কঠিন সময়ে ছিলেন সিলেটের ডিসি সারওয়ার আলম। মাজারের হিসাবের স্বচ্ছতা নিয়ে ছিলেন হার্ডলাইনে। নানামুখী চাপেও ছিলেন পর্যুদস্ত। প্রত্যাহারের পত্র আসার পর তিনি দায়িত্ব হস্তান্তরের জন্য ‘যৌক্তিক’ সময়ের অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু সময় দেয়া হয়নি তাকে। সার্কিট হাউজে ডেকে নিয়ে দায়িত্ব হস্তান্তর করা হয়। বলা হয়েছিল রাতেই সিলেট থেকে চলে যেতে। কিন্তু সময় নিয়ে একদিন পর মঙ্গলবার তিনি সিলেট ছাড়লেন। যাওয়ার সময় নিজের ফেসবুক আইডিতে লিখে গেলেন- বিদায় সিলেট। ভালো থাকুন সিলেটবাসী। আপনাদের ভালোবাসায় আমি ধন্য। রোববার দুপুরে সিলেটের ডিসি সারওয়ার আলমের প্রত্যাহারের পত্র সিলেটে এসে পৌঁছায়। তখন তিনি সিলেটে অফিসেই ছিলেন। বিকালের মধ্যে চাউর হয় প্রত্যাহারের খবরটি। সিলেট জেলা প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন- এমন খবরের জন্য প্রস্তুত ছিলেন না ডিসি সারওয়ার আলম। হঠাৎ প্রত্যাহারে তিনি হতাশ হন।
সন্ধ্যায় এ নিয়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করেন। সেখানে কিছুটা আবেগ আপ্লুত ছিলেন তিনি। বিকাল থেকেই অফিসের সামনে তার পক্ষে মিছিল। ডিসি’র প্রত্যাহার দাবিতে অনেকেই মাঠে। পরিস্থিতি সরব। তারা জানিয়েছেন- প্রত্যাহারের নির্দেশ এলে দায়িত্ব ছেড়ে দিতে বেশি সময় দেয়া হয় না। এ কারণে পরদিন রোববার সকাল থেকেই শুরু হয় বিদায়ের অপেক্ষা। তবে জেলা প্রশাসকের কর্মকাণ্ডে সেটি পরিলক্ষিত হয়নি। তার অফিসের সামনে বিক্ষোভ।
তাকে চায় সিলেটের মানুষ। ফলে দায়িত্ব হস্তান্তরে কিছুটা সময় নিতে চান তিনি। ধীরে, সুস্থে ছাড়তে চান সিলেট। প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা মানবজমিনকে জানিয়েছেন- যেহেতু প্রত্যাহার করা হয়েছে তাকে দ্রুতই সিলেট ছাড়ার নির্দেশ আসে ঢাকা থেকে। কালক্ষেপণ করতে চাননি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। মাজার নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে মতামত আছে। পরিস্থিতি ঘোলাটে হতে পারে- এমন আশঙ্কাও ছিল। ফলে সোমবার দুপুরের মধ্যেই তাকে দায়িত্ব হস্তান্তরের জন্য তাগিদ দেয়া হচ্ছিল। ওইদিন বেলা ১টায় অফিস ছাড়লেন ডিসি সারওয়ার। মাজারে গিয়ে দানবাক্স খুললেন।
টাকা গণনা শুরু করলেন। বিষয়টি ভাইরাল। গোটা দেশের মানুষের নজর মাজারের দিকে। ডিসি তখন বসে আছেন মাদ্রাসার অফিস কক্ষে। ওই কর্মকর্তারা জানিয়েছেন- ঢাকা ও সিলেটের ঊর্ধ্বতন প্রশাসনের কর্মকর্তারা বারবার তাকে ফোন দিচ্ছিলেন। রিসিভ হচ্ছিলো না। নদীর ওপার থেকে সার্কিট হাউজে আসেন বিভাগীয় কমিশনার ও অতিরিক্ত সচিব মশিউর রহমান। লোক মারফতে সার্কিট হাউজে ডেকে পাঠানো হয় ডিসি সারওয়ার আলমকে। গণনা শেষ করতে পারেননি। খবর পেয়ে সার্কিট হাউজের পথ ধরেন। ততক্ষণে সার্কিট হাউজে সব প্রস্তুত। দায়িত্ব হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত। ডিসি চেয়েছিলেন নিজের মনোনীত এক অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করতে। সেটিও হয়নি। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পিংকি সাহাকে দায়িত্ব দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়।
তাই হলো। দায়িত্ব হস্তান্তর করতে করতে রাত ১০টা বেজে গেল। ততক্ষণে নতুন ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক দায়িত্ব নিলেন। সরিয়ে নেয়া হলো ডিসি হিসেবে সারওয়ার আলমের নিরাপত্তার দায়িত্ব। রাতে সিলেট ছাড়েননি ডিসি সারওয়ার আলম। গতকাল দুপুরে তিনি বিমানযোগে সিলেট ত্যাগ করেন। তবে সকালে তিনি সার্কিট হাউজে কর্মকর্তাদের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করেছেন। দিয়েছেন কিছু নির্দেশনাও। মাজারের টাকা রাখলেন অ্যাকাউন্টে: সিলেটের শাহজালাল (র.) মাজারের আয়-ব্যয়ের হিসেবে বিষয়টি এতদিন অন্ধকারেই ছিল। দানের মাধ্যমে কতো টাকা আয় হয় সেটি কেউ জানতেন না। হিসাব দেখিয়ে গেলেন ডিসি সারওয়ার। গত বৃহস্পতিবার দানবাক্সে দেয়া হয় সিলগালা। সোমবার দুপুরের পর সেটি খোলা হয়। মাত্র তিনদিন সময়। এই সময়ে উঠেছে ১৭ লাখ ৬৫ হাজার টাকা।
সন্ধ্যায় টাকা নিয়ে আসা হয় ডিসি অফিসে। পাশের সোনালী ব্যাংকের শাখাতে খোলা হয়েছিল নতুন অ্যাকাউন্ট। ওই অ্যাকাউন্টে রাখা হয় টাকা। ডিসি অফিসের সাধারণ শাখার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন- মাজারের দানের যে টাকা উঠেছিল সেগুলো ওই অ্যাকাউন্টে রাখা হয়েছে। এই টাকার সঙ্গে জেলা প্রশাসক তার তহবিল থেকে আরও ৫ লাখ টাকা অনুদান দিয়েছেন। সবমিলিয়ে ২২ লাখ ৬৫ হাজার টাকা বর্তমানে অ্যাকাউন্টে রয়েছে। রয়েছে ডলার, পাউন্ড, রিয়াল ও স্বর্ণালংকারও।