করোনা মহামারীর বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বিশ্ব অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। যার প্রভাব এখনো বিরাজমান। করোনার ধাক্কা সামলে নেয়ার আগেই ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ আবারো বিপর্যয়ে পড়ে বৈশ্বিক অর্থনীতি। বর্তমানে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যকার এই যুদ্ধ চার বছর পেরিয়ে পঞ্চম বছরে গড়িয়েছে। তবে আশার কথা, চলতি বছরের মধ্যেই এই যুদ্ধ শেষ হচ্ছে। যা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য সুখবর। তবে করোনার প্রভাবে দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসে। সেই ধাক্কা সামলে নেয়ার আগেই দেশের অর্থনীতিতে পড়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব।
যা ২০২৩ সালে দেশের অর্থনীতিতে আরো বিপর্যস্ত করে। আর ২০২৪ সালে বৈশ্বিক মন্দা এবং স্বৈরাচার হাসিনারবিরোধী আন্দোলনে দেশের অর্থনীতিতে টালমাটাল পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। হাসিনার ভারতে পলায়নের পর অন্তর্বর্তী সরকারের নানামুখী ভুল নীতিতে অর্থনীতি আরো বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। এরপর চলতি ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের মাধ্যমে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এলে অর্থনীতিতে গতি ফেরার সম্ভাবনা জাগ্রত হয়েছিল। কিন্তু নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পরপরই মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতির পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিকেও অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দিয়েছিল। অর্থনীতি সচলের চাকা জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হয়ে পড়ে। খাদ্য উৎপাদনের নিয়ামক সারের দামও বাড়ে। এর প্রভাবে একদিকে বেড়েছে পরিবহন খরচ, আমদানি ব্যয় ও খাদ্যপণ্যের দাম। তবে প্রায় চার মাস পরে এসে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চুক্তি হওয়ায় মিলেছে স্বস্তি। যুদ্ধের প্রভাবে যে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১১৫ ডলার উঠেছিল; তা বর্তমানে নেমেছে ৭০ থেকে ৮০ ডলারে। গতকাল মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক বাজারের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি সামান্য কমে ৭৭ দশমিক ৭০ ডলারে নেমে এসেছে।
একই সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজার ভিত্তিক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআই তেলের দামও ব্যারেলপ্রতি কমে ৭৩ দশমিক ৭৪ ডলারে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক সরবরাহ সংকটের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে সারারে দাম বৃদ্ধি পায়। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার শান্তি চুক্তি হওয়ার আগেই সারের দাম কমেছে। খাদ্য উৎপাদনের অন্যতম উপাদান নাইট্রোজেনভিত্তিক রাসায়নিক সার, বিশেষ করে ইউরিয়ার দাম সারের দাম কমেছে ৫০ শতাংশ। যা এখন আরো কমতে পারে বলে সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বর্তমানে মালয়েশিয়া এবং চীন সফরে রয়েছেন। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরো জোরদার করতে প্রধানমন্ত্রী মালয়েশিয়ার শীর্ষ করপোরেট বিখ্যাত পেট্রোনাস গ্রুপ, আজিয়াটা, এয়ারএশিয়া, পেরোডুয়া এবং এমফোর্সের মতো শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী গ্রুপের প্রধানদের বাংলাদেশে সুযোগ ও সম্ভাবনা তুলে ধরে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন। আইসিটি, জ্বালানি, অবকাঠামো, হালাল অর্থনীতি, কৃষি প্রক্রিয়াকরণ, সেমিকন্ডাক্টর এবং ডিজিটাল অর্থনীতির মতো উচ্চমূল্যের খাতগুলোকে বিনিয়োগের প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি দ্রুত বাস্তবায়নের বিষয়ে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইবরাহিমের সাথে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিপুল জনসংখ্যা এবং বিশাল ভোক্তা বাজারের সুবিধা নিতে মালয়েশিয়ার বিনিয়োগকারীদের জন্য সরকার নীতিগত সহায়তা প্রদান ও সব ধরনের নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা হবে বলে আশ্বস্ত করা হয়েছে।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতার ফলে হরমুজ প্রণালী খুলে গেছে। এতে জ্বালানি আমদানির ব্যয়, উৎপাদন ও পরিবহন খরচ এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমতে পারে। বিশেষ করে অর্থনীতির চালিকাশক্তি জ্বালানির দাম কমা এবং খাদ্য উৎপাদনের অন্যতম অনুষঙ্গ সারের দাম কমা দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত স্বস্তিদায়ক। এতে নতুন সরকারের বাজেট বাস্তবায়ন যেমন সহজ হবে, তেমনি কমবে আমদানি ব্যয়-রিজার্ভের চাপ-ডলারের চাহিদা ও মূল্যস্ফীতি। একই সঙ্গে বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও সারের দাম কমে এলে তা বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়, কৃষি উৎপাদন খরচ হ্রাস, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ, শিল্প সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান ও রফতানি খাতের প্রবৃদ্ধিতে বিশাল সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে। দেশের বর্তমান বিপর্যস্ত অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে তেল, গ্যাস ও সারে সমৃদ্ধ হওয়ার বিকল্প নেই বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
