নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার গাউছিয়া এলাকায় আসামি গ্রেফতারে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন ডিবি দক্ষিণ তিন সদস্য। বৃহস্পতিবার শুধু এ হামলাই নয়, দুষ্কৃতকারীরা তাদের মারধর করে পিকআপে তুলে আড়াইহাজার উপজেলার উচিতপুরা ইউনিয়নের শান্তিনগর বাজারে নিয়ে যায়। সেখানে আবারো তাদের উপর শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়। আহতরা হলেনÑ এসআই মামুন মাতুব্বর, এএসআই আমান উল্লাহ ও কনস্টেবল কবির আহমেদ। এর আগে ১৬ জুন খোদ রাজধানীর মোহাম্মদপুরে আদাবর থানার শেখেরটেকে ‘কব্জিকাটা গ্রুপে’র কয়েকজন সদস্য চাপাতি নিয়ে একটি দোকানে ঢুকে ব্যবসায়ীকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে আহত করে তিন লাখ টাকা ছিনিয়ে নেয়। পরে খবর পেয়ে আদাবর থানা পুলিশ অপরাধীদের আস্তানায় অভিযান চালাতে গেলে সন্ত্রাসীরা সংঘবদ্ধভাবে পুলিশের ওপর হামলা চালায়। চাপাতির আঘাতে আহত হন আদাবর থানার ওসিসহ দুই পুলিশ কর্মকর্তা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আত্মরক্ষার্থে পুলিশ গুলি চালালে দুই সন্ত্রাসী আহত হয়।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দেশের বিভিন্ন স্থানে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, গুলিবিনিময়, সশস্ত্র হামলা এবং পুলিশের ওপর আক্রমণের ঘটনা বাড়তি উদ্বেগ তৈরি করছে। অতীতে অপরাধীরা পুলিশের উপস্থিতি এড়িয়ে চললেও এখন সরাসরি সংঘর্ষে জড়াচ্ছে। গত নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, স্থানীয় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি এবং অপরাধ অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে সহিংসতার মাত্রা বেড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের প্রথম পাঁচ মাসেই (জানুয়ারি-মে) পুলিশের ওপর অন্তত ২৬৮টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এমনকি জুন মাসে ৮টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। প্রকৃত জড়িতদের অনেকেই ধরাছোয়ার বাইরে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, অপরাধীরা আগের তুলনায় বেশি সংঘবদ্ধ। অনেক ক্ষেত্রে তারা পুলিশের উপস্থিতিকেও ভয় করছে না। ফলে মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ সদস্যদের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে। অভিযানে গেলে আক্রান্ত হচ্ছে পুলিশ সদস্যরা। টহল দলকে ঘিরে হামলা হচ্ছে, থানায় হামলা ও আসামি ছিনিয়ে নেয়ার ঘটনাও ঘটছে। ফলে সাধারণ মানুষের মনে নতুন করে প্রশ্ন যে পুলিশ নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, সেই পুলিশই যদি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে, তাহলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করবে কে! পুলিশের নিরাপত্তা কোথায়! অপরাধীদের কঠোর হস্তে দমন এবং দ্রুত জামিন নিয়ে বের হতে না পারে সে বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে সরকারকে।
অপরাধ বিশ্লেষক ও মানবাধিকারকর্মীদের মতে, এগুলো একই ধরনের সংকেত বহন করছে। অপরাধী ও সহিংস গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে চ্যালেঞ্জ করার প্রবণতা বাড়ছে। যখন অপরাধীরা দিনের আলোয় গুলি চালায়, তখন তারা শুধু একজনকে হত্যা করে না তারা এলাকাবাসীকে বার্তা দিতে চায় যে তারাই শক্তিশালী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নয়। অতীতে অপরাধীরা পুলিশের উপস্থিতি এড়িয়ে চলার চেষ্টা করতো। কিন্তু এখন অনেক ক্ষেত্রে তারা সরাসরি সংঘর্ষে জড়াতে দ্বিধা করছে না। এটা রাষ্ট্রের কর্তৃত্বকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করার প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়। তাদের মতে, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে ধারাবাহিক অভিযান, রাজনৈতিক ও সামাজিক আশ্রয়-প্রশ্রয় বন্ধ, দ্রুত বিচার এবং জনসম্পৃক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়া এই প্রবণতা মোকাবেলা করা কঠিন হবে।
