প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের নির্বাচনি এলাকা বগুড়ার শিবগঞ্জে তিনটি ইউনিয়ন পরিষদের নামকরণ এবং এ সংক্রান্ত ঘটনাবলি নিয়ে বিএনপি ও দলটির নেতৃত্বাধীন সরকারের মধ্যে একধরনের অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। যদিও শেষ পর্যন্ত দুটি ইউনিয়নের নাম পরিবর্তন হচ্ছে বলে জানা গেছে; কিন্তু এর আগেই কয়েকদিনের ঘটনা নিয়ে নানা আলোচনা ও গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে। বলা হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ইতিবাচক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে ক্রমাগত এগিয়ে যাওয়ার মুহূর্তে বগুড়ায় যেসব ঘটনা ঘটেছে, তাতে সরকারের ভাবমূর্তি কিছুটা হলেও ক্ষুণ্ন হওয়ার উপক্রম হয়েছে। বিশেষ করে ‘প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে’-এমন আলোচনায় এ ঘটনার দায় কেউ কেউ সরকারের ওপর দিচ্ছেন। তারা বলছেন, সরকারের মেয়াদের চার মাসের মধ্যেই এ ধরনের ঘটনা দলের অগ্রযাত্রায় কিছুটা ধাক্কা বা ছেদ তৈরি করতে পারে; যাতে দীর্ঘ মেয়াদে বিএনপির সুনামের ক্ষতি হতে পারে।
তবে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম শুক্রবার যুগান্তরকে বলেন, ‘যেহেতু ইউনিয়নের নামকরণের সঙ্গে আমার সন্তানের নামের আংশিক কাকতালীয়ভাবে মিলে গেছে, তাই ইউনিয়নের নাম পরিবর্তনের জন্য প্রশাসনকে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য বলেছি। ওই নাম থাকবে না, নতুন নামে হবে।’ সর্বশেষ শুক্রবার সন্ধ্যায় বগুড়ার জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, বগুড়ার মোকামতলা উপজেলার নবগঠিত ‘সীমান্ত’ ও ‘দিগন্ত’ ইউনিয়নের নাম পরিবর্তন করা হচ্ছে। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনাও রয়েছে বলে জানান তিনি।
আগের দিন বৃহস্পতিবার দুপুরে বগুড়ায় এক অনুষ্ঠানে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেছেন, ‘এই বগুড়া জেলা ২০ বছর উন্নয়নবঞ্চিত ছিল। আমরা উন্নয়নের কথা বলতে পারিনি। চেষ্টা করেছি হয়তো অনেকেই যারা উপজেলা চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়রের দায়িত্ব পালন করেছেন, কিন্তু বগুড়া হিসাবে সব সময় আমাদের বঞ্চনার চোখে দেখা হয়েছে। এখন এই বগুড়ার উন্নয়ন নিয়ে যখন আমরা কাজ শুরু করেছি, তখন নানামুখী ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় মানুষের দৃষ্টি অন্যদিকে নেওয়ার জন্য কিছু বিষয়কে খুব জোরালোভাবে নিয়ে আসা হচ্ছে।’
সূত্র জানায়, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী শাহে আলমের সাম্প্রতিককালের ভূমিকা নিয়ে দলের ভেতরে ও বাইরে নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে। তবে সরকারে প্রভাবশালী হওয়ায় প্রকাশ্যে এ বিষয়ে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না। অনেকের ধারণা, সরকারের উচ্চপর্যায়ের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা রয়েছে।
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ও সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার যুগান্তরকে বলেন, রাজনীতি মূলত মানুষের কল্যাণের জন্য, কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা পরিবারের স্বার্থসিদ্ধির জন্য নয়। অতীতে পরিবারতন্ত্রের যে ভয়াবহ পরিণতি দেশ দেখেছে, তা থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত। পদ-পদবি ব্যবহার করে যেন ভবিষ্যতে শুধু মানুষের কল্যাণে কাজ করা হয়, সেটাই প্রত্যাশিত। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত বিনয়ী এবং তিনি জনগণের সঙ্গে একটি সুসম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন। কিন্তু একজন প্রভাবশালী তরুণ প্রতিমন্ত্রী যে আচরণ করেছেন, তা প্রধানমন্ত্রীর এই বিনয়ী ও জনবান্ধব নীতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। তিনি বলেন, দলে এমন কিছু ব্যক্তি আছেন যারা অহেতুক ঝগড়া-বিবাদে জড়িয়ে পড়েন এবং মানুষের সঙ্গে বৈরী সম্পর্ক তৈরি করেন। এই ধরনের আচরণ প্রধানমন্ত্রীর মূল ভিশন বা দূরদর্শিতার পরিপন্থি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বগুড়া-২ আসন থেকে প্রথমবার সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হন মীর শাহে আলম। পরবর্তী সময়ে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান তিনি। দায়িত্ব পেয়েই শিবগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতির পদ থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন তিনি। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্বে আছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। মিথ্যা মামলায় ১৭ বছরে বেশ কয়েকবার কারাবারণ এবং ব্যাপক অত্যাচার-নির্যাতনের মধ্যেও দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে সক্ষম হন তিনি। সরকার ও দলের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীর সঙ্গে একজন প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ দেওয়ার ঘটনায় দলের ভেতরে ও বাইরে নানা আলোচনা-সমালোচনা আছে। তবে ‘স্পর্শকাতর’ এ বিষয়ে কেউ মুখ খুলতে রাজি হননি।
গণমাধ্যমের বিভিন্ন রিপোর্ট পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এ পর্যন্ত প্রতিমন্ত্রী শাহে আলমকে নিয়ে যত খবর প্রকাশিত হয়েছে, তাতে কোথাও তার বিরুদ্ধে কেউ কোনো কথা বলার সাহস দেখাননি।