সূত্র মতে, বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এবং এলএনজির বড় অংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে যায়। কাতার থেকে বাংলাদেশে আমদানি হওয়া প্রায় সব এলএনজিই এই পথ ব্যবহার করে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা জ্বালানি তেল, পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য ও শিল্প কাঁচামালের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। যুদ্ধ শুরুর পর ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম দ্রুত বাড়ে। এলএনজির স্পট মার্কেটেও অস্থিরতা দেখা দেয়। পাশাপাশি জাহাজের যুদ্ধঝুঁকি বিমা প্রিমিয়াম বাড়তে শুরু করে। ফলে পণ্যের দাম ও পরিবহন ব্যয়Ñ দুইই বেড়ে যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি গড়ে ১০ ডলার বাড়লে দেশের বার্ষিক আমদানি ব্যয় ১ থেকে ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বাড়ে। এলএনজির দাম প্রতি এমএমবিটিইউ ২ থেকে ৩ ডলার বাড়লে পেট্রোবাংলার অতিরিক্ত ব্যয় কয়েক শ’ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। অর্থাৎ যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে শুধু জ্বালানি খাতেই অতিরিক্ত ব্যয় কয়েক বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর আশঙ্কা ছিল। এখন সেই অতিরিক্ত ব্যয়ের আশঙ্কা কমে আসবে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য সরকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করেছে। এর মধ্যে জ্বালানি ও সার আমদানির জন্য প্রায় ৭১ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত ভর্তুকি বরাদ্দ রাখা হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও এলএনজির দাম ১০-১৫ শতাংশ কমে এলে সরকারের জ্বালানি আমদানিতে বছরে সেই কয়েক হাজার কোটি টাকা সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে ভর্তুকির চাপও কমবে। অর্থাৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে রাজস্ব ও ব্যয়ের ভারসাম্য রক্ষা তুলনামূলক সহজ হবে। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ডলারের সংকট। জ্বালানি আমদানিতে অতিরিক্ত ব্যয় মানেই রিজার্ভ থেকে বেশি ডলার বের হয়ে যাওয়া। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে তেল, এলএনজি ও অন্যান্য আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সেই ঝুঁকি আরো তীব্র হয়েছিল। অপরদিকে বিশ্ববাজারে আমদানিনির্ভর সারের দাম কমলে কৃষকদের উৎপাদন খরচ কমে যায়। যা কৃষকদের লাভবান করবে এবং খাদ্যশস্যের উৎপাদন বাড়িয়ে দেশের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তাকে সুদৃঢ় করবে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় জ্বালানি মূল্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনশীল উপাদানগুলোর একটি। একই সঙ্গে সার খাদ্য উৎপাদনের অন্যতম উপাদান। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে ডলারের চাহিদা কমবে, রিজার্ভ সংরক্ষণ সহজ হবে এবং বিনিময় হারও তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকবে। তার মতে, আমদানি ব্যয় তিন-চার বিলিয়ন ডলার কমে এলে রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় তাৎপর্যপূর্ণ ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
জ্বালানি ব্যয় বাড়লে তার প্রভাব পড়ে অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি খাতে। পরিবহন, উৎপাদন ও কৃষি ব্যয় বাড়ে, বাড়ে পণ্যের দামও। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান-বিআইডিএসের সাবেক মহাপরিচালক ও অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, মূল্যস্ফীতির বড় অংশ এখন কস্ট-পুশ বা ব্যয়জনিত। জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় কমতে শুরু করলে তার ইতিবাচক প্রভাব পুরো সরবরাহ-শৃঙ্খলে ছড়িয়ে পড়বে। খাদ্যপণ্য থেকে শিল্পপণ্য পর্যন্ত প্রায় সব ক্ষেত্রেই চাপ কমবে। তার মতে, আন্তর্জাতিক বাজার স্থিতিশীল থাকলে আগামী এক বছরের মধ্যে মূল্যস্ফীতির ওপর ১ থেকে ১ দশমিক ৫ শতাংশ পয়েন্ট পর্যন্ত ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
জ্বালানি, বিদ্যুৎ, কাঁচামাল আমদানি ব্যয় ও ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে বহু শিল্পপ্রতিষ্ঠান নতুন বিনিয়োগ পরিকল্পনা স্থগিত রেখেছিল। ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ মনে করেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে অনেক বিনিয়োগ প্রকল্প পিছিয়ে যেত। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ব্যবসায়ীদের আস্থা ফিরবে এবং নতুন বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নেয়া সহজ হবে। তার মতে, উৎপাদন ব্যয় কমলে শিল্প খাতের সক্ষমতা বাড়বে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি বৃদ্ধি পাবে।
বাংলাদেশের রফতানি খাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাকশিল্প, আমদানি কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল। শিপিং ব্যয়, কাঁচামালের মূল্য ও জ্বালানি ব্যয় বাড়লে উৎপাদন খরচও বেড়ে যায়। পোশাক খাতের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, জ্বালানির দাম ও খাদ্য উৎপাদনের অন্যতম উপাদান সারের দাম দাম কমা এবং আমদানিতে ব্যয় কমলে আমরা আন্তর্জাতিক বাজারে আরো প্রতিযোগিতামূলক হতে পারব। এতে নতুন অর্ডার আসবে এবং রফতানি আয় বাড়বে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মাসরুর রিয়াজ বলেন, শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী জ্বালানি নিশ্চিত করা গেলে উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে সার ও ডিজেলের দাম (যা সেচকাজে ব্যবহৃত হয়) কমলে কৃষি উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। এতে কৃষকরা লাভবান হবেন এবং দেশে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়বে এবং রফতানি আয় বাড়ানোর নতুন সুযোগ তৈরি হবে। যা দেশের আগামী অর্থনীতির জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে বলে উল্লেখ করেন এই অর্থনৈতিক বিশ্লেষক।