আস্থার সংকটে বেরিয়ে যাচ্ছে ব্যাংকের টাকা। মুদ্রাবাজারের ভারসাম্য ধরে রাখতে পারছে না বাংলাদেশ ব্যাংক। মূল্যস্ফীতি ঠেকাতে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অব্যাহত রাখার পর আবার দুর্বল ব্যাংকগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে তহবিল সরবরাহ করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাজারে টাকার প্রবাহ কমাতে বড় নোটের প্রচলন বন্ধ রাখার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েও এখন চাহিদা সামাল দিতে ভল্ট থেকে বড় নোট ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে। এতে উল্টো নগদ টাকার প্রবাহ বেড়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ স্ট্র্যাটেজিক লিকুইডিটি রিপোর্টের তথ্য অনুযায়ী, মে ২০২৬-এর শেষ নাগাদ বাজারে মোট প্রচলিত মুদ্রা বা কারেন্সি ইন সার্কুলেশন (সিআইসি)-এর পরিমাণ বেড়ে প্রায় ৩ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকায় উঠে গেছে। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংক মনিটরি পলিসি স্টেটমেন্টের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে সিআইসির প্রাক্কলন বা সিলিং ছিল মাত্র ২ লাখ ৭৫ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গাণিতিক হিসাবকে ‘বুড়ো আঙুল’ দেখিয়ে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৬৭ হাজার কোটি টাকার বেশি নগদ অর্থ মানুষের হাতে বা ব্যক্তিগত সিন্দুকে আটকে আছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বার্ষিক প্রতিবেদনের (২০২৪-২৫ অর্থবছর) সংরক্ষিত পরিসংখ্যান মেলালে দেখা যায়, মে/জুন ২০২৫-এর শেষ নাগাদ সিআইসি ছিল প্রায় ২ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা, যা অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে গত ফেব্রুয়ারিতে বেড়ে ৩ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকায় উঠে যায়। প্রাপ্ত হিসাবে দেখা যায়, মাত্র এক বছরের ব্যবধানে বাজারে নগদ টাকার প্রবাহ বেড়েছে প্রায় ১৮ শতাংশ। ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, মানুষের মনে ব্যাংকিং খাতের ওপর আস্থার সংকট যে কতটা গভীর এটি তারই প্রমাণ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাক্কলনের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার যে কোনো মিল নেই, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ মিলছে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর এটিএম বুথগুলোতে। ব্যাংকিং খাতের দায়িত্বশীল সূত্র ও মাঠপর্যায়ের ব্যাংকাররা নিশ্চিত করেছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বড় নোটের অবৈধ মজুত কমাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আগে বাজারে নতুন ৫০০ ও ১০০০ টাকার উচ্চমূল্যের নোটের সরবরাহ একপ্রকার অলিখিতভাবে সংকুচিত বা বন্ধ রেখেছিল। লক্ষ্য ছিল মানুষকে ছোট নোট ব্যবহারে বাধ্য করা। কিন্তু মে ২০২৬ শেষে সিআইসি প্রাক্কলিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে এক ধাক্কায় ৬৭,০০০ কোটি টাকা বেড়ে যাওয়ায় ছোট নোট (১০০ বা ২০০ টাকা) দিয়ে এই বিশাল নগদ চাহিদা মেটাতে সম্পূর্ণ হিমশিম খাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, ১ লাখ টাকা ১০০ টাকার নোটে দিতে গেলে এটিএম বুথের ক্যাসেটে যে পরিমাণ জায়গার প্রয়োজন, তা সরবরাহ করা লজিস্টিক্যালি অসম্ভব। ফলে প্রাক্কলনের এই বিশাল ধাক্কা সামাল দিতে এবং এটিএম বুথগুলো সচল রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক এখন বাধ্য হয়ে ভল্টে আটকে রাখা ‘বঙ্গবন্ধু’র ছবিযুক্ত ৫০০ ও ১০০০ টাকার উচ্চমূল্যের নোটগুলোই আবার বাজারে সরবরাহ করতে বাধ্য হচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, ব্যাংক থেকে বেরিয়ে যাওয়া অর্থ কীভাবে আবার ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
