ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে। দেশে চলতি মাসে এখন পর্যন্ত মশাবাহিত এ রোগে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় দুই হাজার। আর জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে আক্রান্তের সংখ্যা পাঁচ হাজারের বেশি। আক্রান্তদের বেশিরভাগই তরুণ, যা মোট আক্রান্তের ৫৭ শতাংশ। কম বয়সীরাও উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় ডেঙ্গুতে ভুগছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার অ্যান্ড কন্ট্রোল রুমের দেওয়া তথ্যে উঠে এসেছে এ চিত্র। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃতদের বয়সভিত্তিক হিসাব রাখে পাঁচ বছর অন্তর হিসাবে। অর্থাৎ শূন্য থেকে পাঁচ বছর, ছয় থেকে ১০ বছর— এই ক্রমে। সে তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ১৬ থেকে ৪০ বছর বয়সীরা সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে। এই সংখ্যা ২ হাজার ৯২১ জন, যা মোট আক্রান্তের ৫৭ শতাংশ। আর শূন্য থেকে ১৫ এবং ৪০-৮০ বছর বয়সীরা আক্রান্তের ৪৩ শতাংশ, ২ হাজার ২৩৯ জন।
এই বয়সীরা কেন বেশি আক্রান্ত হচ্ছে, তা জানতে কথা হয় বাংলাদেশের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেনের সঙ্গে। তিনি বললেন, ‘এই বয়সী ব্যক্তিরা পড়াশোনা ও কাজের জন্য বেশিরভাগ সময় বাসার বাইরে থাকে। তাই আক্রান্তও তারা বেশি হয়। ঝুঁকিও তাদের অন্যদের তুলনায় বেশি। তবে ডেঙ্গুতে শিশুরা আক্রান্ত হলে জটিলতা বেশি হওয়ার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি থাকে।’
২৩ বছরের ফয়সাল মাহমুদ উত্তর সিটি করপোরেশনের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেন। আরও কয়েকজনের সঙ্গে ভাড়া থাকেন কাফরুলের ইব্রাহিমপুরে। গত সপ্তাহে এই তরুণ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে তিন দিন হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। এখন চিকিৎসকের পরামর্শে বাসায় অবস্থান করছেন। এখনো শরীরে দুর্বলতা ও মাথাব্যথা রয়েছে।
বাসায় মশারি টানিয়ে ঘুমান, তাই কোথা থেকে মশার কামড় খেয়েছেন বলতে পারলেন না ফয়সাল। আগামীর সময়কে বললেন, ‘সব জায়গাতেই মশা। বাসায় মশা, ভার্সিটিতে মশা, এমনকি নামাজ পড়তে গেলেও মশা কামড়ায়।’
দেশে কয়েক বছর ধরেই বর্ষা মৌসুম এলেই প্রকোপ বাড়ে ডেঙ্গুর। সবচেয়ে বেশি দেখা যায় জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। তবে বর্ষাকাল প্রলম্বিত হলে অক্টোবর, নভেম্বরেও ডেঙ্গু রোগীর দেখা মেলে, ঘটে মৃত্যুও। এ সময় বৃষ্টির পানি ছোট ছোট নালা, গর্তে জমে মশার প্রজনন বেড়ে যায়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে চলতি বছর ১০ জন মারা গেছে। এর মধ্যে পাঁচজনই জুন মাসে। আর নির্দিষ্ট করে বললে, গত সপ্তাহেই তিনজন। অর্থাৎ ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার সব রকম ইঙ্গিত মিলতে শুরু করেছে। আক্রান্তের সংখ্যাও বাড়ছে দিনদিন। গত সপ্তাহে আক্রান্ত হয়েছে ৪৮০ জন। জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা ৫ হাজার ১৬০ জন। তবে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা গত বছরের তুলনায় এখনো কম।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার অ্যান্ড কন্ট্রোল রুমের দেওয়া তথ্যে দেখা যাচ্ছে, এ বছর ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনসহ ঢাকা বিভাগ, বরিশাল বিভাগে, চট্টগ্রাম বিভাগ, খুলনা বিভাগে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী বেশি পাওয়া যাচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবার আগেভাগে বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে পারে। এখন থেকেই প্রস্তুতি না নিলে বড় ধরনের বিপদ হতে পারে। শুধু হাসপাতালকেন্দ্রিক নয়, সবচেয়ে বেশি জোর দিতে হবে প্রতিরোধের ওপর।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন বলছিলেন, ‘গতানুগতিক পদ্ধতিতে কাজ করে ডেঙ্গু প্রতিরোধ সম্ভব নয়। কমিউনিটিকে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করাতে হবে। একই সঙ্গে মশা ও মশার লার্ভাও খুঁজে ধ্বংস করতে হবে। পাশাপাশি রোগী খুঁজেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। কমিউনিটি পর্যায়ে রোগ না কমলে সবার চিকিৎসা নিশ্চিত করাও কঠিন, মৃতের সংখ্যা বাড়বে।’
ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতায় আসার পরে গত মার্চ থেকে ডেঙ্গু প্রতিরোধে জোর দিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে গতকাল মঙ্গলবার ডেঙ্গু প্রতিরোধে জাতীয় কমিটির প্রথম সভায় মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে টাস্কফোর্স গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এই টাস্কফোর্সের তত্ত্বাবধান করবেন। সচিবালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত এই সভায় সভাপতির বক্তব্যে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেছেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। ডেঙ্গু মোকাবিলায় শুধু সরকারি উদ্যোগ নয়, জনগণের সচেতনতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীন সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালনের নির্দেশনা দেওয়া হয়। সভায় ডেঙ্গু ও অন্যান্য মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।