১৫ জুন জাতীয় সংসদে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের ছাঁটাই প্রস্তাবের আলোচনায় মীর শাহে আলমের নির্বাচনি এলাকার তিনটি ইউনিয়নের নামকরণ প্রসঙ্গটি উত্থাপন করেন বিরোধী দলের সংসদ-সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ। তিনি অভিযোগ করেন, প্রতিমন্ত্রীর নির্বাচনি এলাকায় একটি ইউনিয়নের নাম তার বংশের নামে ‘মীরবাড়ী’ রাখা হয়েছে এবং আরও দুটি ইউনিয়নের নামকরণ করা হয়েছে তার দুই সন্তান ‘দিগন্ত; ও ‘সীমান্ত’-এর নামে। এরপর থেকে এ বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়।
সংসদে এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে প্রতিমন্ত্রী দাবি করেন, দুটি ইউনিয়নের নাম তার ছেলেদের নামের সঙ্গে মিলে যাওয়ার বিষয়টি ‘মিরাকল’। তবে বিষয়টি ‘মিরাকল’ কি না, এ নিয়ে জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যমে নানা খবর প্রকাশিত হয়েছে। তার আগে প্রতিমন্ত্রীর বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে স্থানীয় পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হওয়ায় গণমাধ্যমকর্মীদের নামে মামলা হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়। এছাড়া স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার পর দেশের অন্যান্য নির্বাচনি এলাকার তুলনায় তার নিজস্ব এলাকা শিবগঞ্জে বেশি পরিমাণে সরকারি প্রকল্প ও উন্নয়ন বরাদ্দ দেওয়ার খবর গণমাধ্যমে আসে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির একাধিক সংসদ-সদস্য এবং বেশ কয়েকজন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী যুগান্তরকে জানিয়েছেন, চার মাসের মেয়াদে বর্তমান সরকারের জন্য সবচেয়ে বেশি অস্বস্তি তৈরি করেছেন প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম। তার কারণে সরকারকে কিছুটা হলেও বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হয়েছে। এ ধরনের ঘটনায় জনগণের কাছে নেতিবাচক বার্তা যাচ্ছে। পাশাপাশি সংসদের বিরোধী দল ও বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাদের সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলার সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রতিনিয়ত ট্রল হচ্ছে। এর আগে এপ্রিলে চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা সম্পর্কে প্রতিমন্ত্রীর দেওয়া এক বক্তব্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হয়। বিএনপির মধ্যে আলোচনা আছে, সরকারের সিনিয়র মন্ত্রী কিংবা বিএনপির নীতিনির্ধারণী ফোরামের অনেক সদস্যকেও ন্যূনতম সম্মান দেখান না স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী। এ নিয়ে সংসদ-সদস্য, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ রয়েছে।
মন্ত্রিসভার প্রভাবশালী একজন মন্ত্রী যুগান্তরকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যেখানে তার মায়ের (বেগম খালেদা জিয়া) নামে প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করতে চান না, সেখানে একজন প্রতিমন্ত্রী কতটা প্রভাবশালী হলে নিজ পরিবার ও সন্তানের নামে ইউনিয়নের নামকরণ করতে পারেন। সংসদে এর যথাযথ ব্যাখ্যাও দিতে পারেননি বলে মনে করেন ওই মন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম সংসদে বিদ্রুপের সুরে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, যা অন্য সংসদ-সদস্যদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি।
বগুড়ার পার্শ্ববর্তী এলাকায় ২ জন সংসদ-সদস্য বলেন, প্রতিমন্ত্রী শাহে আলমের কর্মকাণ্ড সারা দেশে সরকারের ব্যাপারে নেতিবাচক বার্তা গেছে। এভাবে চলতে থাকলে সরকারের ইমেজ নষ্ট হবে। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানপরবর্তী মানুষের যে আকাঙ্ক্ষা পূরণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দিনরাত পরিশ্রম করছেন, তা বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
এদিকে ইউনিয়ন পরিষদের নামকরণ নিয়ে বিতর্কের রেশ না কাটতেই প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের নামে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নামকরণের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা উঠেছে। বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী শিবগঞ্জ পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করে ‘শিবগঞ্জ মীর শাহে আলম পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয়’ করার প্রস্তাব শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে বলে শুক্রবার গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়।
তবে বিষয়টি নিয়ে আগেই আপত্তি জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম। তিনি জানান, প্রতিমন্ত্রীর নামে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামকরণের উদ্যোগ না নিতে শিক্ষা সচিবের প্রতি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে ১ জুন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিবের কাছে একটি আধা-সরকারি (ডিও) পত্র পাঠিয়েছেন তিনি।
পত্রে প্রতিমন্ত্রী উল্লেখ করেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে বিভিন্ন ব্যক্তি নিজেদের উদ্যোগে ও স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে তার নামে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামকরণের প্রস্তাব পাঠাচ্ছেন, যা তার কাছে অনভিপ্রেত ও অনাকাঙ্ক্ষিত। তিনি মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য, পরিচিতি ও স্বাতন্ত্র্য অক্ষুণ্ন রাখাই অধিকতর সমীচীন।