চুরি, ছিনতাই আর ডাকাতি রাজধানী ঢাকার যেন নিত্যদিনের সঙ্গী। ব্যাংক কিংবা মানি এক্সচেঞ্জ থেকে বড় লেনদেন করলেই পিছু নিচ্ছে ডাকাত দলের সদস্যরা। এমনকি সোনার দোকান থেকে শুরু করে বাসাবাড়ি সবকিছুতেই চলছে ডাকাতদের এক অদৃশ্য নজরদারি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একই অপরাধে ১০-১৫টি মামলা থাকলেও দুই সপ্তাহ থেকে এক মাসের মধ্যে জামিন পেয়ে যাচ্ছে ডাকাত দলের সদস্যরা। জামিনের পর তারা আবারও বড় ধরনের ঘটনা ঘটাচ্ছে।
ডিবি সূত্র জানিয়েছে, শুধু রাজধানীতেই ৯০ সক্রিয় ডাকাত চক্রের সদস্য সংখ্যা ৯ শতাধিক। প্রতিটি চক্রের সদস্য সংখ্যা ৭-১৫ জন। কেউ ব্যাংক থেকে মোটা অঙ্কের টাকা তুললে কিংবা মানি এক্সচেঞ্জ থেকে বড় লেনদেন করে বাইরে বের হওয়ার আগেই তথ্য চলে যায় চক্রের রেকি টিমের সদস্যদের কাছে। তারা টার্গেট ব্যক্তিকে ফলো করা শুরু করে। আর গাড়ি নিয়ে প্রস্তুত থাকা অপহরণ টিমের সদস্যদের তথ্য জানাতে থাকে। টার্গেট ব্যক্তি সুবিধাজনক জায়গায় গেলেই র্যাব অথবা ডিবি পুলিশ পরিচয়ে অপহরণ করে গাড়িতে নির্জন এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। এর মধ্যে মারধর করে সব টাকা লুটে অপহরণের শিকার ব্যক্তিকে সড়কে ফেলে দেওয়া হয়।
সূত্র জানায়, প্রতিটি চক্রের সদস্যদের মধ্যে কারও না কারও মাইক্রোবাস থাকে। এগুলো রেজিস্ট্রেশন করা হয় স্ত্রী বা পরিবারের অন্য সদস্যদের নামে। মোবাইলে ব্যবহার করা হয় না কোনো সিম কার্ড। যোগাযোগ করতে ব্যবহার হয় পকেট রাউটার। আগ্নেয়াস্ত্র ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভুয়া পোশাকের মালিকও থাকে একজন। যখন কোনো ডাকাতি করা হয়, তখন লেনদেনকারী ব্যক্তির তথ্য দেওয়া এজেন্টের জন্য ৩০ শতাংশ, গাড়ি ভাড়া ৫০ হাজার, পোশাক ও অস্ত্র ভাড়ার ৫০-৬০ হাজার টাকা বাদ দিয়ে অবশিষ্ট টাকা ভাগাভাগি করে নেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে যার মামলা সংখ্যা বেশি, তাকে বেশি টাকা দেওয়া হয়। গোয়েন্দা তথ্য বলছে, প্রতিটি চক্র সপ্তাহে দুই দিন ডাকাতির উদ্দেশ্যে বের হয়। তাদের প্রধান টার্গেট থাকে মতিঝিল, পল্টন ও উত্তরা এলাকা। যদি ব্যাংক বা মানি এক্সচেঞ্জকে কেন্দ্র করে কোনো টার্গেট নির্দিষ্ট করতে না পারে, তাহলে দ্বিতীয় টার্গেট হয়ে ওঠে সোনার দোকানে ডাকাতি অথবা নগদ বা বিকাশ ব্যবসায়ীদের অপহরণ। এতেও কোনো টার্গেট না মিললে মহাসড়কে ডাকাতির উদ্দেশ্যে ঘুরে বেড়ায় তারা। এসব চক্রে বেশির ভাগই বিভিন্ন বাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত সদস্য, গাড়ি চালক ও পেশাদার ছিনতাইকারী।
