জুলাইয়ের চেতনাকে ধারণ করে ঐক্যবদ্ধভাবে পথচলার এবং নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের দৃঢ় প্রত্যয় আবারো ব্যক্ত করেছে রাজনৈতিক দলগুলো। তারা বলেছে, জুলাই বিপ্লব এদেশের ইতিহাসে এক অনন্য গৌরবগাথা। চব্বিশের জুলাই বিপ্লব স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও জনগণের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগের এক ঐতিহাসিক অধ্যায়। এই বিপ্লব শুধু একটি ঘটনার নাম নয়; এটি হলো বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে রক্ষার নতুন এক শপথ।
সরকারি দল ও বিরোধী দলের নেতারা মনে করেন, গত ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক জুলাই বিপ্লব বাংলাদেশে দেড় দশকের স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটিয়ে এক নতুন গণতান্ত্রিক যাত্রার সূচনা হয়। ১৪ শতাধিক শহীদ এবং প্রায় ৩০ হাজার আহত-পঙ্গু যোদ্ধার ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত এই বিপ্লব বৈষম্যহীন, দুর্নীতিমুক্ত এবং মানবাধিকার-ভিত্তিক একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার ছিল দৃঢ় প্রত্যয়। জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে দীর্ঘ ১৬ বছরের দুঃশাসন, দুর্নীতি আর ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পতনের পর সবাই একটি নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছে। সে স্বপ্ন, সে প্রত্যয় এখনো অটুট। তাই তো জুলাইয়ের চেতনায় নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে সব রাজনৈতিক দল এখনো ঐক্যবদ্ধ। তারা বলছে, জুলাইয়ের চেতনায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে পথ চলতে হবে। যেন কোনো অগণতান্ত্রিক, স্বৈরাচারী শক্তির আর কখনো আগমন ঘটতে না পারে।
শহীদদের স্মৃতি শুধু একটি দিনের জন্য নয়; একটি মাসের জন্যও নয়; তারা আমাদের প্রতিদিন জাগিয়ে রাখবে। ফ্যাসিবাদ পরাজিত হয়েছে; কিন্তু তার অবশিষ্টাংশ এখনো সমাজের নানা জায়গায় রয়েছে। তাদেরকে ঐক্যবদ্ধভাবে রুখতে হবে। এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে জুলাই বিপ্লবের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি-এনসিপি ও জামায়াতে ইসলামী মাসব্যাপী পৃথক কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। গতকাল ১ জুলাই থেকে শুরু হয়েছে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক জুলাই বিপ্লবের মাস। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলন একপর্যায়ে সরকারবিরোধী গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। দীর্ঘ আন্দোলন ও সঙ্ঘাতের পর ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। সরকারের পতন ঘটে। আন্দোলনে নিহত ও আহতদের স্মরণে ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে মাসব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি।
এর মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ‘ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্য’ গড়ে তোলা এবং জুলাইয়ের শহীদদের স্মরণে মাসব্যাপী কর্মসূচি পালন করছে। গতকাল ১ জুলাইয়ের প্রথম প্রহরে (৩০ জুন দিবাগত মধ্যরাতে) কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ‘আলোয় আলোয় স্মৃতি সমুজ্জ্বল’ শীর্ষক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে কর্মসূচির সূচনা হয়। এ সময় মোমবাতি প্রজ্বলন ও জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের মাধ্যমে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়। এতে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী আহমেদ বলেন, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ১৭ বছর আন্দোলনের সর্বোচ্চ বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে জুলাই-আগস্টে। তিনি বলেন, আমি চীনের প্রাচীর দেখিনি, আবু সাঈদের বুক দেখেছি। চীনের প্রাচীরের মতো বুক চিতিয়ে কীভাবে গুলি খেতে হয়, সেই দৃশ্য আমি দেখেছি। আমি হিমালয় দেখিনি; কিন্তু ওয়াসিম আকরামকে হিমালয়ের মতো দাঁড়িয়ে তপ্ত বুলেট বরণ করতে দেখেছি।
