বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ অবৈধভাবে বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই)সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদনে বারবার উঠে এসেছে অর্থ পাচারের এই ভয়াবহ চিত্র। আর পাচারকৃত এই অর্থের একটি বড় অংশের নিরাপদ গন্তব্য সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংক, যা ‘সুইস ব্যাংক’ নামে পরিচিত। বৃহস্পতিবার সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সাল শেষে ব্যাংকটিতে বাংলাদেশিদের জমানো অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৩ কোটি ৪১ লাখ সুইস ফ্রাঙ্ক।
প্রতি ফ্রাঙ্ক ১৫২ টাকা হিসাবে স্থানীয় মুদ্রায় যা ১২ হাজার ৬৭৮ কোটি টাকা। তথ্য বলছে, সারা বিশ্বে সুইস ব্যাংকে আমানত কমার প্রবণতা থাকলেও, ঠিক উল্টো চিত্র বাংলাদেশের ক্ষেত্রে। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংকটিতে বাংলাদেশিদের আমানত ৪১ শতাংশ বা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা বেড়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। তবে বাংলাদেশি নাগরিকদের মধ্যে কারা এই টাকা সুইস ব্যাংকে জমা রেখেছেন, সে তথ্য এই প্রতিবেদনে নেই। সুইস ব্যাংক তার কোনো আমানতকারীর তথ্য কখনো প্রকাশ করে না।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকারদের মতে, পাচারকারীদের কাছে সুইস ব্যাংকগুলো এখনো অত্যন্ত আকর্ষণীয়। দেশে বৈধভাবে বিদেশে অর্থ জমানোর কোনো আইনি সুযোগ না থাকায় এই বিপুল অর্থের পুরোটাই পাচার করা হয় বলে নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এ অবস্থায় পাচার রোধ ও অর্থ ফেরাতে সরকারকে আরও কঠোর হওয়ার তাগিদ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা। মূলত পাঁচটি প্রধান কারণে দেশ থেকে সুইস ব্যাংকে টাকা পাচার করা হচ্ছে।
কঠোর গোপনীয়তা: সুইস ব্যাংকগুলোর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো তাদের গ্রাহকদের তথ্যের কঠোর গোপনীয়তা। ১৯৩৪ সালের এক আইনের মাধ্যমে সুইজারল্যান্ডে গ্রাহকের তথ্য গোপন রাখাকে আইনি বাধ্যবাধকতা করা হয়। কোনো ব্যাংক কর্মকর্তা গ্রাহকের অমিল বা অ্যাকাউন্টের তথ্য ফাঁস করলে তা ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক চাপে সুইজারল্যান্ড কিছুটা তথ্য শেয়ার করছে, তবুও এখনো তাদের গোপনীয়তার প্রাচীর ভাঙা বেশ কঠিন। এই গোপনীয়তার সুযোগটিই নেন পাচারকারীরা।
রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা: সাধারণত জাতীয় নির্বাচনের আগে নানা রকম শঙ্কা বিরাজ করে। এ ছাড়া, দেশে যখনই কোনো রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, সুশাসনের অভাব বা অর্থনৈতিক অস্থিরতা দেখা দেয়, তখন একশ্রেণির ধনাঢ্য ও অসাধু ব্যবসায়ী, প্রভাবশালী ও আমলারা তাদের অবৈধ পথে উপার্জিত অর্থ নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েন। দেশে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের পরিবেশের ঘাটতি এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার অভাব বোধ করায় তারা সুইস ব্যাংকের মতো নিরাপদ জায়গায় অর্থ সরিয়ে রাখেন।
কর ফাঁকি ও অবৈধ টাকা: অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থ বা কর ফাঁকি দেয়া বিশাল অঙ্কের ‘কালো টাকা’ দেশের ভেতরে রাখা ঝুঁকিপূর্ণ। বাংলাদেশে ব্যাংকিং খাতের উপর কড়া নজরদারি এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আইনি জটিলতা এড়াতে এই অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়।
বাণিজ্যে অনিয়ম: মূলত কয়েকটি মাধ্যমে টাকা পাচার হয়। এর মধ্যে অর্থ পাচারের সবচেয়ে বড় মাধ্যম হলো- আমদানি ও রপ্তানির সময়ে পণ্যের মূল্য কম-বেশি দেখানো (ওভার ইনভয়েসিং ও আন্ডার ইনভয়েসিং), হুন্ডি ও ভিওআইপি ব্যবসা। আমদানির নামে অতিরিক্ত মূল্য দেখিয়ে এবং রপ্তানির আসল আয় দেশে না এনে সেই অর্থ সরাসরি সুইজারল্যান্ড সহ বিভিন্ন ট্যাক্স হ্যাভেনে পাঠিয়ে দেয়া হয়। এ ছাড়া, বড় বড় ঘুষ লেনদেন হয় দেশের বাইরে ডলারে; যা পাচারকৃত টাকারই অংশ।
সম্পদের সুরক্ষা ও স্থিতিশীলতা: সুইজারল্যান্ড পৃথিবীর অন্যতম রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল এবং অর্থনৈতিকভাবে নিরাপদ দেশ। বিশ্ব জুড়ে যুদ্ধ-বিগ্রহ বা অর্থনৈতিক মন্দা চললেও সুইস ফ্রাঙ্ক (তাদের মুদ্রা) এবং তাদের ব্যাংকিং ব্যবস্থা অত্যন্ত সুরক্ষিত থাকে। পাচারকারীরা নিশ্চিত জানেন যে, সুইস ব্যাংকে টাকা রাখলে তা কখনো মার যাবে না এবং যেকোনো বৈশ্বিক সংকটেও সেই সম্পদ সুরক্ষিত থাকবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সুইস ব্যাংককে দায়ী করলে এই সমস্যার সমাধান হবে না। দেশ থেকে কেন টাকা পাচার হচ্ছে, সেই উৎসগুলো বন্ধ করতে হবে। ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, খেলাপি ঋণ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতে আন্তর্জাতিক আইনি সহযোগিতা জোরদার করতে হবে।
বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের প্রধান ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ মামুন বলেন, বৈধ অনুমোদন নিয়ে কেউ সুইস ব্যাংকে টাকা রাখেনি। এ ধরনের কোনো সুযোগ নেই। তবে অর্থ পাচার ঠেকাতে এবং আগের পাচার করা অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে আমরা কাজ করছি। আইনগতভাবে যা করণীয় সব উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, হঠাৎ আমানত বৃদ্ধির পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ থাকতে পারে। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, মুদ্রার অবমূল্যায়ন নিয়ে উদ্বেগের ফলে ধনীরা বিদেশে সম্পদ স্থানান্তরে উৎসাহিত হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পাচার কমবে বলে আশা করা হলেও বাস্তবে তা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। বরং যাদের হাতে বড় অঙ্কের অর্থ ছিল, তারা অনিশ্চয়তার মধ্যে সম্পদ নিরাপদ রাখতে বিদেশে সরিয়ে নিয়েছেন।