Image description

ন্দ্বে গোলাগুলির ঘটনা। এ ছাড়া রয়েছে ডাকাতি ও পুলিশের ওপর হামলার তথ্য। এমন কোনো অপরাধ নেই যা এই এলাকায় ঘটছে না। শত শত নয়, হাজার হাজার গ্রেপ্তারের পরও অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অনেকটাই নিরুপায় থাকতে হচ্ছে। সেই সঙ্গে জনমনে প্রশ্ন জাগছে মোহাম্মদপুর কি কখনোই অপরাধমুক্ত হবে না? মনে অজানা আতঙ্ক নিয়েই পথ চলতে হবে আজীবন? এলাকাবাসীর মন্তব্য, মোহাম্মদপুর বর্তমানে চট্টগ্রামের আলোচিত জঙ্গল সলিমপুরের মতো মনে হয়। পার্থক্য শুধু এতটুকু এটি সিটির মধ্যে আর সলিমপুর বাইরে। যদিও পুলিশ বলছে, বিহারি ক্যাম্প ও ভাসমান মানুষের সংখ্যা বেশি হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা খুবই চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়ে। এরপরও তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, জুলাই আন্দোলনের সময় থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র জেনেভা ক্যাম্পের সন্ত্রাসীদের আরও বেপরোয়া করে তোলে। এ ছাড়াও পুলিশের মনোবলের ঘাটতি, সোর্সের অভাব, অপরাধীদের ওপর রাজনৈতিক ছত্রছায়াসহ বিভিন্ন কারণে এলাকাটি বিশেষ গোষ্ঠীর নিরাপদ আস্থানায় পরিণত হয়েছে। মোহাম্মদপুরের আল্লাহ করিম মসজিদের পাশের বাসিন্দা মো. শফিক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘অজানা আতঙ্ক নিয়ে মোহাম্মদপুরে বসবাস করতে হয়। কারণ এখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা থাকলেও সেটি যথেষ্ট নয়।

আর যারা গ্রেপ্তার হয় তাদের দুই-এক দিন বা কিছুদিন পরেই একই এলাকায় দেখা যায়। যা থেকে আমরা অনুমান করি এসব অপরাধীর পেছনে অদৃশ্য কোনো প্রভাবশালী ছায়া রয়েছে। অন্যথায় এত দ্রুত বের হয়ে আসা সম্ভব নয়। আর পুলিশের ওপর হামলা করার মতো দুঃসাহস হওয়ারও কথা নয়।’ মো. শফিক আরও বলেন, ‘রাত ৮টার পর ও ভোরে সড়কে চলাচল সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। রিকশা, ফুটপাত, ফুট ওভারব্রিজসহ যেকোনো স্থানে যেকোনো সময় চাপাতি হাতে ছিনতাইকারী পথ আগলে দাঁড়ায়। এজন্য আমরা রাত ৮টার আগেই বাসায় চলে আসার চেষ্টা করি।’ শুধু শফিকই নন মোহাম্মদপুরের বেশ কয়েকজন বাসিন্দা একই রকম তথ্য জানিয়েছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা জানান, মোহাম্মদপুর এলাকায় বসবাস করে আর চাঁদাবাজি অথবা ছিনতাইয়ের শিকার হয়নি এমন মানুষ খুবই কম। এখানে ছিনতাইয়ের শিকার না হওয়াই যেন সৌভাগ্য। অনেকে নিজের বাসার দরজার সামনে থেকেও ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছেন। আবার অনেককে তুচ্ছ ঘটনায় এলোপাতাড়ি কুপিয়ে জখম করছে বিভিন্ন গ্যাংয়ের সদস্যরা। আধিপত্য বজায় রাখতে দেওয়া হয় অস্ত্রের মহড়াও। 

দীর্ঘ বছর ধরে একই রকম ঘটনা ঘটতে থাকায় এখানকার মানুষরাও অনেকটা অভ্যস্ত হয়ে গেছে। তবে যেকোনো মূল্যেই তারা অপরাধমুক্ত মোহাম্মদপুর দেখতে চায়। মানববন্ধনের মাধ্যমে প্রায় সময়ই একই দাবি তুলতে দেখা যায় মোহাম্মদপুরের সচেতন নাগরিকদেরও। এ বিষয়ে ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মো. ইবনে মিজান বলেন, এপ্রিলের মাঝামাঝি দুটি খুনের ঘটনার পর গত দুই মাস মোহাম্মদপুরে তা আর ঘটেনি। তবে জেনেভা ক্যাম্পসহ পুরো এলাকাটাই ক্রাইম জোন হওয়ায় বিভিন্ন ঘটনা ঘটতেই থাকে। তবে পরিসংখ্যান অনুযায়ী অপরাধ নিয়ন্ত্রণেই আছে। এটি সম্পূর্ণ নির্মূল সম্ভব নয়। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘যারা গ্রেপ্তার হচ্ছে, অপরাধে জড়ালে তাকে আবার গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। এজন্যই অনেকের বিরুদ্ধে ১০-১৫টি মামলাও হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে আমাদের টহল জোরদার রয়েছে। আমাদের বার্তা স্পষ্ট অপরাধ করলে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।’