আমি প্রশান্ত মহাসাগর দেখিনি; কিন্তু আহনাফের মায়ের চোখের পানি দেখেছি। সেই অশ্রু প্রশান্ত মহাসাগরের চেয়েও গভীর। রিজভী বলেন, আমাদের আলোক প্রজ্বলিত করতে হবে। এই আলোর প্রজ্বলন শুধু এক দিনের জন্য নয়। প্রতিদিন সব কটি জানালা খুলে রাখতে হবে, যেন কোনো অগণতান্ত্রিক, স্বৈরাচারী শক্তির আর কখনো আগমন ঘটতে না পারে। শহীদদের স্মৃতি শুধু একটি দিনের জন্য নয়, একটি মাসের জন্যও নয়; তারা আমাদের প্রতিদিন জাগিয়ে রাখবে। ফ্যাসিবাদ পরাজিত হয়েছে; কিন্তু তার অবশিষ্টাংশ এখনো সমাজের নানা জায়গায় রয়েছে। সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে এদের রুখতে হবে। ছাত্রসমাজকে সবসময় সজাগ থাকতে হবে। ইতিহাস বলে, ছাত্রসমাজ কখনো ঘুমায় না। রিজভী আরো বলেন, এই আলো শুধু সাময়িক অন্ধকার দূর করার জন্য নয়, এটি ভুবনভরা আলো। জুলাইয়ের স্মৃতি আমাদের আলোকিত করবে, প্রজ্বলিত করবে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে আবার নতুন সংগ্রামে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা দেবে।
অন্য দিকে ‘দেশ গড়তে জুলাই জাগরণ’ স্লোগান সামনে রেখে ১ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত ৩৬ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি। কর্মসূচির অংশ হিসেবে গতকাল রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে কবর জিয়ারত এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী ছাত্রসংগঠনগুলোর সংহতি সভার আয়োজন করে দলটি। এছাড়া ২ থেকে ৮ জুলাই পর্যন্ত দেশব্যাপী গ্রাফিতি অঙ্কন, দেয়াললিখন, ব্যানার-ফেস্টুন প্রদর্শন ও পদযাত্রাসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করবে এনসিপি। গতকাল রাজধানীর রায়েরবাজারে জুলাই আন্দোলনে নিহতদের কবর জিয়ারত শেষে এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, শুধু নামকাওয়াস্তে জুলাই গণঅভ্যুত্থান পালন করলে চলবে না। জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে হবে। রাষ্ট্র কাঠামোর সংস্কার করতে হবে। জুলাই চেতনাকে মনেপ্রাণে ধারণ করে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে নতুল বাংলাদেশ গঠনে কাজ করতে হবে। জুলাই হত্যা মামলার তদন্ত ও বিচার ধীরগতিতে চলছে। এ প্রক্রিয়া আরো দ্রুত করতে হবে। ওসমান হাদির হত্যাকারীদের দেশে ফিরিয়ে আনতে হবে। শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে ফাঁসির রায় কার্যকর করতে হবে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে মাসব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। গত ৩০ জুন জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার কর্মসূচির ঘোষণা দেন। ঘোষিত কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে, ২ থেকে ৯ জুলাই রাজধানীতে গণঅভ্যুত্থানে শহীদ, আহত ও পঙ্গু পরিবারের সঙ্গে মতবিনিময় এবং অভ্যুত্থানের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলোতে স্মৃতিচারণ, আলোচনা ও দোয়া। ১৬ জুলাই শহীদ দিবস উপলক্ষে ঢাকার দুই মহানগরীর উদ্যোগে পৃথক আলোচনা সভা। ১৮ থেকে ৩১ জুলাই সারা দেশে শহীদ, আহত ও পঙ্গু পরিবারের সঙ্গে মতবিনিময়, স্মৃতিচারণ, আলোচনা ও দোয়া। ১ আগস্ট মহানগর, জেলা ও উপজেলায় গণমিছিল, ২ থেকে ৪ আগস্ট শ্রমিক সংগঠনের উদ্যোগে বিভিন্ন কর্মসূচি এবং ৫ আগস্ট জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবসে ১১ দলের উদ্যোগে রাজধানীসহ সারা দেশের সমাবেশ, মিছিলে সমর্থন ও অংশগ্রহণ। এ ছাড়া দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে জামায়াতের মহিলা বিভাগ ও ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবির পৃথক কর্মসূচি পালন করবে। পাশাপাশি জুলাই যোদ্ধাদের বিভিন্ন ফোরামের কর্মসূচিতেও দলটি অংশ নেবে।
জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা, জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা শুধু স্মরণ করার বিষয় নয়; বরং একটি বৈষম্যহীন, জবাবদিহিমূলক ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের অঙ্গীকার। এ চেতনা বাস্তবায়ন, ‘জুলাই সনদ’ কার্যকর করা এবং গুম, খুন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার নিশ্চিত করতে হবে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণে যে সংস্কার সনদ (চার্টার) তৈরি হয়েছিল তার ভিত্তিতে জনগণ গণভোট বাস্তবায়ন, সংবিধান সংস্কারের পক্ষে রায় দিলেও সরকার সেই রায় বাস্তবায়ন করেনি। জুলাইয়ের যে চেতনা যে প্রত্যাশা তা বাস্তবায়ন করতে হলে গণভোটের রায়ের আলোকে সংবিধান সংস্কার করতে হবে। আমরা চাই ঐক্যবদ্ধভাবে জুলাই চেতনাকে ধারণ করে ইনসাফ ও ন্যায়ের নতুন বাংলাদেশ গড়তে। আশা করি সরকার এ বিষয়টি উপলব্ধি করে জনগণের প্রত্যাশাপূরণে তারাও যথাযথ ভূমিকা রাখবে।