সম্প্রতি রাজধানীর উত্তরায় র্যাব পরিচয়ে এক ব্যসায়ীকে অপহরণ করে ৬৫ লাখ টাকা ডাকাতির ঘটনা ঘটে। পরে এ ঘটনায় রাসেল ও জুয়েল নামে ডাকাত চক্রের দুই সদস্য গ্রেপ্তার হয়। এ দুই ডাকাতের দেওয়া তথ্যে হতবাক হন তদন্তকারীরাই। সোর্সের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ থেকে শুরু করে গ্রেপ্তারের পর জামিন করাতে আইনজীবী ঠিক করতে আলাদা আলাদা লোক আছে তাদের। ঘটনাটির তদন্তকারী সূত্র জানায়, রাসেল ১৮ মামলার আসামি। যার মধ্যে দুটি অস্ত্র মামলা, অন্যগুলো ছিনতাই ও ডাকাতি মামলা। এই রাসেল এক সাধারণ গাড়ি চালক থেকে হয়ে উঠেছে দুর্ধর্ষ ডাকাত। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সে ডিবিকে জানায়, একবার ৫০ হাজার টাকা চুক্তিতে এক ডাকাত দল তাকে ভাড়া করে।
অল্প সময়ে অধিক লাভ হওয়ায় এবং ২-৩টি ঘটনার পর কৌশল রপ্ত হয়ে যাওয়ায় নিজেই হয়ে যায় পেশাদার ডাকাত। গ্রেপ্তার হওয়া জুয়েলের পাসপোর্টে নাম রাশেদুল ইসলাম। অবস্থা বেগতিক দেখলে কিছুদিন দেশের বাইরেও থাকত সে। আর জুয়েলের নামে রয়েছে ১৭ মামলা। স্ত্রী মীনা বেগমের নামে দুটি গাড়ি কিনে সেগুলো ডাকাতির কাজে ভাড়া দিত। ডাকাতির সময় নিজেও সঙ্গে থাকত। ৬৫ লাখ টাকা ডাকাতিতে তার স্ত্রীর নামে রেজিস্ট্রেশন করা এক্স-নোয়াহ (ঢাকা মেট্রো চ-১৫-৯৬২৯) গাড়ি ব্যবহার করা হয়। ডিবিকে আরও জানিয়েছে, ৬৫ লাখ ডাকাতির ঘটনার দিন গত ২৫ এপ্রিল ব্যবসায়ী সালমান মাহবুব জয় মতিঝিল ও পল্টন এলাকায় নিয়ন মানি এক্সচেঞ্জ, বিনিময় মানি এক্সচেঞ্জে একাধিকবার যান। কিন্তু থাই বাথের রেট সুবিধাজনক না হওয়ায় উত্তরার জামান মানি এক্সচেঞ্জে যোগাযোগ করে মেট্রোরেলে রওনা দেন। নিয়ন মানি এক্সচেঞ্জ থেকে তাকে ডাকাত দলের চারজন অনুসরণ শুরু করে।
চক্রের অন্য সাত সদস্য তখন বিজয়নগরে গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছিল। অনুসরণ করা চারজনের তথ্য মতে, গাড়ি নিয়ে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে উত্তরা যায় সাতজন। আর ওই ব্যবসায়ী মেট্রোরেল থেকে দিয়াবাড়িতে নেমে রিকশা নেন। এরই মধ্যে গাড়ির নম্বর প্লেট পরিবর্তন করে ওই ব্যবসায়ীকে অপহরণ করে টাকা লুট করা হয়। ডিবি জানিয়েছে, এ চক্রের সদস্য ১২ জন। এদের মধ্যে সেনাবাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত আশিক ও পুলিশ থেকে চাকরিচ্যুত শাহিন নামে দুজন রয়েছে। ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) এস এন নজরুল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, কোনো ঘটনা ঘটলে দোষীদের আইনের আওতায় আনা হয়। নিয়মিত অভিযানেও অনেক ডাকাত ও ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়। সমস্যা হচ্ছে, ডাকাত দলের সদস্যরা বিভিন্ন জেলা থেকে এসে ঘটনা ঘটিয়ে চলে যায়। এজন্য তাদের গ্রেপ্তারে অনেক সময় বেগ পেতে হয়।