স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন, চলতি বছরের বর্ষা মৌসুমের পর সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর মাস থেকে পর্যায়ক্রমে দেশজুড়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকেই স্থানীয় নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলো বেশ তৎপর হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয়ভাবে করার ঘোষণায় ক্ষমতাসীন বিএনপিতে প্রার্থীর ছড়াছড়ি। নির্বাচন ঘিরে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ও সহিংসতার আশঙ্কা করা হচ্ছে। জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীতে একাধিক প্রার্থী থাকলেও নির্বাচনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে একক প্রার্থী চূড়ান্ত করে নির্বাচনি মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন তাঁরা।
বিএনপির একক প্রার্থী নির্ধারণ অসম্ভব হয়ে পড়বে : দলটির দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা বলছেন, নির্বাচনের সুস্পষ্ট তারিখ ঘোষণার আগে থেকেই নিজেদের প্রার্থিতা জানান দিচ্ছেন ক্ষমতাসীন বিএনপির নেতারা। ইতোমধ্যে ভোটারদের দোয়া চেয়ে ব্যানার-ফেস্টুন-পোস্টারে ছেয়ে গেছে সংশ্লিষ্ট নির্বাচনি এলাকা। তৃণমূলে যোগাযোগ বাড়াচ্ছেন নেতারা। একই এলাকায় রয়েছেন মনোনয়নপ্রত্যাশী একাধিক নেতা। সবাই নিজস্ব অবস্থান থেকে প্রচারণা চালাচ্ছেন। তাঁরা বলছেন, দলীয় প্রতীক না থাকায় এই নির্বাচনে বিএনপির একক প্রার্থী নির্ধারণ করা অনেক ক্ষেত্রেই অসম্ভব হয়ে পড়বে। এতে স্থানীয় দ্বন্দ্ব, প্রভাব বিস্তার ও সংঘর্ষের ঝুঁকি বাড়তে পারে। নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষ ব্যাপক আকার ধারণ করার আশঙ্কা রয়েছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে এখন থেকেই সব রকম প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি। এ সুযোগে সারা দেশে সাংগঠনিক কার্যক্রম বিস্তৃত করার সুযোগ কাজে লাগাতে চায় দলটি।
গত ৯ মে রাজধানীর খামারবাড়ির কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে বিএনপি ও এর তিন সহযোগী সংগঠন যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় ও জেলা পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বড় পরিসরে এটি ছিল বিএনপির প্রথম সাংগঠনিক মতবিনিময় সভা। বৈঠকে তারেক রহমান স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিরপেক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক করার বার্তা দেন। বৈঠকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিভিন্ন আসনে দলীয় নেতাদের বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ার প্রসঙ্গও ওঠে। আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সম্ভাব্য বিদ্রোহী প্রার্থীদের বিষয়টিও আলোচনায় আসে। জানা গেছে, বিদ্রোহী প্রার্থীদের নিরুৎসাহিত করতে বিভাগীয় সাংগঠনিক ও সহসাংগঠনিক সম্পাদকদের বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তাঁরা সম্ভাব্য প্রার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে চলার আহ্বান জানাবেন। বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা বলছেন, দলের পক্ষ থেকে আহ্বান জানানো হলেও শেষ পর্যন্ত স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিএনপির নেতা-কর্মীরা একমত হতে পারবে কি না; তা নিয়ে সংশয় আছে। যেহেতু ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে বিএনপি চেয়ারম্যানের কঠোর বার্তা সত্ত্বেও অর্ধশতাধিক বিদ্রোহী প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। তাই স্থানীয় নির্বাচনেও এর পুনরাবৃত্তি ঘটে কি না, তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে।
দলীয় প্রতীকে নির্বাচন না হওয়ায় আওয়ামী লীগের অপেক্ষাকৃত ‘ক্লিন ইমেজ’সম্পন্ন স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরাও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। সব মিলিয়ে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে ক্ষমতাসীন দল বিএনপিকে। দলীয় প্রতীক না থাকায় ভোটারদের কাছে প্রার্থীর ব্যক্তিগত ইমেজ সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে। এই সুযোগটি অনেকেই নিতে চাইবে। বিএনপির কেন্দ্রীয় দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, দলীয় প্রতীক না থাকায় একক প্রার্থী নির্ধারণ করা হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। যদি কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে ‘বিদ্রোহী’ হিসেবে মাঠে থেকে যায়, তবে ভোট ভাগাভাগির সুবিধা নেবে প্রতিপক্ষ। জানতে চাইলে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান বলেন, জনবান্ধব ও ত্যাগীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। কোনো বিতর্কিতদের সুযোগ দেওয়া হবে না। এ ক্ষেত্রে যোগ্যতাকেই মাপকাঠি হিসেবে দেখা হবে। তিনি বলেন, যুগপতের শরিকরা যদি কোনো জায়গায় যোগ্য হয়, সেটা পরিস্থিতি অনুযায়ী বিবেচনা করা হবে।
