হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের নির্মাণকাজ প্রায় শেষ হলেও এখনো শুরু হয়নি বাণিজ্যিক কার্যক্রম। অথচ টার্মিনাল থেকে এক টাকা আয় আসার আগেই এর নির্মাণে নেওয়া জাপানি ঋণের কিস্তি পরিশোধের সময় ঘনিয়ে এসেছে। চলতি বছরই বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষকে (বেবিচক) দুই কিস্তিতে ২২০০ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হবে, যা সংস্থাটির এক বছরের উদ্বৃত্ত আয়ের প্রায় সমান। টার্মিনাল পরিচালনায় জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে এখনো চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়ায় এটি কবে নাগাদ পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হবে, তা নিয়ে বড় ধরনের সংশয় তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করে রাজস্ব আয় নিশ্চিত করতে না পারলে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকার এই মেগা প্রকল্পটি শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের কাঁধে বিশাল এক আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।
বেবিচকের সদস্য (প্রশাসন) এসএম লাবলুর রহমান বলেন, প্রায় সাড়ে ১৬ হাজার কোটি টাকার জাপানি ঋণের বিপরীতে এ মাসেই ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা এবং ডিসেম্বরে আরও ১ হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করতে হবে। ঋণের অর্থ প্রথমে অর্থ মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হবে, পরে সেখান থেকে জাপানি কর্তৃপক্ষকে পরিশোধ করা হবে।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, বিলম্বের কারণে কয়েক বছরের আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে। টার্মিনাল নির্মাণ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অপারেটর নিয়োগ ও ব্যবস্থাপনা চুক্তি সম্পন্ন করা উচিত ছিল। তাহলে এখন টার্মিনালের নিজস্ব আয় থেকেই ঋণের কিস্তি পরিশোধ করা যেত। এখন যে অবস্থা দেখা যাচ্ছে, তাতে ২০২৭ সালের শেষে বা ২০২৮ সালের আগে টার্মিনালটি পুরো সক্ষমতায় পরিচালনায় যাওয়া কঠিন হবে। তিনি বলেন, দ্রুত বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু না হলে এটি দেশের এভিয়েশন খাতের ‘গেম চেঞ্জার’ হওয়ার বদলে বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণে মোট ব্যয় হয়েছে ২১ হাজার ৩৯৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকার দিয়েছে ৫ হাজার ২৫৮ কোটি টাকা; বাকি ১৬ হাজার ১৪১ কোটি টাকা ঋণ হিসাবে দিয়েছে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা)। চুক্তি অনুযায়ী, এই ঋণের প্রথম কিস্তি পরিশোধের সময় নির্ধারিত হয়েছে চলতি বছরের জুনে এবং দ্বিতীয় কিস্তি আগামী ডিসেম্বরে। ২০৫৬ সাল পর্যন্ত দিতে হবে কিস্তি। যদিও ঋণ পরিশোধ শুরু হওয়ার কথা ছিল প্রায় দেড় বছর আগেই। কিন্তু টার্মিনাল চালু করতে না পারায় বেবিচক জাইকার কাছ থেকে জুন পর্যন্ত সময় বাড়িয়ে নেয়। এরপরও টার্মিনাল চালু করা তো দূরের কথা, প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ হস্তান্তর ও বুঝে নেওয়ার প্রক্রিয়াও শেষ করতে পারেনি সংস্থাটি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনা ও চালু করার বিষয়ে জাপানের সঙ্গে কার্যকর সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারাও বিলম্বের অন্যতম কারণ। একই সঙ্গে ঋণ পরিশোধের সময়সীমা আরও বাড়ানোর বিষয়ে শক্ত অবস্থান নিতে না পারার দায়ও রয়েছে কর্তৃপক্ষের।
বেবিচকের সাবেক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) মফিদুর রহমান বলেন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দুর্বলতার কারণেই প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়ে এগোতে পারেনি। নেতৃত্বের দায়িত্বে থাকা অধিকাংশ কর্মকর্তাই ছিলেন নতুন, ফলে তাদের প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতার ঘাটতি ছিল। এত বড় একটি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য যে ধরনের দক্ষতা, পরিকল্পনা ও বাস্তব অভিজ্ঞতা প্রয়োজন, তা যথাযথভাবে কাজে লাগানো হয়নি। বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রকল্পটিকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ ও দৃঢ়তা দেখা যায়নি। তিনি বলেন, যারা ঋণ ও প্রকল্পসংক্রান্ত আলোচনায় যুক্ত ছিলেন, তাদের বিবেচনায় রাখা উচিত ছিল যে প্রকল্প বাস্তবায়নে যত বিলম্ব হবে, ঋণ পরিশোধের চাপও তত বাড়বে। এখনো যদি পরিচালনাসংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষর না হয়, তাহলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু করা কঠিন হয়ে পড়বে।