পুলিশ সদর দফতর সূত্রে জানা গেছে, ৯ জুন ঢাকার সাভারে মাদক মামলার এক ওয়ারেন্টভুক্ত আসামিকে গ্রেফতার করতে গিয়ে হামলার শিকার হন পুলিশের দুই সদস্য। এ সময় গ্রেফতার হওয়া আসামিকেও ছিনিয়ে নেয়া হয়। পুলিশের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, এমন ঘটনায় শুধু অভিযানের ঝুঁকিই বাড়ছে না, অনেক ক্ষেত্রে পুলিশের মনোবলেও প্রভাব পড়ছে। থানার ভেতরেও পুলিশ আক্রান্ত হচ্ছে। ১৯ জানুয়ারি চট্টগ্রামের সীতাকু-ের জঙ্গল সলিমপুরে অস্ত্র উদ্ধার অভিযানে গিয়ে দুর্বৃত্তদের হামলায় র্যাব-৭-এর উপসহকারী পরিচালক মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া নিহত হন। গত ২০ মে রাজধানীর মিরপুরের বাউনিয়াবাদ এলাকায় বস্তি উচ্ছেদে গেলে পুলিশের ওপর হামলা চালায় বিক্ষুব্ধ বস্তিবাসীরা। এতে সাত পুলিশ সদস্য আহত হন। ১১ মে মোহাম্মদপুরে ছিনতাইকারীদের ধরতে গেলে পুলিশের ওপর হামলা করে ছিনতাইকারীরা। পুলিশ ফাঁকা গুলি করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। ১৬ জুন শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় আসামি ধরাকে কেন্দ্র করে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় লালমনিরহাটের আদিতমারী। এতে পুলিশ সুপার (এসপি), ওসিসহ ২০ জন আহত হয়। জেলা প্রশাসকের (ডিসি) গাড়িসহ প্রশাসনের সাতটি গাড়ি ভাঙচুর করে বিক্ষুব্ধ জনতা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে মাঠপর্যায়ের একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা শুক্রবার ইনকিলাবকে বলেন, অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার, স্থানীয় আধিপত্যের রাজনীতি, বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং সামাজিক বা রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় অনেক অপরাধীকে সাহস জোগাচ্ছে। যখন কোনো অপরাধী জানে যে তার হাতে অস্ত্র আছে এবং পেছনে প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সমর্থন রয়েছে, তখন সে পুলিশের সঙ্গেও সংঘর্ষে জড়াতে সাহস পায়। এছাড়া অতীতের কিছু বিতর্ক, মানবাধিকার প্রশ্ন এবং রাজনৈতিক ব্যবহারের অভিযোগের কারণে পুলিশের প্রতি জনআস্থার যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, অপরাধীরা এখন সেই পরিস্থিতিরও সুযোগ নিচ্ছে।
মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন ইনকিলাবকে বলেন, পুলিশের ওপর হামলা আসলে পুলিশের একার সংকট নয়, এটি আইনের শাসনের ওপর সরাসরি আঘাত। সব জায়গায় পুলিশের ওপর হামলা হচ্ছে না। যেসব এলাকায় অপরাধপ্রবণতা বেশি, সেসব এলাকাতেই মূলত এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। এ জন্য মাদক ও অবৈধ অস্ত্রের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযান চালাতে হবে। রাজনৈতিক সদিচ্ছা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকর পদক্ষেপ এবং জনগণের অংশগ্রহণ এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে কাজ না করলে পরিস্থিতির উন্নতি কঠিন হবে। পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ক্রাইম এন্ড অপারেশন) খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, কর্মক্ষেত্রে পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। যারা পুলিশের ওপর হামলা বা বাধা সৃষ্টি করছে, তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ বিষয়ে কোনো ছাড় দেয়া হবে না।
একাধিক সূত্র বলছে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের সময় ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচার গুলি ও হামলার ঘটনায় পুলিশ ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়। হাসিনা সরকারের পতনের পর বাহিনীর কনস্টেবল থেকে আইজিপি সব পর্যায়ের অনেক সদস্য আত্মগোপনে চলে যান। বিভিন্ন স্থানে হামলার শিকার হন পুলিশের সদস্যরা। গণ-অভ্যুত্থানের সময় পুলিশের ৪৪ জন সদস্য নিহত হন। ভেঙে পড়ে সারা দেশের পুলিশিং ব্যবস্থা; তিন দিন পুরোপুরি বন্ধ থাকে থানাগুলোর কার্যক্রম। পুলিশের ওপর সাধারণ মানুষের যে আস্থার ঘাটতি ছিল তা এখনো খাটিয়ে উঠা সম্ভব হয়নি। পুলিশের মধ্যে চেইন-অব কমান্ড প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ অনেক ধীরগতিতে চলছে। পুলিশের পদোন্নতি ও পদায়নসহ অনেক বিষয় এক অদৃশ্য শক্তির হাতে পরিচালিত হওয়ার চেইন-অব কমান্ড প্রতিষ্ঠায় বাধার সৃষ্টি হচ্ছে। আর মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যরা আক্রমণের শিকার হলেও কঠোর হস্তে জড়িতদের দমন বা আইনের আওতায় আনার বিষয়টি ব্যর্থ হচ্ছে।