একের পর এক আলোচিত ঘটনা : সবকিছু পেছনে ফেলে মোহাম্মদপুরে একের পর এক আলোচিত ঘটনা ঘটতেই থাকে। সবশেষ গতকাল দুপুরে মোহাম্মদপুরের সাতমসজিদ রোডে ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের বিএনপির নেতা মো. নুরুল ইসলামকে (৫৫) নিজ বাসার সামনে কুপিয়ে আহত করেছে দুর্বৃত্তরা। তাঁর ভাতিজা ইয়াছিন বলেন, দুটি মোটরসাইকেলযোগে হেলমেট পরা ছয় যুবক এসে কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগে তাঁর চাচাকে কুপিয়ে আহত করে চলে যায়। কী কারণে কারা ঘটনাটি ঘটিয়েছে, সে ব্যাপারে ভাতিজা ইয়াছিন কিছু জানতে পারেননি। তাঁর ধারণা এটা রাজনৈতিক কোনো বিরোধ থেকে হতে পারে। এর আগে মঙ্গলবার মোহাম্মদপুর এলাকায় অভিযান চালানোর সময় আদাবর থানার ওসি জাহিদুল ইসলাম ও এসআই তরুণ আহত হন। ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিরা কবজি কাটা আনোয়ার গ্রুপের সদস্য বলে জানা গেছে। একই দিন সকালে আদাবরের ৭ নম্বর সড়কে বিকাশ ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে ৩ লাখ টাকা ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয় কবজি কাটা গ্রুপের সদস্যরা। গত ৩০ মে রাতে নূরজাহান রোডে বাসার ফটকের সামনে ছিনতাইয়ের শিকার হন দুই নারী। এ সময় চাপাতি দিয়ে তাঁদের ভয় দেখিয়ে লাগেজ ও মূল্যবান জিনিস ছিনিয়ে নিয়ে যায়। ৪ জুন বিকালে ৪০ ফুট সড়কে এক দম্পতির কাছ থেকে সবকিছু লুটে নেয় ছিনতাইকারীরা।

তৎপরতা কমেনি গ্যাং সদস্যদের : বর্তমানে মোহাম্মদপুরে ছোটবড় মিলিয়ে অন্তত ২৭টি গ্রুপ সক্রিয় আছে। যাদের সদস্যসংখ্যা দুই শতাধিক। এর বাইরে কোনো গ্রুপের নিয়মিত সদস্য নয়, এমন শতাধিক কিশোর-যুবক অস্ত্র হাতে ছিনতাই করে বেড়াচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আকবর গ্রুপ, পাটালি গ্রুপ, কবজি কাটা গ্রুপ, লও ঠেলা গ্রুপ, ভইরা দে গ্রুপ, ফরহাদ গ্রুপ, টক্কর ল গ্রুপ ও ডায়মন্ড গ্রুপ অন্যতম।

ছিনতাই বেশি যেসব এলাকায় : চাঁদ উদ্যান, সাতমসজিদ হাউজিং, লাউতলা, নবীনগর হাউজিং, ঢাকা উদ্যান, তুরাগ হাউজিং, বসিলা ৪০ ফিট, কাটাসুর, গ্রিন হাউজিং, বসিলা গার্ডেন সিটি, একতা হাউজিং, চাঁন মিয়া হাউজিং, মোহাম্মদীয়া হাউজিং লিমিটেড, মোহাম্মদীয়া হাউজিং সোসাইটি, নবোদয় হাউজিং, বোটঘাট, সাদেক খান রোড, ক্যানসার গলি, রায়েরবাজার, পুলপাড় বটতলা ও শেরেবাংলা রোডে সবচেয়ে বেশি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। জানা গেছে, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সম্প্রতি বসিলায় অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করে ডিএমপি। ক্যাম্প চালুর পর বসিলা, ঢাকা উদ্যান, চাঁদ উদ্যান ও নবীনগর হাউজিং এলাকায় নিয়মিত চেকপোস্ট ও বিশেষ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। পুলিশ ছাড়াও র‌্যাব, ডিবি পুলিশ ও সিটিটিসি নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে।

এরপরও থামছে না এ এলাকার অপরাধপ্রবণতা।