মফিদুর রহমান আরও বলেন, সময়ক্ষেপণের কারণে যে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, তার পুরো বোঝা শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশকেই বহন করতে হচ্ছে। কেননা চুক্তি স্বাক্ষরের পরও অপারেটরের প্রস্তুতি, জনবল নিয়োগ, প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় মোবিলাইজেশন সম্পন্ন করতে উল্লেখযোগ্য সময়ের প্রয়োজন হয়। তাই বিলম্ব যত বাড়বে, প্রকল্পের অর্থনৈতিক চাপও তত বৃদ্ধি পাবে।
সূত্রমতে, বর্তমানে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বার্ষিক যাত্রী ধারণক্ষমতা প্রায় ৮০ লাখ। থার্ড টার্মিনাল চালু হলে ১ কোটি ৮০ লাখেরও বেশি যাত্রীকে সেবা দেওয়া যাবে। একই সঙ্গে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে কার্গো হ্যান্ডলিং সক্ষমতাও। তবে সক্ষমতা বৃদ্ধি মানেই রাজস্ব বৃদ্ধি নয়। এজন্য নতুন আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্স আকর্ষণ, ট্রানজিট যাত্রী সংখ্যা বৃদ্ধি, কার্গো ব্যবসার সম্প্রসারণ এবং বাণিজ্যিক স্পেসের দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।
অর্থনীতিবিদ ও অবকাঠামো বিশ্লেষকদের মতে, প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকার এই বৃহৎ বিনিয়োগকে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক করতে হলে যাত্রী ও কার্গো-উভয় খাতেই উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন জরুরি। থার্ড টার্মিনালের নির্মাণকাজ প্রায় ৯৯ শতাংশ সম্পন্ন হলেও পরিচালনা ব্যবস্থা ও রাজস্ব ভাগাভাগি সংক্রান্ত বিষয়ে জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে সমঝোতা না হওয়ায় এটি এখনো চালু করা সম্ভব হয়নি।
বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই থার্ড টার্মিনাল চালুর বিষয়ে জোরালো তৎপরতা শুরু করেছে। জাপানের বিমান পরিবহণমন্ত্রীর সঙ্গে পাঁচ দফা বৈঠক করেছেন বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম। এছাড়া বিষয়টি নিয়ে পাঁচটি বিশেষ সভাও হয়েছে। একাধিকবার দরকষাকষির পর থার্ড টার্মিনাল পরিচালনার কাঠামো চূড়ান্ত করা হয়। প্রস্তাবিত সমঝোতা অনুযায়ী, টার্মিনাল পরিচালনাসংশ্লিষ্ট চারটি প্রধান খাত-বন্দর উন্নয়ন ফি, লাউঞ্জ, কার্গো হ্যান্ডলিং এবং কার পার্কিংয়ের ভাড়া থেকে রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব থাকবে জাপানি কনসোর্টিয়ামের হাতে। এসব খাত থেকে অর্জিত রাজস্বের ৭৩ শতাংশ পাবে জাপানি কনসোর্টিয়াম এবং ২৭ শতাংশ বাংলাদেশ। আর ওভার-ফ্লাইং চার্জ ও বিমান অবতরণ ফি থাকবে সিভিল এভিয়েশনের কাছে। এছাড়া কাস্টমস, নিরাপত্তা ও ইমিগ্রেশন কার্যক্রমও চলবে বাংলাদেশের তত্ত্বাবধানে। এ লক্ষ্যে বেবিচক ইতোমধ্যে রিকোয়েস্ট ফর প্রপোজাল (আরএফপি) জারি করেছে।
১৭ মে জাপানি প্রতিষ্ঠানের কাছে একটি প্রস্তাব পাঠানো হয়। সেই প্রস্তাবের ভিত্তিতে আগামী জুলাইয়ের শেষদিকে উভয় পক্ষের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়ে নীতিগত ঐকমত্য হয়েছে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে তারা জানায়, এখনই চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য তারা প্রস্তুত নয়; আরও দুই মাস সময় প্রয়োজন। পাশাপাশি তারা বেশকিছু নতুন শর্তও দিয়েছে। বেবিচক কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, এই সময় দেওয়া হলে চলতি বছরের মধ্যে থার্ড টার্মিনাল চালু করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। কারণ, তাদের শর্ত অনুযায়ী চুক্তি স্বাক্ষরের পর প্রস্তুতির জন্য আরও ছয় মাস সময় দিতে হবে।
বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিকী বলেন, জাপানি পরিচালনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সব ধরনের আলোচনা প্রায় চূড়ান্ত হয়েছে। চলতি মাসেই তাদের প্রস্তাব দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে তারা আরও দুই মাস সময় চেয়েছে। বিষয়টি সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে অবহিত করা হয়েছে। দীর্ঘ দুই বছর আলোচনা চলার পর শেষ মুহূর্তে তাদের এমন অবস্থানে আমরা বিস্মিত। আমরা তাদের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানিয়েছি। তিনি আরও বলেন, আমরা এখনো হাল ছাড়িনি। সরকারের উচ্চপর্যায়ের উদ্যোগ থাকলে ১৬ ডিসেম্বরই থার্ড টার্মিনাল চালু করা সম্ভব।
বিমান পরিবহণ ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, ১৬ ডিসেম্বর থার্ড টার্মিনাল উদ্বোধনের নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। সে লক্ষ্যে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।