শৃঙ্খলা ধরে রাখার চ্যালেঞ্জে জামায়াত : স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে মাঠপর্যায়ে ব্যাপক প্রস্তুতি শুরু করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। অতীতে বিভিন্ন জোটের অংশ হিসেবে নির্বাচন করলেও এবার ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুরু করে সিটি করপোরেশন পর্যন্ত সব স্তরে এককভাবে লড়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি। তবে এই নির্বাচনি হাওয়া ও দ্রুত দলের পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দলটিতে তৈরি হয়েছে এক নতুন অভ্যন্তরীণ সংকট। তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে প্রার্থী হওয়ার তীব্র আকাক্সক্ষা দেখা দিয়েছে, যা অনেক ক্ষেত্রে দলের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও কঠোর নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে উঠছে।
জামায়াতের দীর্ঘ প্রায় আট দশকের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি অলিখিত ও কঠোর নিয়ম রয়েছে। দলের কোনো স্তরের কর্মী বা নেতা নিজে থেকে কোনো পদের জন্য বা নির্বাচনের জন্য প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করতে পারেন না। দলের অভ্যন্তরীণ ফোরাম বা ‘পরামর্শ সভা’ (শুরা) যাচাইবাছাই করে যাঁকে মনোনীত করবে, তিনিই কেবল প্রার্থী হবেন। কিন্তু সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার প্রক্রিয়ায় এই নিয়মে কিছুটা ধাক্কা লেগেছে। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, সারা দেশেই তৃণমূলের বড় একটি অংশ এখন স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরে প্রার্থী হতে উদগ্রীব। অনেক এলাকায় দলের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগেই প্রার্থীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মাঠপর্যায়ে প্রচারণা শুরু করে দিয়েছেন।
কোথাও কোথাও একের অধিক নেতা একই পদে নিজেদের প্রার্থী হিসেবে জানান দিচ্ছেন, যা জামায়াতের সুশৃঙ্খল রাজনীতির সঙ্গে একেবারেই বেমানান। বিশেষ করে রংপুর, যশোর, চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, সিলেট, কুমিল্লাসহ কয়েকটি জেলায় বিকল্প প্রার্থী হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। নির্বাচনি প্রস্তুতি ও প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়া নিয়ে দলটির কেন্দ্রীয় নেতারা জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য তৃণমূলের ইউনিটগুলো থেকে নাম প্রস্তাব করার প্রক্রিয়া চলছে। ইউনিয়ন, উপজেলা ও পৌরসভা স্তরের প্রার্থী চূড়ান্ত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে জেলা ও উপজেলা ইউনিটগুলোকে। আর গুরুত্বপূর্ণ সিটি করপোরেশনের মেয়র পদের জন্য নাম কেন্দ্রের সংসদীয় বোর্ডে পাঠানো হচ্ছে। পুরুষ প্রার্থীদের পাশাপাশি এবার জামায়াতের নারী বিভাগও নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য মাঠপর্যায়ে কাজ করছে। তবে এই ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার বিপরীতে দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা বা শৃঙ্খলা ভঙ্গের কিছু প্রবণতা কেন্দ্রের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। তবে শৃঙ্খলায় জামায়াত কঠোর অবস্থানে রয়েছে বলেও জানা গেছে।
এ বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এ টি এম মাছুম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, জামায়াতের রাজনীতিতে ব্যক্তি নয়, সংগঠন ও সিদ্ধান্তই শেষ কথা। দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে বা নিজে থেকে কেউ প্রার্থী হলে তিনি গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নির্বাচনের অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। শৃঙ্খলার বাইরে গিয়ে কিছু ঘটলে জামায়াত তার নিজস্ব সাংগঠনিক নিয়ম অনুযায়ী কঠোর পদক্ষেপ নেবে এবং এ ধরনের আদর্শিক বিষয়ে দল কখনোই কোনো আপস করবে না। তিনি আরও বলেন, কিছু জায়গায় ব্যত্যয় হয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যেসব ঘটনা ঘটেছে সেগুলোতে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রার্থিতা নিয়ে জামায়াত কঠোর অবস্থানে রয়েছে। দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গেলেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।