত, তাহলে এত দূর ঢাকায় এসে বারবার ঘুরতে হতো না। রোগও এত দিনে এতটা ছড়িয়ে পড়ত না।’

রোগীদের অভিযোগ, চিকিৎসার শুরুতেই তাদের মূল্যবান সময় নষ্ট হয়ে যায়। প্রথমে কয়েক দিন চেষ্টা করে টিকিট সংগ্রহ করতে হয়। এরপর চিকিৎসক বিভিন্ন পরীক্ষা দেন। এসব শেষ করতে সাত থেকে ১০ দিন লাগে। পরে ক্যান্সার ধরা পড়লে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। তখন একটি শয্যার জন্য ধরনা দিতে হয়। এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় অনেক রোগীর ক্যান্সার আরো জটিল পর্যায়ে পৌঁছে।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, এখানে ভর্তি একজন রোগী গড়ে এক থেকে দেড় মাস হাসপাতালে থাকে। ফলে শয্যা দ্রুত খালি হয় না। অথচ প্রতিদিন নতুন করে ৫০০ থেকে ৬০০ রোগী ভর্তি হতে আসে। হাসপাতাল ৩০০ শয্যা থেকে ৫০০ শয্যায় উন্নীত হলেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স ও কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়নি। বাস্তবে এই হাসপাতালে বর্তমান শয্যার পাঁচ থেকে সাত গুণ বেশি প্রয়োজন।

বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, দেশে ১৩ থেকে ১৫ লাখ ক্যান্সার রোগী রয়েছে। প্রতিবছর নতুন করে প্রায় দুই লাখ মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হয় এবং প্রায় দেড় লাখের মৃত্যু হয়। অথচ চিকিৎসা এখনো ঢাকাকেন্দ্রিক। দেশের ৯টি সরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হলেও পাঁচটিতে রেডিওথেরাপি মেশিন ঠিকমতো কাজ করে না।

গ্লোবোক্যান-২০২০-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর প্রায় এক লাখ ৫৬ হাজার মানুষ নতুন করে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয় এবং প্রায় এক লাখ আট হাজারের মৃত্যু হয়। জাতীয় ক্যান্সার হাসপাতালে প্রতিদিন প্রায় ৫০ জন রোগী ভর্তি হয় এবং বহির্বিভাগে চিকিৎসা নেয় প্রায় এক হাজার রোগী। চাহিদার তুলনায় এই সক্ষমতা খুবই অপ্রতুল।

দেশের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ সরকারি ক্যান্সার হাসপাতালে আটটি রেডিওথেরাপি মেশিন থাকলেও বর্তমানে চালু রয়েছে মাত্র দুটি। ফলে রোগীদের রেডিওথেরাপি নিতে আট থেকে ১০ মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অনকোলজি বিভাগেও একই ধরনের চাপ রয়েছে।

সুমনা, লতিফা বা কিশোরগঞ্জের রায়হান আহমেদের পরিবারের মতো হাজারো রোগীর ভোগান্তির মূল কারণ শুধু মহাখালীর ক্যান্সার হাসপাতালের শয্যাসংকট নয়; বরং সাত বছরেও বিভাগীয় ক্যান্সার হাসপাতালগুলো চালু না হওয়া। প্রকল্পটি সময়মতো শেষ হলে বরিশাল, খুলনা, রাজশাহী, রংপুর, সিলেট, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন অঞ্চলের রোগীরা নিজ নিজ বিভাগেই প্রাথমিক চিকিৎসা, কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি ও অস্ত্রোপচারের মতো বিশেষায়িত সেবা পেত। তাদের বারবার ঢাকায় ছুটে আসতে হতো না।

জাতীয় ক্যান্সার হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোস্তফা আজিজ সুমন বলেন, ৫০০ শয্যার হাসপাতালটি প্রতিদিন সক্ষমতার দ্বিগুণেরও বেশি রোগীর চাপ সামলাচ্ছে। সাতটি রেডিওথেরাপি বাংকার থাকলেও চালু রয়েছে মাত্র দুটি। ফলে একজন রোগীকে রেডিওথেরাপির জন্য এক থেকে দেড় বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

তিনি জানান, হাসপাতালটিতে এমআরআই মেশিন নেই, সিটি স্ক্যানের মেশিন একটি এবং জনবলও ৩০০ শয্যার হিসাবেই রয়েছে। তাঁর মতে, শুধু শয্যা বাড়ালেই হবে না; পর্যাপ্ত জনবল, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করেই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব।

সম্প্রতি প্রকল্পটি নিয়ে করা বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে প্রকল্প বিলম্বের পেছনে একের পর এক অব্যবস্থাপনার চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জমি নির্বাচনেই দীর্ঘ সময় নষ্ট হয়েছে। পরে শুধু ক্যান্সার হাসপাতালের পরিবর্তে হৃদরোগ ও কিডনি চিকিৎসা যুক্ত করায় পুরো নকশা পরিবর্তন করতে হয়েছে। এতে ভবনের কাঠামো, শয্যাসংখ্যা এবং অবকাঠামো পুনর্বিন্যাস করতে হয়েছে। পাশাপাশি অর্থ ছাড়ে ধীরগতি, ঠিকাদারের দুর্বলতা, কোথাও ঠিকাদার পরিবর্তন, প্রকল্প পরিচালক বারবার বদলি এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে কাজ বছরের পর বছর পিছিয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৩০.৮১ শতাংশ, যদিও নির্মাণকাজের অগ্রগতি দেখানো হয়েছে ৮১.৪৩ শতাংশ। অর্থাৎ ভবনের কাজ এগোলেও হাসপাতাল চালুর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা যন্ত্রপাতি সংগ্রহ, আসবাব স্থাপন এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি এখনো উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে রয়েছে। ফলে ভবন দাঁড়িয়ে গেলেও সেখানে রোগী ভর্তি করে চিকিৎসা শুরু করার মতো অবস্থা তৈরি হয়নি। এই বিলম্বের সরাসরি প্রভাব পড়েছে মহাখালীর জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে।

আইএমইডির প্রতিবেদনে শুধু বিলম্ব নয়, নির্মাণকাজের মান নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে টাইলস বসানো, ব্লকের মান, অতিরিক্ত রড অপসারণ না করা এবং ঢালাইয়ের দুর্বল ফিনিশিংয়ের মতো একাধিক কারিগরি ত্রুটি শনাক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া অনেক জায়গায় প্রয়োজনের তুলনায় ব্যয়বহুল গ্রানাইট পাথর ও অলংকারধর্মী নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছে সংস্থাটি। প্রকল্প ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। ফলে নির্মাণ শেষ হলেও হাসপাতালগুলো চালু করা সম্ভব হচ্ছে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিভাগীয় হাসপাতালগুলো সময়মতো চালু হলে রোগীরা নিজ নিজ বিভাগেই ক্যান্সার শনাক্তকরণ, কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি ও অস্ত্রোপচারের মতো সেবা পেত। এতে রাজধানীতে রোগীর চাপ যেমন কমত, তেমনি দ্রুত চিকিৎসা শুরু হওয়ায় অনেক রোগীর জীবনও রক্ষা করা সম্ভব হতো। কিন্তু বাস্তবতা হলো সাত বছরেও হাসপাতালগুলো চালু হয়নি।