বড় নোট বাতিল করার ঘোষণায় কি ব্যাংকে টাকা আসবে : জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট বাতিলের প্রস্তাব করেন বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন। সম্প্রতি বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি বলেন, মানুষের কাছে নগদ টাকা থাকার পরও আস্থা না থাকায় তারা সেটি ব্যাংকে রাখছেন না। ঘরে রাখা ওই অর্থ ব্যাংকে ফেরাতে ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট বাতিল করার প্রস্তাব করেন তিনি। একই সঙ্গে বাতিল করার আগে পুরোনো নোট ব্যাংকে জমা দেওয়ার জন্য দুই মাস সময় বেঁধে দেওয়ার আহ্বান জানান। এরপর থেকেই বড় নোট বাতিলের বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে আলোচনা-বিতর্ক চলছে। একটি পক্ষের মতে, দেশের অনানুষ্ঠানিক বা ছায়া অর্থনীতিতে যে বিপুল পরিমাণ কালোটাকা, হুন্ডি এবং জাল নোটের চক্র ঘুরপাক খাচ্ছে, তা ভাঙতে ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট বাতিল করা যেতে পারে। তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, প্রস্তাবের উদ্দেশ্য সৎ হলেও বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই পদক্ষেপের ‘টাইমিং’ বা ‘সময় নির্বাচন’ মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি তৃতীয় প্রজন্মের বেসরকারি ব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট জানান, ‘আস্থার সংকট হোক, রাজনৈতিক অস্থিরতা হোক- বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যাংকের বাইরে রয়েছে।
আমাদের নীতিনির্ধারকরা আস্থার পরিবেশ তৈরি করে ওই অর্থ ব্যাংকে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ না নিয়ে যদি নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত নেন- তবে এটি মুদ্রাবাজারে বড় ধরনের শূন্যতা সৃষ্টি করবে। এই ‘শক’ সংকটকালীন অর্থনীতি নিতে পারবে না।’ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব মতে, বাজারে যে ৩ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকার সিইসি আছে, এর মধ্যে প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশই হলো ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট। অর্থাৎ প্রায় ২ লাখ ৭৫ হাজার থেকে ২ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা মূল্যের অর্থ কেবল এই দুটি উচ্চমানের নোটে রয়েছে। নগদ লেনদেননির্ভর এই অর্থনীতিতে একযোগে এ বিপুল পরিমাণ মুদ্রাবাজার থেকে তুলে নিলে পুরো সরবরাহ চেইন ও গ্রামীণ বাণিজ্য রাতারাতি অচল হয়ে পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক চিফ ইকোনমিস্ট এম কে মুজেরী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, চলমান আর্থিক পরিস্থিতিতে ব্যাংক নোট বাতিলের প্রস্তাবটিকে কোনোভাবেই বাস্তবসম্মত মনে হয়নি। দেশের অর্থনীতি এমনিতেই লাইফ সাপোর্টে আছে।
এ পরিস্থিতিতে সরকার নোট বাতিলের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিলে তা আর্থিক ও মুদ্রাবাজারে বিপজ্জনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে। বিআইডিএসের সাবেক এই মহাপরিচালক বলেন, ২০১৬ সালে পার্শ্ববর্তী ভারতে নোট বাতিলের ধাক্কা সামলানোর পেছনে তাদের শক্তিশালী ‘ইউপিআই’ (ইউনিফাইড পেমেন্টস ইন্টারফেস) নেটওয়ার্ক বড় ভূমিকা রেখেছিল, যা আমাদের ক্ষেত্রে এখনো প্রাথমিক স্তরে। বাংলাদেশ ব্যাংক বর্তমানে ‘বাংলা কিউআর’ বা ক্যাশলেস সোসাইটির যে লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে, তার ডিজিটাল অবকাঠামো এখনো সর্বস্তরে কার্যকর হয়নি। এ পরিস্থিতিতে বড় নোট বাতিল করা হলে মুদ্রাবাজার শূন্য হয়ে পড়বে। এই মুহূর্তে সরকারের উচিত হবে ব্যাংক খাতের প্রতি মানুষের আস্থার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ।