ক্যালেন্ডারের পাতার সঙ্গে হিসাব মিলিয়ে ঘুষ নেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলার মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আসলাম খান। যেমন এই ২০২৬ সালে তার ন্যূনতম ঘুষের রেট হচ্ছে ‘২০২৬ টাকা’। ২০২৫ টাকা ছিল ২০২৫-এ। শুনতে বেশ আজব মনে হলেও ‘বাঁ হাতের’ কাজটা তিনি ঠিক এ কায়দায় চালিয়ে যাচ্ছেন দিনের পর দিন। তাও গোপনে নয়, প্রকাশ্যেই। ক্যালেন্ডার মেলানো এই রেট হচ্ছে শুধু সাধারণ ফাইলে সই করা বাবদ। এর বাইরে রয়েছে তার ঘুষ খাওয়ার আরও খাত, উপখাত। যেমন— বিনামূল্যের বই বিতরণে শিক্ষার্থীপ্রতি রেট ২০ টাকা, এমপিওভুক্তির ফাইলে দুই মাসের পুরো বেতন আর একটু বেশি ঝামেলার কাজ হলেই নগদে গুনতে হয় পুরো লাখ টাকা। অর্থাৎ, দপ্তরের প্রতিটি কাজের জন্যই রয়েছে তার আলাদা রেট। শিক্ষা কর্মকর্তার এ ‘ঘুষ ম্যানিয়া’ থেকে রেহাই পান না তার নিজের অফিসের কর্মচারীরাও। তার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগের পাহাড় জমেছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তরে। বিভিন্ন অভিযোগের ভিত্তিতে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে আসলাম খানের ঘুষ খাওয়ার অভিনব বাতিক ও খামখেয়ালি আচরণের গল্প।
অনুসন্ধানে আরও মিলেছে, সরকারি এ কর্মকর্তার লুঙ্গি ও গামছা পরে অফিস করার তথ্যও। আর এমন কাণ্ডকারখানা তার জন্য নতুন কিছু নয়। এর আগেও কর্মস্থলে একই কায়দায় ঘুষ নেওয়ায় ৩২ বার বদলি ও ১২ বার বিভাগীয় মামলা খেয়েছেন। তবে এগুলোকে শাস্তি নয়, ‘আশীর্বাদ’ হিসেবে দেখেন আসলাম খান। অন্যদিকে শোকজ দিতে দিতে ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে নিতে ক্লান্ত মাউশিও এবার তাকে স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত করতে চায়। এর জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুশাসন চেয়েছে তারা। সর্বশেষ উপজেলা প্রশাসনও বিজয়নগর থেকে আসলামকে দ্রুত সরিয়ে দিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে।
জানতে চাইলে মাউশির উপপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক মো. শাহজাহান আগামীর সময়কে বললেন, ‘তাকে (আসলাম খান) বদলি করলেই সমাধান হবে না। যেখানে পাঠানো হবে সেখানেও একই কর্ম করবেন। তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলার পাশাপাশি চাকরিচ্যুত করার জন্য মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছি। এখন সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছি।’
বিজয়নগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সকিনা আক্তার আগামীর সময়কে বললেন, ‘আমি এই উপজেলায় যোগদান করার পর থেকে আজ পর্যন্ত ওই শিক্ষা কর্মকর্তাকে একদিনও অফিসে দেখিনি। তার অনুপস্থিতির কারণে এসএসসি পরীক্ষাসহ শিক্ষা অফিসের সব দাপ্তরিক কাজ স্থবির হয়ে পড়েছে। জেলা শিক্ষা অফিস থেকে বিকল্প ব্যবস্থায় একজন কর্মকর্তা এসে জোড়াতালি দিয়ে কাজ চালিয়ে নিচ্ছেন। শিক্ষকদের সঙ্গে চরম দুর্ব্যবহার, প্রতিটি কাজের জন্য বাধ্যতামূলক ঘুষ নেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে আসলামের বিরুদ্ধে। এমনকি বছরের সঙ্গে মিল রেখে যেকোনো ফাইলে স্বাক্ষরের জন্য সমপরিমাণ টাকা ঘুষ নেন বলেও জানতে পেরেছি।’
ইউএনওর আরও অভিযোগ, ২০২৫ সালে ১৮ ডিসেম্বর বই বিতরণের সভা চলাকালে আসলাম খান প্রতি শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ২০ টাকা হারে চাঁদা দাবি করেন। শিক্ষকরা প্রতিবাদ করলে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে তার সামনেই তাদের সঙ্গে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করে সভা থেকে বেরিয়ে যান। এ সময় তিনি সরকারপ্রধান, শিক্ষা সচিব, মাউশির ডিজি, জেলা প্রশাসককেও অকথ্য ভাষায় গালাগাল করেন।
এ বিষয়ে বিজয়নগরের দাউদপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. শাহজাহান আগামীর সময়কে বললেন, ‘পাঠ্যবই নিতে গেলে আসলাম খান প্রকাশ্যে আমার কাছে ঘুষ চান। প্রতিটি কাজের জন্যই তাকে ঘুষ দিতে হয়। একেক কাজের একেক রেট ঠিক করে রেখেছেন। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো— তার সর্বনিম্ন ঘুষের রেট তিনি ঠিক করেন বছরের সঙ্গে মিল রেখে। চলতি বছর তিনি ২০২৬ টাকার কমে কোনো ঘুষ নেননি। গত বছর সেটি ছিল ২০২৫ টাকা। এটা বিজয়নগরে ওপেন সিক্রেট।’
আসলাম খানের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ পাওয়া গেছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন যুগ্ম সচিব নুর ই আলমকে গালাগাল করার। ২০২৩ সালে বান্দরবানের থানচিতে কর্মরত থাকাকালে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি মিটিং চলছিল। সে সময় আসলামকে ভিডিও মোড অন করতে বলা হলেও তিনি সেটা না করে গান শুনতে থাকেন। একপর্যায়ে ওই যুগ্ম সচিবকে তিনি বলেন, ‘আপনার প্রশিক্ষণ আপনি করান, আমি গান শুনতেছি।’ এরপর তাকে ডিসকানেক্ট করতে বলায় তিনি ওই যুগ্ম সচিবকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল শুরু করেন। ওই ঘটনায় তাকে শোকজ করা হলেও জবাব দেননি। সরকারি আদেশ অমান্য ও অসদাচরণের জন্য তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করে থানচি থেকে সন্দ্বীপে বদলি করা হয়।
অভিযোগ আছে, সন্দ্বীপে গিয়েও একই কায়দার ঘুষ নিতে শুরু করেন আসলাম খান। এমনকি এক প্রবাসীর কাছ থেকেও একটি কাজের বিনিময়ে তিনি ঘুষ চান ভিডিও কলে। তাতে রাজি না হওয়ায় ওই প্রবাসীকে হুমকি দিয়ে বলেন, ‘আমি হ্যান্ডসাম অ্যামাউন্ট ড্র করি। টাকা-পয়সা, বাড়ি-গাড়ির অভাব নেই। কাউকে হত্যা করতে আমার এক সেকেন্ড সময় লাগে, আমি দেড় সেকেন্ড নিই না।’
এ ছাড়া সন্দ্বীপে থাকাকালে অফিসে মাতলামি ও নারী শিক্ষকদের সঙ্গে অশোভন আচরণের অভিযোগ রয়েছে আসলাম খানের বিরুদ্ধে। তার কয়েকটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। যেখানে তাকে খালি গায়ে চিৎকার করতে এবং প্রকাশ্যে মাদক সেবন করতে দেখা যায়। একপর্যায়ে প্রশাসন তাকে তার নিজ জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগরে পাঠায়। কিন্তু সেখানেও একই অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, একের পর এক অভিযোগ আসার পরিপ্রেক্ষিতে শুনানির জন্য সম্প্রতি আসলাম খানকে ডাকা হয় মাউশি অধিদপ্তরে। সেই শুনানি চলাকালেও এক কর্মকর্তাকে মারতে যান তিনি। তাকে নিবৃত করতে গেলে সবাইকে গালাগাল করতে করতে আসলাম বলেন, ‘আমি ৩২ বার বদলি হয়েছি, ডজনখানেক বিভাগীয় মামলা খেয়েছি। এগুলো আমার বন্ধু।’ কর্মকর্তারা একপর্যায়ে তাকে পুলিশে দেওয়ার চিন্তা করেও শেষপর্যন্ত সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বিরত থাকেন।
এদিকে বিজয়নগরের শিক্ষক-কর্মচারীদের অভিযোগ, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার আচরণে সবাই বিরক্ত। ঘুষ না দেওয়ায় সেসিপ প্রকল্পে শিক্ষকরা বেতন পাচ্ছেন না ছয় মাস। এমন একটি অভিযোগ নিয়ে কয়েক দিন আগে শিক্ষা ভবনে আসেন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কর্মসম্পাদন ব্যবস্থাপনা বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব এবং বিজয়নগর উপজেলার সাবেক ইউএনও ইয়াসমিন নাহার রুমা। আগামীর সময়কে তিনি বললেন, ‘একজন সরকারি কর্মকর্তা হয়েও আসলামের আচরণ যে কত জঘন্য তা না দেখলে, না শুনলে বোঝা যাবে না। আমি যেহেতু ইউএনও ছিলাম তাই এলাকার লোকজন এখনো আমাকে ফোন করেন। তাই তাকে (আসলাম) দ্রুত সরানোর জন্য অনুরোধ করতে অধিদপ্তরে এসেছি।’
এ ব্যাপারে মাউশির উপপরিচালক মো. শাহজাহান বললেন, ‘প্রতিনিয়ত স্থানীয় লোকজন, কর্মকর্তারা ফোন ও চিঠিতে অভিযোগ করছেন। কী করব বুঝতে পারছি না। তাকে যেখানে পাঠাব সেখানেই একই কর্মকাণ্ড করবেন। এখন তাকে বাধ্যতামূলক চাকরিচ্যুত করা ছাড়া বিকল্প কিছু দেখছি না। এর জন্য মন্ত্রণালয়ের অনুশাসন চেয়েছি।’
এসব অভিযোগের বিষয়ে আসলাম খানকে একাধিকবার ফোন করা হয়। সাড়া না পাওয়ায় অভিযোগের বিষয় উল্লেখ করে তার মোবাইল ফোনে এসএমএস পাঠানো হয়। তবে তাতেও সাড়া দেননি। পরে উপজেলা শিক্ষা অফিসের অন্য কর্মকর্তাদের মাধ্যমে তার বক্তব্য জানতে চাওয়া হয়। কিন্তু তিনি কোনো বক্তব্য দেননি।